২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে অনুষ্ঠিত সমাবেশকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলার জটিলতা এখনো পিছু ছাড়েনি হেফাজতে ইসলামীর সাবেক নেতা ফখরুল ইসলামের। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও একাধিক মামলার ভার বইতে হচ্ছে তাকে।
জানা যায়, ওই সময় হেফাজতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরীর প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন ফখরুল ইসলাম। শাপলা চত্বরের সমাবেশে অংশগ্রহণের অভিযোগে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তার বিরুদ্ধে মোট ২৩টি মামলা দায়ের করে পুলিশ।
বিজ্ঞাপন
সোমবার ঢাকা মেইলের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই প্রতিবেদককে এসব কথা জানান।
ফখরুল বলছিলেন, মামলা তো শেষ হলো না। অন্তবর্তী ও নতুন সরকার আসার পর কিছু মামলা থেকে রেহাই পেয়েছি। কিন্তু বাকি মামলা তো শেষ হয়নি। ফলে বাকি মামলাগুলোতে আর কতদিন ভুগতে হবে জানি না।
জানা গেছে, ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে ইসলাম অবমাননাকারীদের শাস্তি ও ব্লাসফেমি আইন (ধর্ম অবমাননা বিরোধী আইন) প্রণয়নের দাবিতে ১৩ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে জড়ো হন কয়েক লাখ মানুষ। তারা সরকার পতনের জন্য ঢাকায় জড়ো হয়েছেন অভিযোগ তুলে সেদিন রাতে সেখানে অপারেশন চালায় পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি।
অভিযানে বাহিনীরা সদস্যরা ছিলেন অস্ত্রসহ কিন্তু সেখানে জড়ো লোকজনের হাতে কোনও অস্ত্র ছিল না। ফলে তারা বাহিনীর অভিযানে নিরুপায় হয়ে পড়েছিলেন। তাদেরকে সরাতে টিয়ারসেল, রাবারবুলেট এমনকি গুলি করা হয়। এতে অন্তত সেদিন দুই হাজার মানুষ আহত হন। যার মধ্যে ৬৫ জনের মৃত্যুর তথ্য ছিল হেফাজতে ইসলামের কাছে। তবে সেসব নিহতের পরিবারের দেওয়া নম্বরগুলোর অধিকাংশই এখন বন্ধ রয়েছে। ফলে ভুক্তভোগীদের খুঁজে পাওয়া দুস্কর। তিনি বলছিলেন, আমরা ৫ মে পরদিন ৩৬ জনের মৃত্যুর তালিকা করেছিলাম।
বিজ্ঞাপন
পরে মানবাধিকার সংস্থা অধিকারসহ আরও অনেকে তালিকা প্রকাশ করে। আর আহত হয়েছিল প্রায় কয়েক হাজার। তাদের বেশিরভাগ এসেছিলেন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে। আর সবাই ছিলেন নিরস্ত্র। কিন্তু সরকার সেই সময় তাদের ওপর সন্ত্রাস বিরোধী মামলা দিলো। অনেক নেতাকর্মীকে জেলে নিলো। ২৩ মামলায় ৩২ মাস জেলে ছিলেন ফখরুল: তিনি বলছিলেন, আমি সাত বছর বাসায় থাকতে পারিনি। পালিয়ে থাকতাম।
সাত বছর পর ২০২১ সালে যখন গ্রেফতার হলাম এরপর টানা ৩২ মাস জেলেই ছিলাম। আমার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক, সন্ত্রাস দমন আইনসহ নানা মামলা দেওয়া হয়েছিল। জেলে আমার সঙ্গে বর্তমান সাংসদ আমীর হামজা, মাওলানা মামুনুল হক, জোনায়েদ বাবুনগরীসহ আরও অনেকে ছিলেন। সেদিনের স্মৃতি চারণ করে তিনি বলেন, সমাবেশের জড়ো হওয়া মানুষজনের ওপর গণহত্যা চালানোর পরও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পুলিশ থেমে ছিল না।
তারা পরবর্তীতে হেফাজতসহ বিভিন্ন সেদিন সমসাবেশে অংশ নেওয়া ও নেতৃত্ব প্রদানকারী ব্যক্তিদের হয়রানি করতে বিভিন্ন মামলা দিতে শুরু করে। আমাকেও সেসব মামলায় জড়ানো হয়। যেহুতু আমি সেই সময়ে হেফাজতের ঢাকা মহানগরীর প্রচার সম্পাদক ছিলাম। বাসায় থাকতে পারিনি। স্ত্রীরও খোঁজ খবর নিতে পারতাম না। সারাক্ষণ পুলিশ নজর রাখতো। ফলে বাসায় যাওয়া যেতো না। এভাবে সাত বছর লুকিয়ে কাটাইছি।
তিনি বলছিলেন, তারা আমাদেরকেই মারলো আবারও আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিলো। এইসব মামলায় অনেকে সর্বশান্ত হয়ে গেছে। আমরা কেউ বাসায় থাকতে পারিনি। এখন সেই দিনগুলোর কথা মনে হলো ভয় লাগে। ফখরুলের চোখে সেদিনের মতিঝিল গণহত্যা: ফখরুল বলছিলেন, সন্ধ্যার দিকে লালবাগ থেকে হেফাজতের আমীর মতিঝিলের আসতে চাইলে গোয়েন্দারা জানালো সেখানে গেলে বিপদ হতে পারে। এজন্য মুরব্বী আর সেখানে যেতে পারলেন না।
কিন্তু গভীর রাতে তিন বাহিনী মিলে তারা গণহত্যায় মেতে উঠলো। সেদিন আমরা সমাবেশের জন্য গেলে রাত আড়াইটার দিকে র্যাব, বিজিবি ও পুলিশ ইডেন মোড়ের দিক থেকে আসতে শুরু করে। আমরা তাদের টিয়ারসেল ও রাবারবুলেটের কারণে কোনভাবেই টিকতে পারিনি। অভিযানটা শুরু হয় ২ টা ৩০ মিনিটে। চলে ভোর পর্যন্ত। অভিযান শুরুর পরপরই তারা মঞ্চের দিকে আসতে শুরু করে।
তিন বাহিনী (বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ) মিলে কয়েক হাজার সদস্য ছিল। ফলে তাদের কাছে এত লোকজন থাকলেও আমরা নস্যি ছিলাম। সেই মঞ্চে বাবু নগরী, জুনায়েদ আল হাবিব, জাফর উল্লাহসহ আরও অনেকে ছিলেন। আমরা ওই সময় কি করব বুঝেও উঠতেও পারছিলাম না। এরপর বাবুনগরী ও জাফর উল্লাহ হুজুরকে গণভবনের দিকের রাস্তায় এগিয়ে দিয়ে আসলাম। কিন্তু তখন শুধু রক্ত আর লাশ।
মানুষ রাস্তায় পড়ে পড়ে আছে। তারা জীবিত কি মৃত কিছু বোঝার উপায় নাই কারণ তখন তো জীবন নিয়ে দৌঁড়াচ্ছিল সবাই। আমি রাস্তায় পড়ছি আর উঠতেছি। এভাবে আবারও শাপলা চত্বরের দিকে গিয়ে দেখতে পেলাম গোল শাপলার প্রতীকটার নিচে ছয় থেকে সাতজন পানিতে পড়ে ভাসছে। তখন তো কাউকে উদ্ধারেরও উপায় নাই।
অগত্যা আমি কমলাপুরের দিকে ছুটতে শুরু করলাম। বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ব দিকের রাস্তা ধরে কিছুদূর যেতেই এক ব্যক্তি দেখে আমাকে দ্রুত তার বাসায় ঢুকতে দিলো। এরপর সারা রাত সেই বাসায় ছিলাম। ভোরে মসজিদে গিয়ে দেখি ফ্লোর রক্তে ভিজে যাচ্ছে। অনেকে রক্তাক্ত অবস্থায় ফ্লোরে পড়ে আছেন।
কিন্তু কাউকে যে হাসপাতালে নিব সেই অবস্থাও নেই। সেখান থেকে কোনো মতে কাকরাইল হয়ে রামপুরা হয়ে কামরাঙ্গীরচরের মাদ্রাসায় চলে আসি। কিন্তু পরদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখি হাজার হাজার মানুষ আহত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল হাসপাতালের বাইরে থেকে চিকিৎসকরা এসে সেবা দিচ্ছে।
এমআইকে/এআরএম




