• আইন থেকে মাইগ্রেশন করে যান আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে
• পড়াশোনায় বাধা হয়ে দাঁড়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা
• রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স প্রিলিতেও ভর্তি হয়েছিলেন তারেক রহমান
• ছাত্র হিসেবে ছিলেন মার্জিত, শান্ত ও বিনয়ী: নুরুল আমিন বেপারী
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের শিক্ষাজীবন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা অনেকদিনের। বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান থেকে শুরু করে মন্ত্রী-এমপিরা এ নিয়ে দিনের পর দিন কটাক্ষ করে কথা বলেছেন। তবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারেক রহমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা নিয়ে আরেকটি পক্ষ নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ও ‘ট্রল’ করছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিপত্র, তার সরাসরি শিক্ষক, সহপাঠী ও তৎকালীন একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য বলছে ভিন্ন কথা।
বিজ্ঞাপন
তারা বলছেন, ১৯৮৫-৮৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাবিতে আইন বিভাগে অনার্সে ভর্তি হলেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তা শেষ করতে পারেননি। প্রথমে আইন বিভাগে (১৩তম ব্যাচ) ভর্তি হলেও পরে বিভাগ পরিবর্তন করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পড়াশোনা শুরু করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলের ছাত্র ছিলেন। তবে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে না পারার কারণ হিসেবে তারা বলছেন, তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা তার পড়াশোনায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
এদিকে প্রায় ৩৫ বছর পর গত মঙ্গলবার (১২ মে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রীকে তারা ‘ক্যাম্পাসের বড় ভাই’ বলে সম্বোধন করে স্লোগান দেন। অনুজদের এমন ভালোবাসার চাপে প্রোটোকল ভেঙে প্রধানমন্ত্রীও কিছুটা পথ ভিড় সামলে হেঁটে এক অনুষ্ঠান থেকে অন্য অনুষ্ঠানে যোগ দেন। দীর্ঘ সময় পর ক্যাম্পাসে পা রেখে নিজেও অনেকটা আপ্লুত হয়ে পড়েন তারেক রহমান। বক্তব্যে তিনি আবারও আসার কথা বলেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পক্ষ তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে লেখালেখি শুরু করেছে। এখন এ নিয়ে ফেসবুকে পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা চলছে। তার সহপাঠীদের তালিকাও প্রকাশ পেয়েছে।

যদিও তারেক রহমানের উচ্চশিক্ষা শেষ করার বিষয়টি বিএনপির পক্ষ থেকেও কখনো লুকানো হয়নি। আবার এখনকার ভার্চুয়াল বিদ্রূপেরও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ আসেনি। ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর দেশে ফিরে ত্রয়োদশ নির্বাচনে অংশ নিয়ে তারেক রহমান হলফনামায়ও বাড়তি কিছু উল্লেখ করেননি। সেখানে তিনি শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘এইচএসসি পাস’ লিখেছেন। তবে তারেক রহমানের সরাসরি শিক্ষক এবং ক্যাম্পাসের তখনকার সময়ের অগ্রজ-অনুজরা বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব। ক্যাম্পাস জীবনে তারেক রহমানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা নিয়ে তাঁরা স্মৃতিচারণও করছেন।
বিজ্ঞাপন
তারেক রহমানের উচ্চশিক্ষা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে নানা বিতর্ক ও অপপ্রচার চললেও এর প্রকৃত সত্য উঠে এসেছে তার সরাসরি শিক্ষক অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারীর বক্তব্যে। ঢাকা মেইলকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, তারেক রহমান কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রই ছিলেন না, বরং প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তাকে ভিন্নভাবে শিক্ষাজীবন শেষ করতে হয়েছে।
শিক্ষকের বয়ানে ছাত্র তারেক রহমানকে নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য
ফেসবুকের অপপ্রচার নিয়ে ঢাকা মেইলের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নুরুল আমিন বেপারীর সঙ্গে। তিনি বলেন, তারেক রহমান আশির দশকের মাঝামাঝি (খুব সম্ভবত ৮৫-৮৬ সেশনে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। পরবর্তীতে মাইগ্রেশন করে তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অনার্স শুরু করেন। ওই সময় রাষ্ট্রবিজ্ঞান ছিল তার সাবসিডিয়ারি (সহযোগী) বিষয়, যার সুবাদে তিনি আমার সরাসরি ছাত্র ছিলেন।
কথার এক পর্যায়ে নুরুল আমিন বেপারী তারেক রহমানকে নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তৎকালীন এরশাদ সরকারের স্বৈরশাসন ও ক্যাম্পাসের চরম অস্থিরতার কারণে তারেক রহমান অনার্স সম্পন্ন করতে পারেননি। জীবননাশের ঝুঁকি ও উত্তপ্ত পরিবেশে নিয়মিত ক্লাস করা অসম্ভব ছিল। আরেকটি বিষয় হয়তো অনেকেই জানেন না। সেটা হলো- তারেক রহমান একটি কলেজ থেকে বিএ (পাস কোর্স) সম্পন্ন করে গ্র্যাজুয়েট হন। তবে কোন কলেজ ছিল সেটা আমার জানা নেই। এরপর তিনি ১৯৯০ সালের নির্বাচনের আগে পুনরায় ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্স প্রিলিমিনারিতে ভর্তি হয়েছিলেন।’
