মে দিবস এলেই শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও সংগ্রামের কথা নতুন করে সামনে আসে। কিন্তু শহরের হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতে যারা দিন-রাত পরিশ্রম করে খাবার সংস্কৃতি ও সেবাখাতকে সচল রাখছেন, সেই হোটেল শ্রমিকদের জীবনে সেই আলোচনার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায় না।
ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত টানা ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করেও অনেক শ্রমিক পর্যাপ্ত বিশ্রাম বা নির্ধারিত ছুটি পান না। বড় শহরগুলোর বেশিরভাগ ছোট ও মাঝারি হোটেলে শ্রমঘণ্টা নিয়ন্ত্রণের কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। মাসিক নির্দিষ্ট বেতন পেলেও তা জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় অপ্রতুল। অনেক ক্ষেত্রেই ওভারটাইমের সঠিক পারিশ্রমিকও দেওয়া হয় না; নির্ভর করতে হয় বকশিশের ওপর। এমন নানা সংকটে জীবন পার করতে হয় হোটেল শ্রমিকদের।
বিজ্ঞাপন
কাজের পরিবেশও অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসম্মত বা নিরাপদ নয়। রান্নাঘরের তাপ, ধোঁয়া ও দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করার কারণে শারীরিক নানা সমস্যা তৈরি হয় শ্রমিকদের মধ্যে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম বা চিকিৎসা সুবিধা অনুপস্থিত। গ্রাম থেকে উন্নত জীবনের আশায় আসা অনেক শ্রমিকের স্বপ্ন শহরের বাস্তবতায় ভেঙে যায়। সীমিত শিক্ষার কারণে বিকল্প কাজের সুযোগও তাদের জন্য খুব কম।
রিপোর্ট অন মনিটরিং অফ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভে (এমইএস) ২০০৯, অর্থ মন্ত্রণালয়, এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১১, জুন প্রকাশিত নানা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে হোটেল রেস্তোরাঁ ও দোকানে নিয়োজিত শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৮২ লাখ। এর মধ্যে শুধু হোটেল শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ।
রাজধানীর ধানমন্ডির বৈশাখী হোটেলে দুই বছর ধরে কাজ করেন সোহাগ হাসান। দিনের অধিকাংশ সময়ই কাটে হোটেলে। জানতে চাইলে সোহাগ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা খাবার তৈরি করলে মানুষ খায়। চেষ্টা করি আন্তরিকতা সঙ্গে কাজ করতে। সেইসঙ্গে সবার সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করি। কাস্টমারদের সন্তুষ্ট রাখতে হবে এটা সবসময় চিন্তা করি।’
সোহাগ হাসান আরো বলেন, ‘আমরা ছুটি খুবই কম পাই। ঈদের সময়ও ছুটি বেশি দেয়া হয় না। সবসময় কাজের মধ্যে থাকতে হয়। মন চাইলেও পরিবারকে সময় দিতে পারি। মাঝে মাঝে ঘুরতে যেতে ইচ্ছা করলেও কাজের চাপে যাওয়া যায় না। বেতনও কম; সবমিলিয়ে কষ্ট করে চলতে হয়।’
বিজ্ঞাপন
শফিকুল ইসলাম রাজধানীর পুরান ঢাকার সখের হোটেলে রান্নার কাজ করেন। বয়স প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি, কিন্তু পরিশ্রমের ছাপ তার মুখে আরও বেশি বয়সের ছাপ ফেলেছে। প্রতিদিন ভোর ছয়টায় কাজ শুরু করে রাত এগারোটা পর্যন্ত চুলার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় তাকে। গরম তেল, ধোঁয়া আর তীব্র তাপের মধ্যে কাজ করতে হয়। এতো কাজ করেও তিনি মাস শেষে যে বেতন পান, তা দিয়ে পরিবারের খরচ চালানোই কষ্টকর হয়ে পড়ে। তবুও দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে সব ক্লান্তি ভুলে যান তিনি।
শফিকুলের জীবনের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা অনিশ্চয়তা। অসুস্থ হলে ছুটি নেই, চিকিৎসার খরচও নিজের পকেট থেকেই বহন করতে হয়। একবার জ্বরে আক্রান্ত হয়ে কয়েকদিন কাজে যেতে না পারায় তার বেতন কেটে নেওয়া হয়েছিল। তারপর থেকে অসুস্থ হলেও তিনি কাজে আসার চেষ্টা করেন।
মে দিবস সম্পর্কে জানতে চাইলে শফিকুল ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এই দিনটা আমাদের কথা মনে করিয়ে দেয়, কিন্তু বাস্তবে খুব বেশি কিছু বদলায় না।’
রায়হান আহমেদ কাজ করেন রাজধানীর আজিমপুরের নূরানী হোটেলে। এই হোটেলে তিনি দীর্ঘসময় ধরে সার্ভিস স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গ্রাহকদের সেবা দেওয়া, টেবিল পরিষ্কার রাখা, অর্ডার নেওয়া-সবকিছুই তাকে সামলাতে হয়। প্রতিনিয়ত তাকে বাড়তি কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়, বিশেষ করে কিছু গ্রাহকের অশোভন আচরণ তার জন্য মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ঢাকা মেইলকে রায়হান জানান, তার কাজের সবচেয়ে কঠিন দিক হলো দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা এবং প্রতিনিয়ত হাসিমুখে সেবা দেওয়া। ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো তিনি কাজের জায়গায় প্রকাশ করতে পারেন না। মাস শেষে যে বেতন পান, তা দিয়ে পরিবারের খরচ মেটানোই কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও তিনি আশা ছাড়েন না-একদিন হয়তো পরিস্থিতি বদলাবে।
রায়হান বলেন, ‘আমাদের শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন হয় না। সঠিক মূল্যায়ন হলে আমরা কাজ করতেও আনন্দবোধ করি। আমাদেরও স্বপ্ন আছে এবং ভালো থাকার ইচ্ছা আছে। চাইলেই কিছু করতে পারি না এবং একটা পরিস্থিতির মধ্যে থাকতে হয়।’
ধানমন্ডির বিউটি হোটেলের ম্যানেজার মঞ্জুরুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘হোটেল আসলেই কঠিন কাজ। প্রতিদিন বাজার করতে হয় এবং গ্রাহকদের চাহিদার দিকে খেয়াল রাখতে হয়। সবসময় চ্যালেঞ্জের মধ্যে থাকতে হয় এবং খাবার অপচয় হয় কিনা সেদিকেও খেয়াল রাখতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই হোটেলে যারা কাজ করেন, তাদেরকে ভালো রাখার চেষ্টা করি। তবে সবাইকে তো আর চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী খুশি রাখা যায় না। আমাদেরও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই সীমাবদ্ধতা নিয়েই আমাদের চলতে হয় এবং সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।’
এসএইচ/এমআর




