দেশে জ্বালানির কৃত্রিম সংকটের পেছনে অবৈধ মজুদ এবং কালোবাজারির বড় ভূমিকা রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
বুধবার (২২ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় (বিধি-৬৮) অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
বিজ্ঞাপন
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এবং অবৈধভাবে জ্বালানি মজুদের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ পড়েছে, তবে এসব নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. মো. শফিকুর রহমান সংসদে আজ এ বিষয়ে নোটিশ উত্থাপন করেন।
এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার গঠনের সময় দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ ছিল মাত্র সাত দিনের। এ অবস্থায় ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হলে হরমুজ প্রণালি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম ৮৮ ডলার থেকে বেড়ে ১৬০ ডলারের বেশি হয়েছে। অকটেন ও জেট ফুয়েলের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার দ্রুত সংগ্রহ, সরবরাহ পুনর্বিন্যাস এবং বিকল্প উৎস অনুসন্ধানের মাধ্যমে মজুদ পরিস্থিতি শক্তিশালী করেছে।
জ্বালানি সংকটের পেছনে কৃত্রিম সংকট ও অবৈধ মজুদকে দায়ী করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ মজুদ, কালোবাজারি এবং তেল পাচারের ঘটনা ঘটেছে। এসব বিষয়ে সরকার কঠোর নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা মেইলসহ বেশ কিছু গণমাধ্যমের রেফারেন্স দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পাবনায় পানির ট্যাংকে তেলের সন্ধান, ড্রইং রুমে মিনি পেট্রোল পাম্প, নাটোরে মাটির নিচে ১০ হাজার লিটার ডিজেল মজুদ, কাভার্ড ভ্যানে গোপন ফিলিং স্টেশন, কুষ্টিয়ার রফিক ফিলিং স্টেশনে তেল পাচার নিয়ে সংঘর্ষ, চুয়াডাঙ্গায় অবৈধ তেল মজুদ, এই ধরনের অজস্র সংবাদ আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে সরকার মে মাস পর্যন্ত দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে এবং জুন-জুলাইয়ের জন্যও প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পেলেও বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে কম হারে মূল্য সমন্বয় করেছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ২০২৬ সালে ২ ফেব্রুয়ারি ডিজেলের মূল্য ছিল ৮২.০৫ ডলার, যেটি ২৭ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে দাঁড়ায় ৮৮.০৪ ডলার।
আরও পড়ুন: ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে ডিএমপির ১৬৬৬ মামলা
১৭ এপ্রিল ২০২৬ এর সর্বশেষ প্রকাশনা অনুযায়ী এটির মূল্য দাঁড়ায় ১৬২.৯৩ মার্কিন ডলার। আর ১ এপ্রিল থেকে ১৭ এপ্রিল ২০২৬ এর এখানে যদি গড় মূল্য বিবেচনা করা হয় তাহলে এটির মূল্য দাঁড়ায় ২০৮.৭৪ ডলার, যেটি মার্চে গড় মূল্য ছিল ১৮৬.৫৯ ডলার। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে ১৪২.৭৩ শতাংশ। অকটেন সেখানে ৭২.২৩ শতাংশ, জেট ফুয়েল ১৪৩.০৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানে অকটেনের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৮ শতাংশ, যেখানে ডিজেলের মূল্য তারা বৃদ্ধি করেছে ৪০ শতাংশ। ভারতের মূল্য দেখলে মনে হবে যে তারা মূল্য বৃদ্ধি করেনি, কিন্তু তারা শুল্ক কাঠামোর পুনর্বিন্যাস ঘটিয়ে মূল্য স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
শ্রীলঙ্কায় অকটেনের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে ৪৪ শতাংশ, ডিজেলের মূল্য ৩৫ শতাংশ। একইভাবে অবাক করা বিষয় হলো, যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশাল তেলের মজুদ রয়েছে সেই দেশেই অকটেনের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে ৫০ শতাংশ এবং ডিজেলও একই হারে বেড়েছে। সেখানে আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় রেখে পেট্রোল, ডিজেল, অকটেনের মূল্য মাত্র ১০ থেকে মাত্র ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি করেছি।’
তিনি আরও বলেন, যুদ্ধের প্রথম ৪৫ দিন কৃষকদের স্বার্থ বিবেচনায় সরকার মূল্য বৃদ্ধি থেকে বিরত ছিল। পরে বাস্তবতার নিরিখে সীমিত পরিসরে মূল্য সমন্বয় করা হয়, যাতে ভর্তুকি, কৃষি সহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা যায়।
তিনি জানান, পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকায় ‘ফুয়েল পাস’ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে সারা দেশে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় অনেক এলাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার ইতোমধ্যে গণমাধ্যম প্রতিনিধি ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক করেছে এবং ধারাবাহিকভাবে পরামর্শ নিচ্ছে। বিরোধী দলসহ সকলের গঠনমূলক প্রস্তাব গ্রহণে সরকার প্রস্তুত রয়েছে।
তিনি সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এ সংকট মোকাবেলা সম্ভব।
টিএই/এআরএম




