দেড় দশকেরও বেশি সময় পর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে গঠিত বর্তমান সরকার মানুষের দীর্ঘদিনের আশার প্রতিফলন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, জবাবদিহিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সরকার বদ্ধপরিকর।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর বিয়াম ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে ফাউন্ডেশনের ট্রেনিং কাম ডরমেটরি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
বিজ্ঞাপন
জনপ্রশাসন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান আবারো স্পষ্ট করে দিয়েছে এই রাষ্ট্রের মালিক এই দেশের জনগণ। তাই জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা হিসেবে জনগণের স্বার্থ ও কল্যাণ নিশ্চিত করা আপনাদের প্রধান দায়িত্ব।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ফাউন্ডেশন-বিয়াম। ১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। এরপর ২০০২ সালের নভেম্বর মাসে এটি বিয়াম ফাউন্ডেশনে রূপান্তরিত হয়। বিয়ামের প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত অগ্রযাত্রার দিন তারিখগুলো প্রমাণ করে দেশ এবং জনগণের স্বার্থে বিএনপি সরকার বড় একটি সুদক্ষ এবং প্রশিক্ষিত জনপ্রশাসন দেখতে চেয়েছে এবং ভবিষ্যতেও দেখতে চায়।
তিনি আরো বলেন, তাই আজ বিয়াম ফাউন্ডেশনের ট্রেনিং কাম ডরমেটরি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন কেবল একটি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনই নয়, এটি প্রশাসনিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক নেতৃত্ব গঠন এবং মানবসম্পদ বিকাশের রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
তারেক রহমান বলেন, আজ যে ট্রেনিং কাম ডরমেটরি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হচ্ছে তা ভবিষ্যতে প্রশাসনিক নেতৃত্ব গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই ভবন শুধু একটি অবকাঠামো নয়, এটি হয়ে উঠুক জ্ঞানচর্চা, নেতৃত্ব বিকাশ এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের একটি প্রাণবন্ত কেন্দ্র।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, দক্ষ মানব সম্পদ তৈরি বিয়ামের অন্যতম একটি লক্ষ্য। বিশেষ করে সরকারি কর্মে নিয়োজিত মানব সম্পদকে আধুনিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারে সক্ষম করে গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার মেধানির্ভর, আত্মবিশ্বাসী, সৃজনশীল ও দায়িত্ববান মানবসম্পদ গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর।
সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে মেধাভিত্তিক, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তোলার বিকল্প নেই, যদি আমরা আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই।-যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
বিয়ামের কারিকুলাম এবং প্রশিক্ষণ পরিবেশ বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং উদ্ভাবনী চিন্তাকে আরো সমৃদ্ধ করবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আধুনিক প্রশাসনের দক্ষতা মানে শুধু নিয়ম জানা নয় বরং প্রযুক্তির ব্যবহার, তথ্য বিশ্লেষণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জনসেবায় সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি। সেই লক্ষ্যেই বর্তমান সরকার প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে আরো আধুনিক ও ফলাফলমুখী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। মৌলিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি উন্নত কোর্স, গবেষণা এবং নীতি নির্ধারণমূলক শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
জনপ্রশাসন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সরকারপ্রধান বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আপনারা যথাযথভাবে সেই দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলেন কি না কিংবা পালন করতে সক্ষম হয়েছিলেন কি না এই মুহূর্তে সেই প্রশ্ন না তুলে আমি আপনাদের বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের পক্ষ থেকে একটি বার্তা দিতে চাই। দেশ এবং জনগণের কাছে আমাদের যেই প্রতিশ্রুতি আমরা দিয়ে এসেছি সেসব কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয় বরং জনগণের সঙ্গে করা আমাদের চুক্তি। জনগণ আমাদের ইশতেহারের পক্ষে রায় দিয়েছে। সুতরাং বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার নির্বাচনী ইশতেহার এবং জনগণের সামনে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের প্রতিটি দফা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে বদ্ধপরিকর।
তিনি বলেন, আমি আশা করি আপনারা আপনাদের মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে জনগণের কাছে দেওয়া সরকারের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে ভূমিকা রাখবেন। জনগণ আমাদের ওপর যে আস্থা রেখেছে সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করতে হলে প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নৈতিকতার দৃঢ় চর্চা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ প্রশাসনিক স্তরে অবস্থান করছেন। আপনারা যে দায়িত্ব পালন করেন তা কেবল নথিপত্র পরিচালনা বা প্রশাসনিক তদারকির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একটি শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক এবং জনবান্ধব রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আপনারাই হচ্ছেন মূল চালিকাশক্তি। আপনাদের পেশাদারিত্ব, দক্ষতা, নৈতিক দৃঢ়তা ও প্রশাসনিক প্রজ্ঞার ওপর একটি জাতির উন্নয়ন বা ভাগ্য নির্ভর করছে। আপনাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব কখনো একটি পরিবারে, কখনো একটি অঞ্চলে কিংবা কখনো পুরো জাতির উপরে এসে পড়ে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা এগুলোকেই আমরা প্রধান বিবেচ্য হিসেবে গ্রহণ করতে চাই। স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সাথে শূন্য পদে সরকারি কর্মচারী নিয়োগ, প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠন, শক্তিশালী পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন এবং বেসরকারি সার্ভিস রুল প্রণয়নসহ সর্বত্র প্রশাসনিক কাঠামোর কার্যকারিতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেও সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
তারেক রহমান বলেন, বিশ্ব এখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যুগে প্রবেশ করেছে। সুতরাং বৈশ্বিক প্রতিযোগীতায় টিকে থাকতে হলে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদেরকেও নিজেদেরকে প্রস্তুত রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের প্রশাসনকে আরো দক্ষ, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক হিসেবে গড়ে তুলবে।
তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য ভবিষ্যতে সকল সরকারি সেবা তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে নাগরিকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। এক্ষেত্রে দক্ষ মানব সম্পদ গড়তে বিয়ামের কার্যক্রমকে আরো শক্তিশালী করার জন্যে সরকার যে কোনো প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানে প্রস্তুত।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ব-ব্যবস্থায় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং সহজীকরণে সিঙ্গেল-উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স, ওয়ান স্টপ সার্ভিস প্রতিষ্ঠা এবং সম্পূর্ণ ডিজিটাল কর্মপ্রবাহ তৈরি করে আধুনিক বিশ্বের উপযোগী করে সরকারি কর্মসম্পাদন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন।
তিনি বলেন, আমরা একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে উন্নয়নের সুফল সমাজের প্রতিটি স্তরে ধীরে ধীরে পৌঁছাবে। বৈষম্য কমে আসবে। নারী এবং যুবসমাজ উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং অবশ্যই পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু সহনশীলতা আমাদের প্রতিটি নীতির অংশ হবে।
জনপ্রশাসন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, আপনারাই নীতি নির্ধারণ এবং নীতি বাস্তবায়নের মধ্যে সেতু বন্ধন। আপনাদের সততা, কর্মদক্ষতা এবং দায়বদ্ধতাই সরকারের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি। আপনাদের প্রতি আমার আহ্বান নিজেদের শুধু প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে নয় বরং জনগণের সেবক এবং বন্ধু হিসেবে ভাবুন।
এমআর




