*ব্যবসায়ীরা আর হালখাতার আয়োজন করেন না
*বকেয়া দেওয়ার দিনও শেষ হতে চলেছে
*আগে বকেয়া পরিশোধ চলত বৈশাখের দিনে
*বাড়তি ঝামেলা মনে করেন এখনকার ব্যবসায়ীরা
*হালখাতা ছিল ক্রেতা ও বিক্রেতার মেলবন্ধন
এখন প্রায় সব দোকানের ভেতর-বাইরে স্টিকার বা কাগজে লেখা থাকে—বাকি চাহিয়া লজ্জা দিবেন না। কিন্তু একসময় এই বাকি টাকা তুলতেই আয়োজন করা হতো হালখাতা। পহেলা বৈশাখ এলেই দোকানজুড়ে থাকত সাজসজ্জা, আমন্ত্রণ আর আপ্যায়নের আয়োজন। হালখাতা ছিল কেবল হিসাবের খাতা খোলা নয়, ছিল সম্পর্ক নবায়নের এক সামাজিক উৎসব।
বিজ্ঞাপন
সময়ের পরিবর্তনে সেই হালখাতা এখন হারাতে বসেছে। প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেন, বদলে যাওয়া ব্যবসায়িক সংস্কৃতি আর মানুষের ব্যস্ততায় ঐতিহ্যের এই আয়োজন ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে। অনেকেই বলছেন, আর কিছুদিন পর হালখাতা শব্দটি বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।
পহেলা বৈশাখের দিন ব্যবসায়ীরা নতুন খাতায় হিসাব-নিকাশ শুরু করতেন। পুরোনো বকেয়া পরিশোধের জন্য ক্রেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হতো। দোকানে দোকানে চলত মিষ্টিমুখ—নাড়ু, সন্দেশ, লুচি-পুড়ি, কখনো গরুর মাংস দিয়ে আপ্যায়ন। গ্রাহকদের হাতে তুলে দেওয়া হতো দাওয়াতের কার্ড। দিনভর উৎসবমুখর পরিবেশে চলত হিসাব মেলানো আর সম্পর্কের নবায়ন।
প্রবীণদের ভাষ্যে, পহেলা বৈশাখের দিন হালখাতার আয়োজন করা হতো। এদিন গ্রামেগঞ্জের দোকানগুলোর সামনে বড় বড় লাল-নীল সামিয়ানা টাঙিয়ে লোকজনের বসার জায়গা করে খাবারের আয়োজন করা হতো। আর দিনভর মাইকে গান-বাজনা বাজিয়ে দিনটি উদযাপন করা হতো। বছরের নতুন দিনে পুরো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সাজানো হতো নতুন সাজে।
সেই সময়ে এমন হালখাতার আয়োজন করতেন মুদি দোকানি থেকে শুরু করে সব ধরনের ব্যবসায়ী। তারা বলছেন, একসময় পহেলা বৈশাখ মানেই ছিল দোকানে দোকানে ক্রেতাদের আমন্ত্রণ। ব্যবসায়ীরা নতুন খাতায় হিসাব-নিকাশ খুলতেন। দিনটি তাদের ব্যস্ততায় কাটত। নতুন খাতা খোলা, দিনভর পুরোনো গ্রাহকদের মিষ্টিমুখ করানো এবং সেই টাকা তোলায় ব্যস্ত থাকতেন তারা। যা ছিল ক্রেতা ও বিক্রেতার আন্তরিকতা ও সামাজিক মেলবন্ধন। কিন্তু সময়ের স্রোতে সেই হালখাতা আর হয় না। এখন যেন শুধুই স্মৃতির পাতায় বন্দী সেই দিনগুলো।
বিজ্ঞাপন
প্রযুক্তির স্রোতে পাল্টে গেছে ক্রেতা ও বিক্রেতার সম্পর্ক
একুশ শতকে হিসাব-নিকাশ চলছে কম্পিউটারে ও ডিজিটাল নোটপ্যাডে। কেউ কেউ নোটবুকে সেই হিসাব করে রাখছেন।প্রযুক্তির বদৌলতে জায়গা করে নিয়েছে কম্পিউটার, মোবাইল অ্যাপ আর ডিজিটাল হিসাবরক্ষণ যন্ত্র, যার ফলে আগের মতো আর হাতে লিখতে হয় না। তবে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটি লক্ষণীয়, তা হলো—এখন আর বাকিতে জিনিসপত্র বিক্রি তেমন হয় না বললেই চলে। তবে এখনো গ্রাম ও শহরে কিছু বড় ব্যবসায়ী তাদের হালখাতার প্রচলন ধরে রেখেছেন।
হালখাতার প্রচলন ও ইতিহাস যা বলছে
মূলত মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে বাংলা সনের প্রবর্তন শুরু হয়। তখন থেকেই হালখাতার প্রচলনও শুরু হয় বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন। তখন সম্রাট আকবর কৃষক ও জমিদারদের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য বাংলা সনের প্রথম দিনে এই হালখাতার আয়োজনের রীতি চালু করেন। মূলত তা ছিল কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের দিন মাত্র। সেই থেকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পহেলা বৈশাখে হালখাতা পালন হয়ে আসছে, যা প্রায় ৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই ঐতিহ্য বাঙালি ব্যবসায়িক সংস্কৃতির অংশ ছিল। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে সেই অনুষ্ঠানে ভাটা পড়তে শুরু করেছে।
হালখাতার দিনের পরিবেশ ও স্মৃতি
ঢাকার নবাবপুর এলাকার প্রবীণ ব্যবসায়ী মো. শফিকুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, হালখাতার দিনটা ছিল ঈদের মতো আনন্দের। দোকান পরিষ্কার করে সাজানো হতো। দরজায় আলপনা আঁকা হতো। লাল কাপড়ে মোড়া নতুন খাতা রাখা থাকত। ক্রেতারা নতুন কাপড় পরে আসতেন। আমরা মিষ্টি আর শরবত দিয়ে আপ্যায়ন করতাম। দিনভর চলত সেই অনুষ্ঠান। লোকজন আসতেন, খেয়ে বকেয়া টাকা দিয়ে যেতেন।
দিনাজপুরের এক পুরোনো ক্রেতা আব্দুল মালেক। তিনি আশির দশক থেকে স্থানীয় বাজারে হোটেল ব্যবসা করতেন। তাঁর দোকানে মিলত চা, পরোটা, ডাল, সিঙ্গাড়া, নিমকি ও জিলাপি। তিনি বলেন, আগে গ্রাহকদের সম্মান করা হতো। বছরের প্রথম দিনে তাদের দাওয়াত করে ডেকে আনা হতো। এরপর সাধ্যমতো কেউ মিষ্টিমুখ, কেউ ডাল-ভাত, কেউ মাংস খাইয়ে আপ্যায়ন করতেন। এখন সেই দিনগুলো শুধুই স্মৃতি।
পার্বতীপুরের তানভীর আহমেদ এখন তিনি স্কুলশিক্ষক হিসেবে অবসর সময় কাটাচ্ছেন। সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে হালখাতায় যেতাম। বাড়ির পাশেই ছিল বাজার। সেই বাজারের দোকানে গেলে নাম ধরে ডাকতেন আব্বাস চাচা। এরপর আমাদের বসতে দিতেন। মিষ্টি খাওয়াতেন। আব্বা তাঁর পুরো বছরের বাকি টাকা পরিশোধ করতেন। দিনটা সত্যিই আনন্দের ছিল, কিন্তু এখন এসব আর হয় না।
রংপুরের নীলফামারীর প্রবীণ গৃহিণী রওশন আরা বেগম নীলফামারী সদরের একটি গ্রামে বসবাস করেন। সেই সময় তাঁর স্বামী ছিলেন এলাকার প্রভাবশালী একজন মানুষ। ফলে কমবেশি বাজারের সব দোকান থেকে তাঁদের হালখাতার দাওয়াত কার্ড আসত। তিনি সেই দিনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, হালখাতার নিমন্ত্রণ পেলে খুব ভালো লাগত। পরিবারসহ সকলে যেতাম। আমরা তো মহিলা মানুষ, ঘরের বাইরে বের হতাম না, কিন্তু ওই দিন সকলে দাওয়াত খেতে যেতাম। ফলে দোকানিকে দেখা হতো। তিনিও ভাবী হিসেবে খুব সম্মান করতেন। নানা গল্প করতেন। এখন সেই আন্তরিকতাও নেই। সবকিছু যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে।
হালখাতা নিয়ে ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিভঙ্গি
নারায়ণগঞ্জের কাপড় ব্যবসায়ী হরিদাস সাহা বলেন, আসলে ওই দিনটাই ছিল সারা বছরের বাকি বা বকেয়ার টাকা পরিশোধের দিন। আমরাও তা বিশ্বাস করতাম। এখনো করি। কিন্তু ডিজিটাল যুগে এখন আর হালখাতা হয় না।
ঢাকার মধ্যবয়সী ক্রেতা মাহবুব হাসান বলেন, আমরা ছোটবেলায় হালখাতার অপেক্ষায় থাকতাম। খুব মনে আছে, কারও হালখাতার দাওয়াত কার্ড দেখলেই মাকে বলতাম, যেন দিনটিতে আমাকে সাজিয়ে-গুজিয়ে দেন। এরপর আমরা ওই দিন বাবার সঙ্গে হালখাতা খেতে যেতাম। আগে বুঝতাম, হালখাতা মানেই খাওয়া। কিন্তু পরে বুঝেছি, দিনটি বিশেষ একটি দিন। এখন অনলাইনে কেনাকাটা করি, মোবাইলে টাকা পরিশোধ করি। সুবিধা হয়েছে, কিন্তু সেই আনন্দটা হারিয়ে গেছে।
ময়মনসিংহের প্রবীণ ব্যবসায়ী আবুল কাশেম বলেন, হালখাতা শুধু ব্যবসার অনুষ্ঠান ছিল না, এটি ছিল ক্রেতা ও বিক্রেতার সম্পর্কের উৎসব। মানুষে মানুষে যে যোগাযোগ তৈরি হতো, সেটা এখন আর দেখা যায় না।
প্রবীণ ব্যবসায়ীদের স্মৃতিচারণ
পুরান ঢাকার ৭০ বছর বয়সী কাপড় ব্যবসায়ী হাজী মো. আব্দুল করিম বলেন, একসময় হালখাতা ছিল আমাদের জন্য উৎসবের মতো। ক্রেতারা পরিবারের সদস্যের মতো ছিলেন। তারা আসতেন, পুরোনো হিসাব মিটাতেন, আমরা মিষ্টি খাওয়াতাম। এখন সেই সম্পর্কটাই নেই, সবকিছু শুধু লেনদেনে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।
দিনাজপুরের বাহাদুর বাজারের প্রবীণ মুদি ব্যবসায়ী শ্রী রমেশ চন্দ্র পাল স্মৃতিচারণ করে বলেন, হালখাতার দিনটা ছিল সারা বছরের মধ্যে সবচেয়ে ব্যস্ত ও আনন্দের দিন। আগের রাতেই দোকান সাজাতাম। এখন ছেলেরা বলে, এসব করে লাভ কী! কিন্তু আমি জানি, এতে যে সম্পর্ক তৈরি হতো, তার কোনো বিকল্প নেই।
নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের ব্যবসায়ী মো. ইউনুস আলী বলেন, আগে খাতার পাতায় হাতে লিখে হিসাব রাখতাম। এখন সব কম্পিউটারে। সুবিধা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই আবেগটা হারিয়ে গেছে। হালখাতা মানে ছিল নতুন করে শুরু করা। এখন সেটা শুধু একটি তারিখ মাত্র।
রংপুর শহরের স্টেশন রোডের স্বর্ণ ব্যবসায়ী বিমল কুমার সাহা বলেন, আমরা এখনও ছোট পরিসরে হালখাতা করি। পুরোনো কিছু ক্রেতা আসেন, তাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় হয়। তবে আগের মতো জৌলুস নেই। নতুন প্রজন্মকে এই ঐতিহ্য বোঝানো দরকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হালখাতা শুধু একটি অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া ছিল না, এটি ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। এটি মানুষের মধ্যে বিশ্বাস, সৌহার্দ্য এবং পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। তাই এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়া মানে আমাদের সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হারিয়ে যাওয়া।
হালখাতা কমে যাওয়ার কারণগুলো
প্রবীণ ব্যবসায়ী, ক্রেতা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল লেনদেন ও প্রযুক্তির প্রভাবে হালখাতার প্রচলন উঠে যাচ্ছে। এছাড়াও মানুষ এখন আর বাকিতে কিনতে চায় না। দোকানিরাও বাকিতে দিতে চান না। ফলে হালখাতার প্রয়োজনও কমে গেছে। আগে ব্যবসায়ীরা গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির জন্য হালখাতার আয়োজন করতেন। কিন্তু আধুনিক যুগে শপিংমল, সুপারশপ ও করপোরেট ব্যবসায় ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গা কমে গেছে। গ্রাহক-দোকানদার সম্পর্কের বদলে তা হয়ে গেছে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক। ফলে ঐতিহ্যের হালখাতা স্বাভাবিকভাবেই কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি শহুরে জীবনের ব্যস্ততায় মানুষ এখন আর আলাদা করে হালখাতার অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সময় পায় না। অনেক তরুণ ব্যবসায়ী হালখাতার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন নন। তারা এটিকে সময়সাপেক্ষ বা অপ্রয়োজনীয় মনে করেন। ফলে এই প্রথা টিকে থাকছে না। আগে ব্যবসা ছিল সম্পর্কনির্ভর—বিশ্বাস, আস্থা ও নিয়মিত যোগাযোগের ওপর ভিত্তি করে। এখন সেই জায়গায় এসেছে দ্রুত লেনদেন ও প্রতিযোগিতা। ফলে হালখাতার মতো সম্পর্কভিত্তিক প্রথা দুর্বল হয়ে পড়েছে। আগে হালখাতা আয়োজন করতে দোকান সাজানো, মিষ্টি বিতরণ, নিমন্ত্রণ করা লাগত। ফলে এসবের জন্য বাড়তি খরচ ও সময় প্রয়োজন হতো। আর এখন অনেক ব্যবসায়ী এটিকে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় মনে করে বাদ দিচ্ছেন।
এমআইকে/এআর