অধ্যাপক নুরুল আমিন স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘ছাত্র হিসেবে তারেক রহমান ছিলেন অত্যন্ত মার্জিত, শান্ত ও বিনয়ী। তারেক রহমান পড়াশোনার বিষয়ে আলাপ করতে প্রায়ই কলাভবনের ১১০৫ নম্বর রুমে আমার কাছে আসতেন। তখনকার উত্তাল সময়ে একজন রাষ্ট্রপতির সন্তান হয়েও তিনি সাধারণ ছাত্রের মতো বিনীতভাবে টেস্টিমোনিয়ালসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রাদি জমা দিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক প্রয়াত রাজিয়া আক্তার বানু তারেক রহমানের এই বিনয়ী আচরণের প্রশংসা করে নিবন্ধও লিখেছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারেক রহমানের শিক্ষাজীবন নিয়ে বিদ্রূপের ঘটনাকে ‘দুঃখজনক’ হিসেবে অভিহিত করেন এই শিক্ষক। তিনি বলেন, তারেক রহমান কখনোই কোনো ভুয়া ডিগ্রি দাবি করেননি। এমনকি তার হলফনামাতেও তিনি এইচএসসি পাসের কথা লিখেছেন। এর কারণ হতে পারে সেই সময় হয়তো গ্র্যাজুয়েশন সার্টিফিকেটটি তাৎক্ষণিক তার হাতে ছিল না বা তিনি বিতর্কে জড়াতে চাননি।
ঢাবিতে তারেক রহমানের দেওয়া বক্তব্যের সূত্র ধরে নুরুল আমিন বলেন, তিনি বলেছেন ৩৫ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলেন। হিসাব করলে দেখা যায়, ১৯৯০-৯১ সালের পর তিনি আর ক্যাম্পাসে আসেননি।

ঢাবিতে ভর্তি ও উত্তাল ক্যাম্পাস
তথ্য অনুযায়ী, তারেক রহমান যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন, তখন এরশাদবিরোধী আন্দোলনের চরম পর্যায় ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তখন পড়াশোনার পরিবেশের চেয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সেশনজট ছিল প্রকট।
তৎকালীন শিক্ষার্থী ও বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. হিমাদ্রি শেখর চক্রবর্তী ওই সময়ের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, সেই সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে শিক্ষা কার্যক্রম এতটাই ব্যাহত হতো যে, পড়াশোনার স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
ওই পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের ঝুঁকির কথা তুলে ধরতে গিয়ে নুরুল আমিন বেপারী বলেন, সে সময় ক্যাম্পাসে অস্ত্রের প্রভাব ও গোলাগুলি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। স্বাভাবিকভাবেই জিয়াউর রহমানের সন্তান হওয়ায় তারেক রহমানের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কা ছিল।
সহপাঠী ও ঢাবির সাবেক শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচারণ
ফেসবুকে নানা আলোচনার মধ্যে তারেক রহমানের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন নিয়ে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও বর্তমান শিক্ষক অধ্যাপক আসিফ নজরুল। ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেছেন, তারেক রহমান অবশ্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।
আসিফ নজরুল বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন কি না, এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। তিনি অবশ্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। তিনি ১৯৮৫-৮৬ ব্যাচে আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন, মাস দুয়েক ক্লাসও করেছেন। আইন বিভাগের ওপরের ব্যাচের একজন ছাত্র হিসেবে তখনই বিষয়টা জানতাম আমি। তারেক রহমানের সহপাঠীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন অতি পরিচিত ব্যক্তিত্ব রয়েছেন। সাবেক স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরী, বর্তমান উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং আপিল বিভাগের বর্তমান বিচারপতি ফারাহ মাহবুব তারেক রহমানের সহপাঠী ছিলেন।
তারেক রহমানের পড়াশোনা চালিয়ে না যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, তখন এরশাদের প্রবল শাসন ছিল। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণেই সম্ভবত তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়।
এদিকে তারেক রহমানের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে পড়েছেন আলী মোস্তাফা খান। ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, এ বিষয় নিয়ে সংশয়, সন্দেহ বা প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ১৩তম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। আমিও একই ব্যাচের ছাত্র ছিলাম। অর্থাৎ, তিনি আমার ক্লাসমেট ছিলেন। ক্লাসরুমে তার সঙ্গে আমার একাধিকবার কথাও হয়েছে। ড. আসিফ নজরুল যে তথ্য দিয়েছেন, সেটা শতভাগ সঠিক।
তারেক রহমানের ভর্তির দিনের স্মৃতিচারণ করেছেন সাবেক শিক্ষার্থী মো. শাহ ওয়ালী উল্লাহ। তিনি বলেন, ১৯৮৫-৮৬ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়ার জন্য ১৯৮৬ সালের জুনের শেষে কলা ভবনের নিচে ভাইবার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। হঠাৎ নিচে কিছু কাগজপত্র পাই। দেখি নাম তারেক রহমান, পিতা জিয়াউর রহমান। কিছুক্ষণ পরে দেখি একজন হালকা-পাতলা যুবক ফাইল খুঁজছেন। আমি ফাইলটি এগিয়ে দিলে তিনি ধন্যবাদ জানান। তখনই তাঁর চেহারার সঙ্গে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মিল খুঁজে পাই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদও বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের দেশে যারা সরকারপ্রধান হয়েছেন, একমাত্র হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ছাড়া আর কারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত ডিগ্রি নেই (তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তী সরকার বাদে)। শেখ মুজিবুর রহমান আইন বিভাগে ভর্তি হয়ে ড্রপ আউট হন। শেখ হাসিনা বাংলা বিভাগে অনার্সে ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু দ্বিতীয় বর্ষে বিয়ের পর পড়াশোনা অসমাপ্ত থেকে যায় (পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে পাস কোর্সে বিএ পাস করেন)। তারেক রহমানও একইভাবে ভর্তি হয়েছিলেন এবং ড্রপ আউট হন।
বিইউ/এএস




