শুক্রবার, ১ মে, ২০২৬, ঢাকা

যান্ত্রিকতার দাপটে অস্তিত্ব সংকটে ঠেলাগাড়ি, অনিশ্চয়তায় শ্রমিকরা

মাহফুজুর রহমান
প্রকাশিত: ০১ মে ২০২৬, ১২:২৫ পিএম

শেয়ার করুন:

যান্ত্রিকতার দাপটে অস্তিত্ব সংকটে ঠেলাগাড়ি, অনিশ্চয়তায় শ্রমিকরা

একসময় দেশের সর্বত্র পণ্য পরিবহনের সহজ ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যম ছিল ঠেলাগাড়ি। এই বাহনই ছিল হাজারো নিম্নআয়ের মানুষের জীবিকার ভরসা এবং নগরজীবনের এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। যান্ত্রিক পরিবহনের আগের সময়ে বাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, নির্মাণসামগ্রীর ইট-বালু কিংবা শহরে বাসা বদলের আসবাব-সবকিছুই ঠেলাগাড়িতে করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে দিতেন শ্রমিকরা।

কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই চেনা দৃশ্য এখন অনেকটাই কমে এসেছে। একসময় শহরের প্রাণচাঞ্চল্যের অংশ হয়ে থাকা ঠেলাগাড়ি আজ হারাতে বসেছে তার অস্তিত্ব; আর এর সঙ্গে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন এ পেশার সঙ্গে জড়িত হাজারো শ্রমিক।


বিজ্ঞাপন


বর্তমানে ব্যাটারিচালিত ভ্যান, রিকশা, অটোরিকশা ও ছোট পিকআপ ভ্যানে কাজ দ্রুত হওয়ায় মানুষ এসব বাহনকে বেছে নিয়েছে। এর ফলে ঠেলাগাড়ি চালকদের জীবনে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। একসময় যেখানে দিনে একাধিক ট্রিপ দিয়ে মোটামুটি আয় করা যেত, এখন সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কাজ মেলে না। অনেকেই জানান, আগে প্রতিদিনের আয়ে সংসার চালানো সম্ভব হলেও এখন সেই আয় অর্ধেকেরও কমে গেছে। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক ঠেলাগাড়ি শ্রমিকরা পেশা পরিবর্তন করছেন।

কিছু শ্রমিক ব্যাটারিচালিত ভ্যান বা রিকশাভ্যান চালানো শুরু করেছেন, আবার কেউ দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিক কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তবে সবার পক্ষে এই পরিবর্তন সহজ নয়। নতুন পেশায় যেতে প্রয়োজন হয় পুঁজি ও প্রশিক্ষণের, যা অনেকের পক্ষেই জোগাড় করা সম্ভব হয় না। ফলে একাংশ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ছেন বা অস্থায়ী কাজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছেন।

শুধু জীবিকা নয়, ঠেলাগাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল একটি সংস্কৃতিও। শ্রমিকদের মধ্যে ছিল পারস্পরিক সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও এক ধরনের সামাজিক বন্ধন। একই স্ট্যান্ডে বসে গল্প করা, একে অপরকে কাজের সুযোগ করে দেওয়া কিংবা বিপদে পাশে দাঁড়ানো এসব ছিল তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। এখন সেই পরিবেশও অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

mahfuj-2


বিজ্ঞাপন


বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরায়নের এই সময়ে পরিবেশবান্ধব ও স্বল্প ব্যয়ের পরিবহন হিসেবে ঠেলাগাড়ির সম্ভাবনা ছিল। এতে কোনো জ্বালানি লাগে না, দূষণ সৃষ্টি হয় না এবং সরু পথেও সহজে চলাচল করা যায়। কিন্তু বাস্তবে মানুষ এখন দ্রুততা ও কম শ্রমের দিকেই ঝুঁকছে, ফলে এই বাহনের ব্যবহার ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা আরো জানান, নগরায়নের এই সময়ে পরিবেশবান্ধব ও স্বল্প ব্যয়ের পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্ব বাড়ছে। সে দিক থেকে ঠেলাগাড়ি একটি সম্ভাবনাময় মাধ্যম হতে পারত। এতে কোনো জ্বালানি লাগে না, দূষণ সৃষ্টি হয় না এবং সরু পথেও সহজে চলাচল করা যায়। তবে বাস্তবতা হলো মানুষ এখন দ্রুততা ও কম শ্রমের দিকে ঝুঁকছে, ফলে ঠেলাগাড়ির ব্যবহার সীমিত হয়ে পড়ছে।

ঠেলাগাড়ি শ্রমিকদের এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে শ্রমজীবী মানুষের অবদান কতটা গভীর। তাদের ঘাম আর পরিশ্রমের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠেছে আমাদের নগরজীবন ও অর্থনীতি। অথচ সময়ের স্রোতে সেই শ্রমিকদের একাংশ আজ হারিয়ে যাচ্ছে, তাদের পেশাও হয়ে উঠছে ইতিহাসের অংশ।

তবুও কোথাও কোথাও এখনও দেখা মেলে কয়েকটি ঠেলাগাড়ির। তারা যেন অতীতের এক জীবন্ত স্মারক যা মনে করিয়ে দেয় একসময় মানুষের কাঁধে ভর করেই এগিয়ে চলত শহর, গড়ে উঠত অর্থনীতি, আর চলত জীবনের চাকা।

mahfuj-3

প্রায় ২৫ বছর ধরে পুরান ঢাকায় এখনো ঠেলাগাড়ি চালাচ্ছেন আব্দুল করিম। তিনি বলেন, ‘এই হাতের জোরেই সংসার চালাইছি, ছেলেমেয়েদের বড় করছি। একসময় সকাল হতেই কাজের ডাক আসতো বাজারের মাল, ইট-বালু, বাসা বদল কাজের শেষ ছিল না। সারাদিন ঘাম ঝরিয়ে রাতে বাড়ি ফিরতাম, কিন্তু মনে শান্তি থাকতো পরিশ্রম করে খাইতেছি। এখন আর সেই দিন নাই। সবাই ভ্যান নেয়, গাড়ি নেয় আমাদের আর দরকার পড়ে না। বাঁধা দোকানের মাল আনা-নেওয়ার কাজ অনেকেই করে বয়স হয়ে যাওয়ায় সেটাও সহজে পাইনা। মাঝে মাঝে কাজ পাই, কিন্তু ওই দিয়ে সংসার চলে না। বয়সও বাড়ছে, শরীর আর আগের মতো চলে না। ঠেলাগাড়ি ঠেলা এখন অনেক কষ্ট লাগে।

সবচেয়ে কষ্ট লাগে যখন দেখি, যে কাজটা দিয়ে জীবন কাটাইছি, সেই কাজটাই এখন হারিয়ে যাচ্ছে। মনে হয়, আমরা মানুষগুলাও বুঝি আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছি। তবুও পেট তো মানে না, তাই এখনও রাস্তায় বের হই হয়তো কেউ ডাক দিবে, এই আশায়।’

ব্যবসায়ী সোহেল রানা বলেন, ‘ঠেলাগাড়ি এখন খুব কম দেখা যায়, সবাই দ্রুত কাজ চায় বলে ভ্যান বা পিকআপ নেয়। ইট-বালু বহনে এখন মেশিন আর ভ্যানই বেশি ব্যবহার হচ্ছে, ঠেলাগাড়ির চাহিদা নেই। আগে বাসা বদলের সময় ঠেলাগাড়ি নিতাম, এখন সহজেই গাড়ি পাওয়া যায়। কায়িক পরিশ্রম বেশি বলে এই পেশায় নতুন কেউ আসতে চায় না। সময় বাঁচাতে মানুষ এখন যান্ত্রিক পরিবহনের দিকেই ঝুঁকছে।’

এম/এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর