- কনস্টেবল পদে কম বেতন, সংসার চলে কীভাবে?
- বাড়িভাড়ার টাকায় একটি কক্ষও মেলে না
- জীবন বাঁচাতে বেশির ভাগ সদস্য পরিবার রাখেন গ্রামে
- কম বেতনে সন্তানদের পুষ্টিকর খাবার দেওয়াও কঠিন
জহুরুল (ছদ্মনাম) গত ২২ বছর ধরে পুলিশে চাকরি করছেন। ঢাকায় আছেন এক যুগের বেশি সময়। প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার টাকা বেতনে চাকরি শুরু করেছিলেন। দীর্ঘ সময়ে তাঁর বেতন বেড়ে এখন ৩৮ হাজার টাকা হয়েছে। দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে। ২২ বছর আগে কনস্টেবল পদে পুলিশে যোগ দিলেও এত দিনে তাঁর র্যাংক লাগেনি। ফলে বেতনও তেমন বাড়েনি।
বিজ্ঞাপন
জহুরুল বলেন, খুব কষ্ট হয়। বউ-বাচ্চাকে কাছে রাখতে পারি না। সরকার থেকে যে বেতন পাই, তা দিয়ে সংসারের খরচ চালাতেই সব শেষ হয়ে যায়। এরপর ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা, অসুস্থতা ও বাড়তি খরচ তো আছেই। মেয়েটা দামি জামা, খেলনা, সাইকেল চায়। বাবা হিসেবে সেগুলো কিনে দেওয়া দায়িত্ব। কিন্তু টাকা কোথায়? তাই মেয়েকে নানা কথা বলে বুঝিয়ে রাখতে হয়।
জহুরুলের মতো হাজারো কনস্টেবল অল্প বেতনে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। কিন্তু এসব কষ্টের কথা লজ্জায় বাইরের কাউকে বলতে পারেন না তাঁরা।
কনস্টেবলরা বেতন পান কত?
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ পুলিশে যোগদানের পর একজন কনস্টেবল শুরুতে ৯ হাজার টাকা বেসিক পান। সর্বসাকল্যে জেলা পর্যায়ে ১৪ হাজার ৩২০ টাকা এবং ডিএমপিতে সাড়ে ১৬ হাজার টাকা পান। তবে সেটিও মাঝে-মধ্যে মেলে। ফান্ড না থাকলে আবার বন্ধ হয়ে যায়, পরে চালু হয়। মূল বেতনের বাইরে পুলিশে যারা বিবাহিত, তাঁরা মূল বেতনের ৪০ থেকে ৫৫ শতাংশ বাড়িভাড়া পান। আর অবিবাহিতরা পান ২০ শতাংশ। টিফিন বাবদ ৩০০ টাকা (দিনে ৬ টাকা, যা একটি সিঙাড়ার দামও নয়), চিকিৎসা ভাতা ১ হাজার ৫০০ টাকা, ধোলাই ভাতা ৩০০ টাকা, অস্ত্র বহন বাবদ ভাতা ১০০ টাকা এবং ঝুঁকি ভাতা সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫০০ টাকা। এর বাইরে টিএসডিএ পেলেও তা সবাই পান না। যারা অফিসিয়াল কাজ করেন, তাঁদের মূল বেতন ও আনুষঙ্গিক ভাতা মিলিয়েই চলতে হয়। তবে বছর শেষে মাত্র ৫ শতাংশ বেতন বাড়ানো হয়। বেতনের শুরুতে যা মাত্র ৪৫০ টাকাও হয় না। আবার প্রতিবছর পদোন্নতি হলেও বেতন হাজার টাকা ছাড়াতে দুই বছর অপেক্ষা করতে হয়।
আরও পড়ুন: পুলিশ সপ্তাহ শুরু রোববার, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
বিজ্ঞাপন
এ বিষয়ে কথা হয়েছে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে নিয়োজিত অর্ধশতাধিক অবিবাহিত কনস্টেবলের সঙ্গে। তাঁরা প্রত্যেকে জানিয়েছেন, ঢাকায় সকালে ডিউটি পড়লে পুলিশ থেকে নাশতা ও দুপুরের খাবার দেওয়া হয়। কিন্তু এর বাইরেও তাঁদের চা-নাশতা করতে হয়। বর্তমান বাজারে একটি সিঙাড়ার দাম ১০ টাকা। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ডিউটি করলে অন্তত এক কাপ চা, এক বোতল পানি ও একটি সিঙাড়া তো খেতে হয়। সেই হিসেবে বর্তমান বাজারদরে নাশতা বাবদ প্রতিদিনের বাজেট ১০ টাকা কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়।
নিজের বেতনে সংসারই চলে না অনেকের
সিয়াম (ছদ্মনাম) ঢাকায় কর্মরত আছেন। তিনি সব মিলিয়ে এখন ২৬ হাজার টাকা বেতন পান। বেতনের ১৫ হাজার টাকা বাড়িভাড়া, বাকি টাকা বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস, দুধ বিল ও ছেলেমেয়েদের পড়াশোনায় চলে যায়। তাঁর বেতনে সংসারের অন্যান্য খরচ না হওয়ায় স্ত্রীর বেতনের টাকা যোগ করে চলেন তিনি। তাঁর স্ত্রীও পুলিশে চাকরি করেন। তাঁর মতো অনেকে সংসার চালাতে না পেরে স্ত্রী ও সন্তানকে গ্রামে রাখছেন। কেউ কেউ স্ত্রীকে কোনো স্কুলের আয়া বা কোনো প্রতিষ্ঠানের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে চাকরি করাচ্ছেন। আর যারা সেটিও পারছেন না, তাঁরা পড়ছেন বিপাকে। স্ত্রী ও সন্তানকে গ্রামে রেখে নিজে থাকছেন ব্যারাকে। তবুও তাঁদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
আরও পড়ুন: পরীক্ষায় পাস করেও মেলে না পদোন্নতি, পুলিশে বাড়ছে হতাশা
সিয়াম বলছিলেন, পুলিশ থেকে যে বাসাভাড়া দেওয়া হয়, সেটা দিয়ে ঢাকায় একটি রুমও নেওয়া কঠিন। ফলে বেশির ভাগ সদস্য তাঁদের পরিবারকে গ্রামে রাখছেন। এতে স্ত্রীদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে। সন্তানরা বাবার আদর, স্নেহ ও ভালোবাসা ছাড়া বড় হচ্ছে। সন্তানদের পড়ালেখার খোঁজখবর নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অনেকে পড়াশোনা করতে পারছে না। আবার কনস্টেবলদের ছেলে-মেয়েরা পড়াশোনা করলেও অর্থের অভাবে বেশি দূর এগোতে পারছে না। এই বাস্তবতা বাংলাদেশ পুলিশের অনেকে জানেন, কিন্তু বেতন বৃদ্ধি নিয়ে কেউ কোনো কথা বলেন না।

বিবাহিত কনস্টেবলরা জানিয়েছেন, তাঁদের যে বাসাভাড়া দেওয়া হয়, তাতে দুই রুম নিয়ে থাকা যায় না। তাই বাড়তি টাকা যোগ করে রুম ভাড়া নিয়ে থাকেন। কিন্তু দেখা যায়, দুই রুমের বাসা নিতে গিয়ে সংসারের খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ঢাকায় থাকা কনস্টেবল সদস্যরা যেদিকে রুমভাড়া কম, সেদিকে বাসা নেন। অনেকে সাবলেটে পরিবার নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন।
বাড়তি ডিউটির চাপ, ছুটি কম
উত্তরার একটি থানায় কাজ করেন জিয়া (ছদ্মনাম)। তিনি দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে পুলিশের চাকরি করছেন। তিনি বলছিলেন, এমন একটি বিভাগে চাকরি করি, যেখানে কোনো ছুটি নেই, বাড়তি ডিউটি করলে ভাতা নেই, ডিউটি কত ঘণ্টা হবে তার ঠিক নেই, অসুস্থ হলেও ছুটি পাওয়া যায় না। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন না দেখালে ছুটি মঞ্জুর হয় না। আরও অনেক সমস্যা তো আছেই।
আরও পড়ুন: পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠাই অগ্রাধিকার: প্রধানমন্ত্রী
উত্তরের জেলা রংপুরের একটি থানায় কাজ করেন আবদাল (ছদ্মনাম)। তিনি বলছিলেন, লোকজন তো মনে করে বাংলাদেশ পুলিশে যারা চাকরি করেন, তাঁদের শুধু টাকা আর টাকা। গ্রামে গেলে বন্ধুরা বলে, পুলিশে তো মানুষ টাকা দিয়ে যায়, তোদের বেতন ভালো। আজকে চায়ের বিলটা তুই দে। কিন্তু তাঁদের তো লজ্জায় বলতে পারি না, আমার বেতনটা ইটভাটার শ্রমিকের চেয়েও কম। এ লজ্জা আমরা কোথায় রাখব? এমন বেতন পাই, তা দিয়ে সংসার চালিয়ে ছেলেমেয়েদের শখ-আহ্লাদ মেটানো যায় না।
ডিএমপিতে কর্মরত একজন কনস্টেবল বলছিলেন, গত তিন বছর ধরে ব্যারাকে আছি। কখনো রাজনৈতিক মিছিল, কখনো সমাবেশ, কখনো প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল নিরাপত্তা, আবার কখনো মারামারি-সংঘর্ষে নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত থাকি আমরা। এ সময়গুলোতে খুব সকালে বের হতে হয়। সব মিলিয়ে আট ঘণ্টার ডিউটি থাকলেও সেটা ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত চলে যায়। কখনো কখনো ১৮ ঘণ্টাও ডিউটি করতে হয়। ফলে আরাম-বিরাম হয় না।
কনস্টেবলদের অনেকে জানিয়েছেন, বাসাভাড়া ও পরিবারের খরচ মিটিয়ে প্রতি মাসে এক কেজি গরুর মাংসও কিনতে পারেন না অনেকে। আর ডিম কিনলেও সেটা খুব সামান্য। ফলে তাঁদের ও সন্তানদের পুষ্টির ঘাটতি থেকে যায়। পুষ্টিকর খাবার তাঁদের পাতে ওঠে না।
কনস্টেবলদের দাবি, তাঁদের বেতন কাঠামো বাড়ানো হোক। পাশাপাশি সুযোগ-সুবিধাও বাড়ানো হোক। বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হোক, যাতে তাঁরা সুস্থ ও সুন্দর জীবন যাপন করতে পারেন। তবে অধিকাংশ কনস্টেবলের অভিমত, বেতন কম হওয়ায় অনেকে অসৎ হতে বাধ্য হন। কর্মজীবনে বিপথগামী হচ্ছেন অনেকে। তাঁদের বেতন বাড়ানো হলে তাঁরা আরও মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে পারবেন এবং ব্যক্তিগত জীবনে সচ্ছল হবেন বলে মনে করেন তাঁরা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি আকরাম হোসেনকে গত দুই দিন একাধিকবার কল ও ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি।
এমআইকে/এআর




