দুপুরের রোদ তখন মাথার ঠিক মাথার ওপর। পিচঢালা সড়ক থেকে যেন আগুনের ঢেউ উঠে আসছে। সেই দহনজ্বালার মাঝেই একপাশে দাঁড়িয়ে একটি রিকশা। তবে চালকের আসনে নয়, যাত্রী বসার জায়গাতেই হেলান দিয়ে বসে আছেন সত্তরোর্ধ্ব আলাউদ্দীন। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, তবু থেমে থাকার সুযোগ নেই।
কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন তিনি নিজেকে একটু বিশ্রাম দিচ্ছেন। রিকশার হুড টেনে ছায়া করে নিয়ে চুপচাপ বসে আছেন। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, কোনো যাত্রী হয়তো অপেক্ষা করছেন। কাছে গেলে বোঝা যায়, এটাই তার ক্ষণিকের আশ্রয়। আলাউদ্দীন বলেন, মাঝে মাঝে রিকশাতেই বসে একটু জিরাই, না হলে শরীর আর চলে না। রোদে এত গরম, চালাইতে চালাইতে মাথা ঝিমায়।
বিজ্ঞাপন
ঢাকাসহ দেশজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন এখন প্রায় বিপর্যস্ত। প্রখর রোদ আর ভ্যাপসা গরমে ঘরের ভেতরেও মিলছে না স্বস্তি। দিন-রাতের তাপমাত্রার ব্যবধান কমে যাওয়ায় মানুষের কষ্ট আরও বেড়েছে। বিশেষ করে খোলা আকাশের নিচে কাজ করা মানুষের জন্য এই গরম যেন এক অবিরাম সংগ্রাম।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে তাপমাত্রা কয়েক দিন ধরেই ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রয়েছে। তবে আর্দ্রতা বেশি থাকায় অনুভূত তাপমাত্রা আরও বেশি মনে হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মৃদু থেকে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, যা আপাতত অব্যাহত থাকতে পারে বলেও পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে।
আলাউদ্দীনের দিনের শুরু হয় ফজরের নামাজের পরেই। সূর্য ওঠার আগেই রিকশা নিয়ে বের হন তিনি। সকালটা কিছুটা সহনীয় হলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গরম অসহনীয় হয়ে ওঠে। আলাউদ্দীন বলেন, ‘সকালটা একটু ভালো থাকে, কিন্তু দুপুর হলেই কষ্ট শুরু হয়। তাও কি আর বসে থাকলে চলে? ভাড়া না চালালে তো খেতে পারব না।’
বিজ্ঞাপন
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রয়োজন ছাড়া মানুষ বাইরে বের হচ্ছেন না। যারা বের হচ্ছেন, তারা দ্রুত কাজ শেষ করে ফিরছেন। তবে নিম্ন আয়ের মানুষের উপস্থিতিই সড়কে বেশি চোখে পড়ে। মতিঝিল, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর—সবখানেই প্রায় একই চিত্র। কেউ ছায়া খুঁজছেন, কেউ পানির বোতল হাতে হাঁটছেন, আবার কেউ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে শরবত বা ডাবের পানি পান করছেন।
রিকশাচালকদের অনেককেই দেখা গেছে ক্লান্ত হয়ে রিকশার সিটে বসে বা হেলান দিয়ে বিশ্রাম নিতে। আলাউদ্দীনের মতো তাদেরও রিকশাই হয়ে উঠেছে সাময়িক আশ্রয়। অতিরিক্ত গরমে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন খেটে খাওয়া মানুষ। দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালকদের কাজ খোলা জায়গাতেই, তাই তাদের জন্য এই তাপপ্রবাহ হয়ে উঠেছে অসহনীয়।
পথচারী হিমেল ভূঁইয়া বলেন, ‘গাছ কাটা হচ্ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে গাছ লাগানো হচ্ছে না। এ কারণে গরম দিন দিন বাড়ছে।’ গরমে সামান্য স্বস্তি পেতে অনেকেই ডাব, লেবুর শরবত বা ঠান্ডা পানীয়র দিকে ঝুঁকছেন। তবে সবার পক্ষে তা নিয়মিত নেওয়া সম্ভব হয় না।
এদিকে গরমের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, অতিরিক্ত তাপে শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে। এতে দেখা দিতে পারে তীব্র তৃষ্ণা, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, এমনকি শ্বাসকষ্টও।
রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. ফেরদৌস আহমেদ বলেন, ‘এই গরমে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন যারা দীর্ঘসময় রোদে কাজ করেন। তাদের মধ্যে হিটস্ট্রোকের আশঙ্কা বেশি থাকে। হিটস্ট্রোকের আগে শরীরে কিছু লক্ষণ দেখা দেয়—মাথাব্যথা, অতিরিক্ত ঘাম, দ্রুত হৃদস্পন্দন, বমি বমি ভাব, অস্থিরতা ইত্যাদি। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত বিশ্রাম নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।’
পরিবেশবিদরা বলছেন, নগরায়ণের ফলে গাছপালা কমে যাওয়া, কংক্রিটের বিস্তার এবং যানবাহনের ধোঁয়ার কারণে শহরের তাপমাত্রা বাড়ছে। ছায়ার অভাব এবং খোলা জায়গার সংকট এই গরমকে আরও তীব্র করে তুলছে।
এএইচ/এআর




