রোববার, ১০ মে, ২০২৬, ঢাকা

আল আকসা-কাবার আদলে ঢাকায় ‘মসজিদ আল মুস্তাফা’

মাহফুজুর রহমান
প্রকাশিত: ১০ মে ২০২৬, ০৪:৫৫ পিএম

শেয়ার করুন:

M
রাজধানীর ১০০ ফিটে মাদানি এভিনিউয়ে ইউনাইটেড সিটিতে অবস্থিত মসজিদ আল মুস্তাফা। ছবি- ঢাকা মেইল

ঢাকার নগরায়নের ভিড়ে ব্যতিক্রমী স্থাপত্যশৈলীর এক দৃষ্টিনন্দন সংযোজন ‘মসজিদ আল মুস্তাফা’। আল আকসা মসজিদ ও কাবা শরীফের নান্দনিক অনুপ্রেরণায় নির্মিত এই মসজিদটি ইতোমধ্যে ধর্মপ্রাণ মুসল্লি ও স্থাপত্যপ্রেমীদের আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

অবস্থান ও পরিসর


বিজ্ঞাপন


মসজিদটি রাজধানীর ১০০ ফিটে মাদানি এভিনিউয়ে ইউনাইটেড সিটিতে অবস্থিত। ইউনাইটেড ইউনিভার্সিটির প্রবেশমুখে মসজিদটির অবস্থান। মসজিদের একদিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, অপরদিকে ইউনাইটেড প্রকল্প।

মসজিদ আল মুস্তাফা ঢাকার একটি পরিকল্পিত আবাসিক এলাকায় নির্মিত, যেখানে আশেপাশে রয়েছে বসতবাড়ি, ছোট বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সহজ যোগাযোগের সুবিধা থাকায় দূর-দূরান্ত থেকেও মুসল্লিরা এখানে নামাজ আদায়ে আসেন।

M2

মসজিদটি প্রায় কয়েক হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে। মূল নামাজঘর ছাড়াও রয়েছে খোলা প্রাঙ্গণ, ওজুখানা, পৃথক প্রবেশপথ এবং নারীদের জন্য আলাদা নামাজের ব্যবস্থা।
 
স্থাপত্যশৈলী: আল আকসা ও কাবার সংমিশ্রণ


বিজ্ঞাপন


পবিত্র কাবার আদলে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে। দেখলে মনে হবে মসজিদটির নির্মাণ কাঠামোতে কাবা শরীফের ছোঁয়া লেগে আছে। চোখধাঁধানো এ মসজিদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো- সামনের দিকে কালো রঙের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পবিত্র কাবার আকৃতি। দেয়ালে সোনালি রঙ দিয়ে লেখা হয়েছে আল্লাহর নাম এবং তার প্রিয় বান্দা শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নাম। এর সৌন্দর্য দূর থেকেই দেখা যায়। 

মসজিদটির ভেতরে মিম্বরের দেয়ালের ডিজাইনও একই। ওপরের দিকে বড় করে সোনালি রঙ দিয়ে লেখা হয়েছে- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.)। নামাজের কাতারে বেশ কয়েকটি বেঞ্চ রাখা হয়েছে। যা অন্য কোনো মসজিদে দেখা যায় না। কেউ ক্লান্ত হলে বসতে পারেন। আবার কেউ হেলানও দিতে পারেন। 

পাঁচতলা বিশিষ্ট এ মসজিদে আলাদা কোনো জানালা নেই। এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যা প্রাকৃতিক আলোয় ভরপুর। দেশের অন্য কোনো মসজিদের প্রতিটি ফ্লোর থেকে ইমাম-খতিবকে দেখা যায় না। কিন্তু মসজিদ আল মোস্তফার প্রতিটি ফ্লোর থেকেই ইমাম-খতিবকে দেখা যায়। শুধু তাই নয়, নারীদের জন্য রয়েছে আলাদা নামাজের জায়গা। মসজিদটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর নকশাগত বৈশিষ্ট্য।

M3

গম্বুজ ও মিনার: গম্বুজে আল আকসা মসজিদের আদলে সরল কিন্তু গাম্ভীর্যপূর্ণ নকশা রাখা হয়েছে। মিনারগুলোতে আরবি জ্যামিতিক অলংকরণ ব্যবহার করা হয়েছে।

বাহ্যিক রঙ ও কাঠামো: সাদা ও হালকা বেইজ রঙের প্রাধান্য, যা পবিত্রতা ও প্রশান্তির প্রতীক।

অভ্যন্তরীণ নকশা: কাবা শরীফের অনুপ্রেরণায় কালো ও সোনালি রঙের ব্যবহার দেখা যায়। মিহরাব অংশে সূক্ষ্ম ক্যালিগ্রাফি এবং কোরআনের আয়াত খোদাই করা হয়েছে।

ফ্লোরিং ও আলো: মার্বেল পাথরের মেঝে, প্রাকৃতিক আলো প্রবেশের জন্য বড় জানালা এবং ঝাড়বাতির আলোকসজ্জা আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করে। এই সংমিশ্রণ মসজিদটিকে শুধু উপাসনালয় নয়, একটি নান্দনিক স্থাপত্য নিদর্শনে রূপ দিয়েছে।
 
ধারণক্ষমতা ও সুবিধা

পুরুষ-নারী মিলিয়ে একসঙ্গে প্রায় ১১ হাজার মানুষ নামাজ আদায় করতে পারেন এ মসজিদে। নান্দনিক ডিজাইনের কারণে এটি এখন শুধু মসজিদ নয়, পরিণত হয়েছে পর্যটন কেন্দ্রে। দেশের বিভিন্ন এলাকার বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রতিদিন দেখতে আসেন মসজিদটির অপরূপ সৌন্দর্য। 

মসজিদের চারপাশে চারটি খেজুর গাছ লাগানো হয়েছে। যার কোনোটিতে খেজুরও দেখা যায়। রয়েছে চোখজুড়ানো পানির ফোয়ারা। দর্শনার্থীরা বিমোহিত হয় এর গঠন কাঠামো আর চারপাশের সবুজেঘেরা প্রকৃতির ছোঁয়ায়। 

মসজিদ আল মোস্তফায় রয়েছে দুটি চলন্ত সিড়ি। লাগানো হয়েছে চমৎকার ঝাড়বাতি, যা এখনো চালু হয়নি। চীন থেকে আনা হয়েছে মেঝেতে বিছানোর কার্পেট। লাগানো হয়েছে উন্নত মানের সাউন্ড সিস্টেম। সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনের মাধ্যমে শীতল রাখা হয় মসজিদ। আকর্ষণীয় করে তৈরি করা হয়েছে মসজিদের অজুখানা। যেখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি বেসিন।

মসজিদটিতে একসঙ্গে এক হাজারের বেশি মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। জুমার দিন ও ঈদের সময় এই সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। মসজিদটিতে রয়েছে প্রশস্ত ওজুখানা (আধুনিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সহ), নারীদের জন্য আলাদা নামাজের জায়গা, সাউন্ড সিস্টেম ও ইমাম মাইক্রোফোন ব্যবস্থা, প্রতিবন্ধীবান্ধব প্রবেশপথ (র‍্যাম্প)।
 
পার্কিং ও আশপাশের ব্যবস্থাপনা

যারা গাড়ি নিয়ে নামাজে আসেন, তাদের জন্য রয়েছে স্বস্তি। কারণ মসজিদের নিচে বিশাল পার্কিংয়ে ১০৫টি গাড়ি রাখা যায়। ঢাকার প্রেক্ষাপটে পার্কিং একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও মসজিদ আল মুস্তাফায় এই বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

মসজিদের সামনে ও পাশ ঘেঁষে সীমিত পার্কিং সুবিধা রাখা হয়েছে । আশেপাশের খোলা জায়গা ও রাস্তা ব্যবহার করে জুমার দিনে অতিরিক্ত যানবাহন রাখা হয়।
 
সামাজিক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম

মসজিদটি শুধু নামাজের স্থান নয়, বরং একটি কমিউনিটি সেন্টার হিসেবেও গড়ে উঠছে। মসজিদে নিয়মিত কোরআন শিক্ষা ও তাফসির ক্লাস, শিশু-কিশোরদের জন্য মক্তব, ইসলামী আলোচনা ও মিলাদ মাহফিল ছাড়াও রমজানে ইফতার ও তারাবির আয়োজন করা হয়।

Untitled-1_copy

স্থানীয় মাওলানা আব্দুল করিম বলেন, ‘মসজিদ আল মুস্তাফা শুধু নামাজ পড়ার জায়গা নয়, এটি শিক্ষামূলক ও সামাজিক কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করবে। আমরা এখানে কোরআন শিক্ষা, তেলাওয়াত, ও শিশুদের ইসলামিক ক্লাস নিয়মিত পরিচালনা করব।’

স্থানীয় ব্যবসায়ী শাহিনুর রহমান জানান, এ ধরনের মসজিদ আমাদের এলাকায় খুব প্রয়োজন ছিল। এটা আমাদের কমিউনিটির জন্য গর্বের বিষয়। মসজিদটি শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের কেন্দ্র নয়, শিশুদের জন্যও এটি একটি শিক্ষা ও শৃঙ্খলার জায়গা।

মসজিদ আসা তরুণী নুরজাহান বেগম বলেন, মসজিদে প্রবেশ করলে সত্যিই আল্লাহকে আরও কাছে অনুভব হয়। এখানে এলে শান্তি ও স্থিরতা পাওয়া যায়। এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের চাপ কমাতে সাহায্য করছে।

আধ্যাত্মিকতা ও নান্দনিকতার মিলন

জনশ্রুতি রয়েছে, মসজিদ আল মোস্তফার নির্মাণ খরচ তিনশ’ কোটি টাকার বেশি। সুউচ্চ বিশেষ ধরনের একটি গম্বুজ রয়েছে। যার রঙ সোনালি। গম্বুজ ও পাশে থাকা বিশাল উচ্চতার মিনারের কাজ এখনো শেষ হয়নি। গম্বুজ ও মিনারটি মসজিদের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। রাতে যখন মসজিদের সব বাতি জ্বলে ওঠে, তখন তৈরি হয় বিমুগ্ধ এক অপার্থিব পরিবেশ। যে পরিবেশ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে সৎ পথে চলতে, সততা আর বিবেক দিয়ে নতুন জীবন গড়তে।
 
মসজিদ আল মুস্তাফা প্রমাণ করেছে, একটি উপাসনালয় শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার জায়গা নয়, এটি হতে পারে শিল্প, স্থাপত্য ও কমিউনিটির এক মিলনস্থল।

ঢাকার ব্যস্ত জীবনের মাঝে এই মসজিদটি একদিকে যেমন আধ্যাত্মিক প্রশান্তি এনে দিচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি ইসলামী স্থাপত্যের সৌন্দর্য নতুনভাবে উপস্থাপন করছে।

এম/এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর