সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্যপ্রাণী উদ্ধারের ভিডিও দেখে আগ্রহ থেকে শুরু। সেই আগ্রহই ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে দায়বদ্ধতায়। এখন নিয়মিত সাপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী উদ্ধার করছেন রংপুরের তরুণ স্বেচ্ছাসেবক মো. নুর হাসান নাহিদ। তাঁর মতে, সাপ বাঁচানো মানে শুধু একটি প্রাণীকে রক্ষা করা নয়, বরং প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখা। বন্যপ্রাণী উদ্ধার কার্যক্রমে তাঁর অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
ঢাকা মেইল: বন্যপ্রাণী উদ্ধার কাজে কীভাবে যুক্ত হলেন?
বিজ্ঞাপন
নাহিদ: ২০২১ সালে সোশ্যাল মিডিয়ায় বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী একটি টিমের কাজ দেখি। তাদের কাজ ভালো লাগে। তখন থেকেই অনলাইনে ভিডিও দেখে, পোস্ট পড়ে নিজে নিজে সাপ সম্পর্কে শেখা শুরু করি। বন্ধুদের মাঝেও সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করতাম। একদিন এক বন্ধুর বাসায় সাপ ঢোকে। ছবি দেখে একটি গ্রুপে পোস্ট করি। সেখানকার একজন অভিজ্ঞ রেসকিউয়ারের গাইডলাইনে প্রথমবার সাপ উদ্ধার করি। তখন কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা আমার ভাবনাই বদলে দেয়। বুঝতে পারি—সাপকে মেরে ফেলার বদলে বাঁচানো যায়, আর প্রকৃতির জন্য তা জরুরি। সেখান থেকেই এই কাজে যুক্ত হওয়া।
ঢাকা মেইল: প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়াটা কেমন?
নাহিদ: আমাদের সংগঠনে ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রথমে লার্নিং ব্যাচ—সপ্তাহে ২-৩টি অনলাইন ক্লাস হয়। সেখানে বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশের ১০০টির বেশি প্রজাতির সাপ নিয়ে বিস্তারিত পড়ান—চেনা, আচরণ, প্রজনন সবকিছু। এরপর পারফরম্যান্স অনুযায়ী কোর গ্রুপে নেওয়া হয়। সেখান থেকে বাছাই করে প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং দেওয়া হয়, যা ৩-৭ দিনের হয়। চট্টগ্রাম, পঞ্চগড়সহ বিভিন্ন জায়গায় এই প্রশিক্ষণ হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা মেইল: পাখি উদ্ধারে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ থাকে?
নাহিদ: পাখির ক্ষেত্রে আমরা ততটা এক্সপার্ট না। অনেক সময় ভালো করতে গিয়ে ভুলভাবে হ্যান্ডেল করলে পাখি স্ট্রেসে পড়ে। এজন্য IUCN আমাদের দিনাজপুরের বীরগঞ্জে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। সেখানে পাখি ও অন্যান্য প্রাণী নিরাপদে ধরার কৌশল শিখেছি।
ঢাকা মেইল: উদ্ধার কাজে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
নাহিদ: মানুষের ভ্রান্ত ধারণা। অনেকেই মনে করে আমরা সাপ ধরে বিক্রি করব। আবার কেউ টাকা দাবি করে। আরেকটা বড় সমস্যা উৎসুক জনতার ভিড়। অনেক সময় রেসকিউ প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকলেও কেউ হঠাৎ করে আঘাত করে পুরো কাজ নষ্ট করে দেয়। গ্রামাঞ্চলে এসব সমস্যা বেশি, শহরে তুলনামূলকভাবে মানুষ সচেতন।
ঢাকা মেইল: শুধু সাপ নাকি অন্য প্রাণীও উদ্ধার করেন?
নাহিদ: আমরা সব ধরনের বন্যপ্রাণী উদ্ধার করি—গন্ধগোকুল, বনবিড়াল, বিভিন্ন পাখি। তবে সব ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। যেমন বানর উদ্ধার করতে ট্রাঙ্কুলাইজার গান লাগে, যা আমাদের কাছে নেই।
ঢাকা মেইল: কখনো জীবনঝুঁকির মুখে পড়েছেন?
নাহিদ: রেসকিউ করতে গিয়ে বিষধর সাপের কামড় খাইনি। প্রশিক্ষণে শেখানো হয়—যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজের নিরাপত্তা আগে। প্রয়োজনে সাপ ছেড়ে দিতে হবে, কিন্তু ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। তবে একবার একটি নির্বিষ সাপ হাতে থাকা অবস্থায় কামড় দিয়েছিল—ওটার পেটে খাবার থাকায় অস্বস্তি হচ্ছিল, তাই কামড় দেয়।
ঢাকা মেইল: প্রশাসনিক সহায়তা পান কি?
নাহিদ: বন বিভাগের সঙ্গে আমাদের ভালো যোগাযোগ আছে। প্রয়োজন হলে তারা সহায়তা করে। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গেও সম্পর্ক ভালো রাখি। এতে আইনি সহায়তা পাওয়া সহজ হয়। পাখি শিকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে বন্দুক জব্দ, জরিমানাও করেছি।
ঢাকা মেইল: সাধারণ মানুষের ভুল ধারণা কোথায়?
নাহিদ: আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ইকোসিস্টেমের গুরুত্ব বাস্তবভাবে বোঝানো হয় না। ফলে মানুষ সাপ দেখলেই মেরে ফেলে। অথচ প্রতিটি প্রাণীরই পরিবেশে ভূমিকা আছে। একটা প্রাণী কমে গেলে বা বেশি হলে ভারসাম্য নষ্ট হয়।
ঢাকা মেইল: সাপের কামড়ে মৃত্যুহার কমাতে কী করা দরকার?
নাহিদ: সবচেয়ে বড় সমস্যা কুসংস্কার। অনেকেই হাসপাতালে না গিয়ে ওঝার কাছে যায়। এতে সময় নষ্ট হয়ে মৃত্যু হয়। ভারতে অ্যান্টিভেনম সহজলভ্য, ডাক্তাররা প্রশিক্ষিত। আমাদের দেশেও উপজেলা পর্যায়ের ডাক্তারদের প্রশিক্ষণ দিলে পরিস্থিতি অনেক উন্নত হবে। সব ক্ষেত্রে আইসিইউ লাগে না—সঠিক ম্যানেজমেন্টই মূল বিষয়।
ঢাকা মেইল: নতুনদের জন্য আপনার বার্তা কী?
নাহিদ: রেসকিউয়ার হওয়া একটি স্বেচ্ছাসেবা। ক্যারিয়ার হিসেবে নয়—মানবিকতা ও পরিবেশের জন্য কাজ করার মানসিকতা নিয়ে আসতে হবে। তরুণদের এগিয়ে আসা জরুরি, কারণ কুসংস্কার ভাঙতে তাদেরই ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।
ঢাকা মেইল: ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কিছু বলুন।
নাহিদ: আমি বর্তমানে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী, গাইবান্ধা সরকারি কলেজে হিসাববিজ্ঞান বিভাগে পড়ছি। ছোটবেলা থেকেই স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে যুক্ত। ক্লাস ফাইভে প্রথম একটি সংগঠনে যুক্ত হই। এরপর বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, রক্তদান কার্যক্রমের মাধ্যমে কাজ করতে করতে এখন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ করছি।
সবশেষ এই তরুণ রেসকিউয়ার বলেন, আমাদের লক্ষ্য শুধু প্রাণী বাঁচানো নয়, মানুষকেও বাঁচানো। সচেতনতা বাড়লে কুসংস্কার কমবে, প্রাণীও বাঁচবে, মানুষও বাঁচবে।
এমএইচএইচ/এআর




