শুক্রবার, ১ মে, ২০২৬, ঢাকা

নিয়োগপত্র-ছুটি নেই, চাকার সঙ্গে ঘুরছে পরিবহন শ্রমিকদের অনিশ্চিত জীবন

মোস্তাফিজুর রহমান
প্রকাশিত: ০১ মে ২০২৬, ০৭:৪০ এএম

শেয়ার করুন:

নিয়োগপত্র-ছুটি নেই, চাকার সঙ্গে ঘুরছে পরিবহন শ্রমিকদের অনিশ্চিত জীবন

মে দিবসে বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের অধিকার, ন্যূনতম মজুরি ও কাজের পরিবেশে পরিবর্তনের দাবি জোরালো হলেও বাংলাদেশের পরিবহন শ্রমিকদের বাস্তবতা এখনো ভিন্ন। নিয়োগপত্র, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা বা ছুটির নিশ্চয়তা-কিছুই নেই তাদের জীবনে। মালিকের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে কাজ, আবার যেকোনো সময় চাকরি হারানোর শঙ্কা। ফলে চাকার ঘূর্ণনের সঙ্গেই যেন ঘুরছে তাদের অনিশ্চিত জীবন।

পরিবহন আইন ও শ্রম আইন অনুযায়ী, নিয়োগপত্র দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ শ্রমিকই তা পান না। বছরের পর বছর একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেও নেই কোনো চাকরির নিশ্চয়তা। মালিক চাইলে কাজ, না চাইলে কাজ নেই-এমন অনিশ্চয়তার মধ্যেই কাটে তাদের জীবন।


বিজ্ঞাপন


শ্রমিকদের অভিযোগ, তাদের কাজের কোনো নির্ধারিত সময় নেই, নেই সাপ্তাহিক ছুটি। এমনকি মে দিবসের মতো আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসেও তাদের অনেকেই রাস্তায়, গাড়ির স্টিয়ারিং বা চালকের সহকারীর দায়িত্বে থাকেন। টানা কাজ করতে হয় দিনের পর দিন।

আজ মে দিবসেও কাজে নামতে হয়েছে তাদের। কোনো কারণে গাড়ির চাকা না ঘুরলেই বন্ধ তাদের বেতন।

এমন অবহেলায় শ্রমিকদের দিন কাটলেও তাদের অধিকারের বিষয়ে ‘নীবর’ মালিক সমিতি। শ্রমিক সংগঠনগুলো তৎপরতা দেখালেও অধিকার আদায়ে কার্যত ব্যর্থ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত মুনাফার জন্যই শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়ে এড়িয়ে যাচ্ছে মালিক সমিতি।

mahfuz-1


বিজ্ঞাপন


বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘মালিকদের অতিরিক্ত মুনাফার স্বার্থে পরিবহন খাতের ন্যায্য শ্রমনীতি তৈরি হয়নি। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। সরকারের উচিত শ্রমিকদের মজুরি এবং কাজের সু-ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। অন্যথায় পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো কঠিন।’

বাংলাদেশ পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা নূরুল আমিন পারভেজ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা শ্রমিকদের সকল অধিকার নিশ্চিতে সরকার ও মালিক সমিতির কাছে দাবি জানিয়ে আসছি।’

শ্রমিকের সংখ্যা নিয়ে ভিন্নমত

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের হিসাবে দেশে নিবন্ধিত শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। এছাড়া আরও ২০ লাখ অনিবন্ধিত শ্রমিক রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) জানায়, গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৬৫ লাখ ৯৪ হাজার ৩২০টি। এর মধ্যে শুধু বাসই রয়েছে ৫৭ হাজার ৭৩০টি। একটি বাসে চালকসহ ২ থেকে তিনজন শ্রমিক কাজ করেন। ট্রাকের ক্ষেত্রেও একাধিক শ্রমিক থাকেন, শ্রমিক রির্জাভ রাখতে হয়। অন্যান্য যানবাহনও তো আছে। সবমিলিয়ে মোট পরিবহন শ্রমিক সংখ্যা এক কোটিরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।

কষ্টের জীবন, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

বাগেরহাট মোল্লারহাট এলাকায় অসচ্ছল পরিবারে জন্ম শরিফুল ইসলামের। তাই পড়ালেখা হয়নি তার। জীবন চালানোর তাগিদে শিশুশ্রমে যুক্ত হন। এক বছর বিভিন্ন পরিবহনে শ্রমিকের কাজ করে এখন ৫ মাস ধরে ‎ঢাকা-মোংলা রুটের সুন্দরবন পরিবহনের বাস চালকের সহকারী হিসেবে কাজ করছে। এখনো তার বয়স পনেরোর কোটায়।

গত বুধবার (২৯ এপ্রিল) দুপুরে ঢাকার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে শরিফুলের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, ‘আজ ভোরে রওনা হয়ে ঢাকা এসেছি। মোংলা থেকে ঢাকা এলে ২৫০ টাকা বেতন পাই। আর মোংলা ফেরত গেলে ২৫০ টাকা খোরাকি পাই। এই দিয়েই চলি। আগেরদিন তার গাড়ি চলেনি তাই সেদিন কোনো টাকাও পাইনি।’

mustafiz-2শরিফুল আরো জানায়, তাকে টানা এক মাস গাড়িতে থাকতে হয়। এর মধ্যে কোনো ছুটি নাই।

‘উস্তাদ (চালক) যেই থাকুক, গাড়ির দায়িত্ব সব স্টাফের ওপর। গাড়ি ছাড়া কোথাও যাওয়ার সুযোগ নাই। গেলে চাকরি থাকবে না। এ কারণে যাই না। গাড়িতেই আছে এক মাসের বেশি হয়েছে।’

ঢাকা-কক্সবাজার রুটের আইকন এক্সপ্রেসের চালকের সহকারী মো. হাসিব (৩০)। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় তার বাড়ি। স্ত্রী ও দুই মেয়ে নিয়ে তার সংসার।

মো. হাসিব বলেন, ‘যাত্রীর ওপর ভিত্তি করে আমাদের গাড়ি নাইট টু নাইট চলে। এক ট্রিপ বলতে একদিন। এক ট্রিপে বেতন ১১০০ টাকা। এখন সমস্যা হলো এই টাকা প্রতিদিন আসে না। যেমন, গতরাতে ট্রিপ হয়েছে, টাকাও পাইছি। কিন্তু আগামী দুই দিন ট্রিপ হবে কিনা জানা নেই। না হলে দুইদিন কোনো বেতন পাব না।’

‘৩/৪ দিনে এক ট্রিপ হয়। এই টাকায় সংসার চালানো খুব কষ্ট হচ্ছে। আমার ছোট বাচ্চা আছে, ওর অনেক খরচ। কী করব। গাড়িতে না আসলে আরও বিপদে পরব তাই আসি। তবুও কিছু করা সম্ভব।’

তবে পরিবহন শ্রমিকের পেশায় ভালোই আছেন বলে জানালেন মোহাম্মদ ইমন। ঢাকা থেকে পাথরঘাটা (বরগুনা) রুটের একটি বাসের চালকের সহকারী হিসেবে কাজ করছেন তিনি। সংসার স্ত্রী, সন্তান আছেন। বাবা-মাও জীবিত আছেন।

ইমন বলেন, ‘পরিবহনে টাকা আছে। কাঁচা টাকা। কিন্তু অনেকে নেশা করে টাকা নষ্ট করে ফেলে। জুয়া খেলে। অযথা খরচ করে। এসব কারণেই অনেকেই কিছুই করতে পারে না।’

নিজের আয়ের কথা তুলে ধরে এই শ্রমিক বলেন, ‘যেমন আজকে (বুধবার) পাথরঘাটা থেকে ছাইড়া এখানে আসছি নাস্তা বিলসহ অন্যান্য খরচের বাইরে ১৪০০ টাকা দিছে। এখন বাকি বেলায় খাওয়া-দাওয়াসহ সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা খচর হবে আমার। বাকি ১১০০ টাকাই থাকবে। এটা ধরেন নূন্যতম। আবার বিকেলে গেলেও বেতন পাব। আবার যখন যাত্রী চাপ বেশি থাকে, তখন টাকা আরও বেশি ইনকাম হয়। আলহামদুল্লিাহ, সবাইকে নিয়ে ভালো আছি।’

‘যদি নেশার পেছনে টাকা না খরচ করে, জুয়া না খেলে সবাই টাকা জমাতো তাহলে অনেক কিছু করাই সম্ভব হতো। কিন্তু এটা অনেকেই করে না। নেশা করে সব নষ্ট করে দেয়।’- যোগ করেন তিনি।

mustafiz-3

শরীয়তপুরের জিহাদ ইসলামের বয়স এখন ১৮। তবে চালকের সহকারীর পেশায় যুক্ত হয়েছেন আরও ৩ বছর আগে। অর্থাৎ, ১৫ বছর বয়সে হেলপার হিসেবে যুক্ত হয়েছিল।

বর্তমানে ঢাকা-সিলেট-সুনামগঞ্জ রুটে ‘আল শামীম এক্সপ্রেস’ নামে একটি বাসের চালকের সহকারী হিসেবে কাজ করছে। জিহাদ বলেন, ‘শখের বসে এই পেশায় আসি। এখন কষ্ট হলেও এটাই ভালো লাগে।’

কথায় কথায় চাকরি যায়

ঢাকা-লাকসাম-কুমিল্লা রুটের একটি বাসে চালকের সহকারী হিসেবে কাজ করেন মাসুদ মিয়া। তিনিও এ পেশায় এসেছেন অপ্রাপ্ত বয়সে।

জানতে চাইলে মাসুদ বলেন, ‘৯ বছর হলো হেলপারি করি। কেউ জিগাইল না অভিজ্ঞতার কথা। আসলে আমাগোর (এই পেশায় যুক্ত হতে) কোনো অভিজ্ঞতা লাগে না। চ্যানেল ধরে ঢুকে গেলেই হয়ে যায়। আবার চাকরি চলে যাওয়ার কোনো ঠিক ঠিকানা নাই। কথা কথা চাকরি চলে যায়।’

সম্রাট পরিবহনে বাস চালকের সহকারী হিসেবে কাজ করেন জুয়েল মিয়া। ৭/৮ বছর ধরে কোম্পানিটিতে আছেন। জুয়েল বলেন, ‘হেলপারি করে জীবন শেষ। অন্য কাজে মনও বসে না। অনেকবার ছাড়ছি। অটো চালাইছি। রাজমিস্ত্রীর কাজ করছি। কিন্তু টিকতে পারি নাই। ঘুরে ঘুরে হেলপারিই করি। হেলপারি একটা নেশা হয়ে গেছে। যতক্ষণ গাড়িতে থাকি ততক্ষণ হাতে টাকার উড়ে। কিন্তু গাড়ি থেকে নামলে আর হিসাব পাই না। এখনও বিয়াডাই করতে পারলাম না।’

mustafiz-4

ঢাকা-মঠখোলা (কিশোরগঞ্জ) রুটের মনোহরদী পরিবহনের চালক আখিলুর রহমান বলেন, ‘প্রতি ট্রিপে ৩০০ টাকা বেতন পাই। বেশি দিনই দুই ট্রিপের বেশি দিতে পারি না। কোন কোনদিন তিন ট্রিপ হয়। এতে যে টাকা পাওয়া যায় তা দিয়ে সংসার চলানো যায় না। কম টাকায় কষ্ট করে জীবন চালাচ্ছি।’

স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে সংসার বাস চালক জলিল কবীরের। তিনি বলেন, ‘সংসারের যে খরচ তা মিটাতে মাসের ২০ দিন টানা বাস চালাই। প্রায় ড্রাইভারই অভাব অনটন আছেন। অভাবের কারণে তাদের টানা দীর্ঘদিন গাড়ি চালাতে হয়।’

সরব ফেডারেশন, মালিকপক্ষের ব্যাপারে ‘নীরব’

মে দিবস পালনে বেশ তৎপর বাংলাদেশ পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। দিবসটি উপলক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচিও গ্রহণ করেছে সংগঠনটি। ফেডারেশনের পক্ষ থেকে এ উপলক্ষ্যে ঢাকার বিভিন্ন টার্মিনালে লিফলেট বিতরণ করেছে। এতে ১৪ দফা দাবি জানিয়েছে।

তবে শ্রমিকদের নিয়োগপত্র, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা এসব বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।

জানতে চাইলে শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা নূরুল আমিন পারভেজ বলেন, শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় আমরা সবপক্ষের কাছেই দাবি জানাচ্ছি।

ঢাকা জেলা বাস মিনিবাস সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা কিশোর আহমেদ বাবু ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘শ্রমিকদের দুঃখ কষ্টে আমরা সবসময় পাশে আছি। সরকার ও মালিক সমিতির কাছে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিতের দাবি জানাই।’

এএম/এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর