শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

দাম বাড়তেই উধাও জ্বালানি তেলের সংকট!

ইব্রাহিম খলিল, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৪৯ পিএম

শেয়ার করুন:

fuel
চট্টগ্রামের একটি পাম্প প্রায় ফাঁকা। ছবি: ঢাকা মেইল
  • ফাঁকা চট্টগ্রামের সবকটি তেলের পাম্প
  • গেলেই মিলছে অকটেন-পেট্রোল
  • ভিড় এখন সিএনজি রি-ফুয়েলিং স্টেশনে

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর হঠাৎ বদলে গেছে চট্টগ্রাম মহানগরীর তেলের পাম্পগুলোর দৃশ্যপট। গেলেই মিলছে সোনার হরিণ অকটেন-পেট্রোল। গত দেড় মাসের মতো পাম্পগুলোতে এখন নেই যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। প্রায় ফাঁকা পাম্পগুলো।


বিজ্ঞাপন


শুক্রবার (২৪ এপৃল) সকাল থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগরীর ষোলশহর, নতুন ব্রিজ, পাঁচলাইশ, অক্সিজেন, ওয়াসা মোড়, লালদীঘি ও গণি বেকারি সংলগ্ন একাধিক ফিলিং স্টেশন ঘুরে এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে।

পাম্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাম্পগুলোতে বর্তমানে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক। বিশেষ করে অকটেন সরবরাহ বাড়ানো এবং সীমাবদ্ধতা তুলে দেওয়ার কারণে বাজারে চাপ অনেকটাই কমে গেছে। আগে যেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি তেল দেওয়া হতো না, এখন চালকরা ইচ্ছেমতো তেল নিতে পারছেন। এতে ভোগান্তি ছাড়াই দ্রুত সেবা পাচ্ছেন তারা।

গ্রাহকদের অভিযোগ, তেলের দাম বাড়াতেই এতদিন জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি করা হয়েছিল। যেভাবে এখন সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতে সংকট তৈরি করা হয়েছে। তেলের পাম্পের ভিড় এখন গ্যাস রি-ফুয়েলিং স্টেশনে শুরু হয়েছে।

আহসান উল্লাহ নামে এক সিএনজি চালক জানান, তারা নগরীর যেকোনো স্টেশনে গ্যাসের জন্য গেলে মাইলেরও অধিক ভিড় দেখছেন। রি-ফুয়েলিং স্টেশনের মালিক ও কর্মচারীরা বলছেন, গ্যাস সংকটের কারণে চাপ কম, তাই রিফুয়েলিং করতে সময় লাগছে। এতে গ্যাস চালিত যানবাহনগুলোর ভিড় বাড়ছে।


বিজ্ঞাপন


নগরীর টাইগার পাস মোড়ের ইন্ট্রাকো সিএনজি রি-ফুয়েলিং স্টেশনে গ্যাস রি-ফুয়েলিং করতে আসা প্রাইভেটকার চালক রেজাউল করিম বলেন, শুক্রবার সকাল ৯টায় গ্যাস নিতে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি। এখন দুপুর দেড়টা বাজে। এখনো পর্যন্ত গ্যাস নিতে পারিনি। সামনে যে লাইন আছে তাতে মনে হচ্ছে আরও এক ঘণ্টা সময় লাগবে। এভাবে নগরীর প্রতিটি গ্যাস রি-ফুয়েলিং স্টেশনে ভিড় জমে আছে বলে জানান গ্যাস নিতে আসা চালকরা।   

অন্যদিকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন তেলের পাম্পগুলোর কর্মচারী ও তেল নিতে আসা যানবাহন চালকরা। তারা বলছেন, আগে যেখানে প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি থাকতো এখন সেখানে স্বাভাবিক সময়ের মতোই অল্প কিছু গাড়ি থাকছে। কোনো কোনো পাম্পে কর্মরতরা অলস সময় কাটাচ্ছেন।   

নগরীর গণি বেকারি সংলগ্ন কিউ সি ট্রেডিংয়ে অকটেন নিতে আসা মোটরসাইকেল চালক রহিম উল্লাহ ঢাকা মেইলকে বলেন, আমি মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ার করি। এ কয়েক দিন সীমাহীন কষ্ট করতে হয়েছে। এক ঘণ্টা, কোনো সময় দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হয়েছে। হঠাৎ দেখি তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এরপরই দেখি পাম্পের চিত্র পাল্টে গেছে। তেল নেওয়ার কোনো লিমিটেশন নেই। ফুল ট্যাংক লোড করে নিতে পারছি।

আরও পড়ুন

অসাধু তেল ব্যবসায়ীদের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ এলজিআরডি মন্ত্রীর

চট্টগ্রাম মহানগরীর গাড়ির বেশি চাপ থাকা পাম্পের একটি দামপাড়া এলাকার মেসার্স সিএমপি ফিলিং স্টেশন। দেড় মাস ধরে রাতদিন লাইন থাকতো পাম্পটিতে। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে উল্টো চিত্র মিলেছে। শুক্রবার সকালে পাম্পটিতে গাড়ির কোনো লাইন ছিল না।

একই চিত্র দেখা গেছে নগরীর নাছিরাবাদ ও কাতালগঞ্জ এলাকার পাম্পগুলোতেও। আগে যেখানে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত লম্বা লাইন থাকতো, সেখানে এখন স্বাভাবিক বিক্রি হচ্ছে। কিছু পাম্পে একসময় দুই কিলোমিটার পর্যন্ত গাড়ির লাইন থাকলেও বর্তমানে সেই দৃশ্য একেবারেই অনুপস্থিত।

পাম্প মালিকদের ভাষ্য, ডিপো থেকে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে অকটেনের ক্ষেত্রে সরবরাহ উন্মুক্ত করে দেওয়ায় বাজারে স্থিতিশীলতা এসেছে। এতে একদিকে যেমন গাড়ির চাপ কমেছে, অন্যদিকে মানুষের মধ্যে থাকা আতঙ্কও অনেকটাই দূর হয়েছে।

কিউ সি পাম্পের কর্মচারী মো. আলমগীর ঢাকা মেইলকে বলেন, তেলের দাম বাড়ানোর পর বুধবার একটু চাপ ছিল। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে চাপ একদম কমে গেছে। অনেকে আগে অকটেন-পেট্রোল মজুত করেছিল, দাম বাড়ানোর পর এখন সেগুলো ব্যবহার করছে। এজন্য পাম্পে চাপ কমে গেছে।

Chittagong2
সিএনজি রি-ফুয়েলিং স্টেশনে ভিড় আছে। ছবি: ঢাকা মেইল

এই কর্মচারী বলেন, দুই দিন আগেও সবাই ট্যাংকি ভরে অকটেন নিতে চাইতো। এখন নিচ্ছে তিনশ থেকে পাঁচশ টাকার মতো। এখন কেউ আর অতিরিক্ত তেল কিনছে না। আতঙ্ক প্রায় কেটে গেছে।

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দাম বৃদ্ধির আগে বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছিল। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, সামনে তেলের দাম বাড়বে কিংবা সরবরাহ কমে যাবে। সেই আশঙ্কা থেকে স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে বেশি তেল কিনে মজুত করা হয়েছিল। কিন্তু দাম সমন্বয়ের পর এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ফলে সেই মজুত তেল এখন বাজারে ব্যবহার হচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সরবরাহ সীমাবদ্ধ না রেখে উন্মুক্ত করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। এতে পাম্পগুলোতে অস্বাভাবিক ভিড় কমেছে এবং সার্বিক বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়েছে। মানুষের মধ্যে যে 'প্যানিক' তৈরি হয়েছিল, সেটিও কেটে গেছে।

আরও পড়ুন

‘সংকট নেই’ বললেও পাম্পে দীর্ঘ লাইন, গলদ কোথায়?

সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, অকটেন ও পেট্রোলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও ডিজেলের ক্ষেত্রে এখনো কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে কৃষি ও পরিবহন খাতে ডিজেলের চাহিদা বেশি থাকায় এই সংকট পুরোপুরি কাটেনি। তবে সংকট কাটাতে সরকার বিভিন্ন দেশ থেকে ডিজেল আমদানির চেষ্টা করছে।

প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল ও আমেরিকার যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ডিজেল ও অপরিশোধিত ক্রুড অয়েলবাহী জাহাজ দেশে আসতে পারেনি। তবে অকটেন ও পেট্রোল দেশে তৈরি হয়। এরপরও যুদ্ধ শুরুর পর থেকে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকট দেখা দেওয়ার কথা বলেন ডিলার ও পাম্প মালিকরা। ফলে আতঙ্কিত হয়ে জ্বালানি তেল নির্ভর যানবাহনের চালক ও মালিকরা অকটেন ও পেট্রোলের জন্য দেশের সব পেট্রোল পাম্পে ভিড় জমাতে শুরু করে। যা একপর্যায়ে দীর্ঘ হতে থাকে।

এ সময় সরকার ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) দেশে অকটেন ও পেট্রোলের কোনো সংকট নেই বলে দাবি করে। তবে ডিপো ও পাম্প মালিকরা তেল মজুত করছে বলে স্বীকার করেন বিপিসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। যা সত্যে পরিণত হলো সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর। তেলের দাম বাড়ার ঘোষণার পরপরই উধাও হয়ে গেল সরবরাহ সংকট। 

আইকে/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর