# একসময় দৈনন্দিন কাজের পরিকল্পনা হতো পঞ্জিকা দেখে
# মোগল আমল থেকে বাংলা পঞ্জিকার ইতিহাস শুরু
বিজ্ঞাপন
# হালখাতায় পঞ্জিকা দেওয়া ছিল প্রচলিত রীতি
# বর্তমানে কাগজের পঞ্জিকার জায়গা দখল করছে ডিজিটাল প্রযুক্তি
একসময় বাঙালির ঘরের দেয়ালে টানানো বাংলা পঞ্জিকা ছিল দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সকালে ঘুম থেকে উঠে দিন শুরু হতো সেই পাতায় চোখ রাখার মধ্য দিয়ে, আজ কোন তারিখ, তিথি বা কোনো বিশেষ দিন আছে কি না। বিয়ে, পূজা, কৃষিকাজ কিংবা যেকোনো শুভ কাজের সময় নির্ধারণেও ভরসা ছিল এই পঞ্জিকাই। কিন্তু সময় বদলেছে। প্রযুক্তির অগ্রগতিতে সেই পঞ্জিকার জায়গা এখন দখল করেছে স্মার্টফোন ও ডিজিটাল ক্যালেন্ডার। ফলে ঘরের দেয়াল থেকে প্রায় উধাও হয়ে গেছে একসময়কার সেই পরিচিত বাংলা পঞ্জিকা।
বাংলা নববর্ষ এলেই চারদিকে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে চলে মেলা, শোভাযাত্রা, নতুন পোশাক আর পান্তা-ইলিশের আয়োজন। এই দিনের জন্য যেন বাঙালিয়ানা ফিরে আসে জোরালোভাবে। কিন্তু সেই এক দিনের বাইরে বছরের বাকি সময়জুড়ে বাংলা তারিখের খোঁজ রাখেন এমন মানুষের সংখ্যা পাওয়া খুবই দুস্কর।
বিজ্ঞাপন
ঢাকার একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের বসার ঘরে এখন ঝুলছে আধুনিক ডিজিটাল ঘড়ি। সময়ের পাশাপাশি সেখানে দেখা যাচ্ছে তারিখ, দিন ও তাপমাত্রা। তবে বাংলা তারিখ নেই। পরিবারের কর্তা সাবের আলী জানান, আগে বাসায় পঞ্জিকা থাকত। এখন মোবাইলেই সব পাওয়া যায়, তাই আলাদা ক্যালেন্ডার রাখার প্রয়োজন মনে করেন না তিনি।
বাংলা ক্যালেন্ডারের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। মোগল সম্রাট আকবর কৃষিজমি থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে যে ‘তারিখ-ই-ইলাহী’ চালু করেছিলেন, সেটির ধারাবাহিক বিকাশেই পরবর্তীতে বাংলা সনের রূপ তৈরি হয়। ইসলামি চন্দ্রপঞ্জি ও সৌর গণনার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে এই সময় গণনার পদ্ধতি।
এর ভিত্তিতেই পরে বাংলা পঞ্জিকা জনপ্রিয়তা পায়। এতে তিথি, নক্ষত্র, শুভ মুহূর্ত ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সময় বিস্তারিতভাবে উল্লেখ থাকত। বিয়ে, অন্নপ্রাশন, গৃহপ্রবেশ থেকে শুরু করে নানা ধর্মীয় আয়োজন-সবই নির্ধারিত হতো পঞ্জিকা দেখে।
দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজ-বিয়ে, গৃহপ্রবেশ, পূজা, ফসল তোলা কিংবা ভ্রমণ-সবকিছুর সময় নির্ধারণে বাংলা তারিখ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তখন ইংরেজি ক্যালেন্ডার থাকলেও এতটা জনপ্রিয় ছিল না। বরং বাংলা দিনপঞ্জিই ছিল সময় গণনার প্রধান ভরসা।
গ্রামের চিত্র ছিল আরো ভিন্ন। সেখানে পঞ্জিকা ছিল জীবনযাত্রার অংশ। কৃষিকাজের সময় নির্ধারণ, বীজ বপন, ফসল কাটার সময়-সবকিছুই নির্ভর করত ঋতু ও বাংলা মাসের ওপর। ‘আষাঢ়ে বৃষ্টি’, ‘পৌষে শীত’, ‘ফাল্গুনে বসন্ত’ সবকিছু বাস্তব জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল।
বাংলা ক্যালেন্ডার শুধু সময় গণনার মাধ্যমই ছিল না, ছিল শিল্প ও সংস্কৃতির অংশও। একসময় ক্যালেন্ডারে দেবদেবীর ছবি, লোকজ চিত্রকলা ও বিখ্যাত শিল্পীদের আঁকা ছবি থাকত। অনেকেই এসব ছবি কেটে ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখতেন।
কিন্তু বর্তমানে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেনে বসেছে দিন গণনার পঞ্জিকা। এখন স্মার্টফোন, কম্পিউটার কিংবা ডিজিটাল ঘড়ি সহজেই সময় ও তারিখ জানিয়ে দেয়। বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ ও ওয়েবসাইট প্রতিদিনের বাংলা তারিখ, তিথি ও নক্ষত্রের তথ্য সরবরাহ করছে। ফলে আলাদা করে পঞ্জিকা কিনে দিনক্ষণ দেখার প্রয়োজন পড়ছে না।
বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম পঞ্জিকা থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছে। তাদের কাছে তথ্য মানেই এ ক্লিকেই সবকিছু হাতে চলে আসা। ফলে পঞ্জিকার পাতা উল্টে সময় খোঁজার অভ্যাস তাদের মধ্যে তৈরি হয়নি। এই পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে পঞ্জিকা বিক্রেতাদের ওপর।
ব্যবসায়ীদের জন্যও ক্যালেন্ডার ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচারণার মাধ্যম। হালখাতার সময় গ্রাহকদের হাতে ক্যালেন্ডার তুলে দেওয়া হতো, যাতে দোকানের নাম ও ঠিকানা ছাপা থাকত। এখনো কিছু ক্ষেত্রে এই প্রথা টিকে আছে, তবে আগের মতো ব্যাপক নয়।
ঢাকার বাংলাবাজার এবং নিউমার্কেট এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আগে বাংলা নববর্ষের আগে পঞ্জিকার বিক্রি নিয়ে এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হতো। এখন সেই চিত্র নেই বললেই চলে। বিক্রেতারা বলছেন, চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেকেই আর আগের মতো পঞ্জিকা মজুত রাখেন না।
বঙ্গবাজার বই মার্কেট বহু বছর ধরে পঞ্জিকা বিক্রি করেন বর্মণ দাস। তিনি জানান, আগে বছরের শেষ দিকে হাজারখানেক পঞ্জিকা বিক্রি করতাম। এখন ১০-১২টার বেশি বিক্রি হয় না। সারাদিন দোকানে বসে থাকলেও ক্রেতা আসে খুব কম।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলা পঞ্জিকার ব্যবহার পুরোপুরি হারিয়ে যাবে না, তবে এর রূপ বদলাবে। কাগজের পঞ্জিকার জায়গা হয়তো দখল করবে ডিজিটাল পঞ্জিকা। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে সচেতনতা প্রয়োজন। শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে বাংলা ক্যালেন্ডারের গুরুত্ব বোঝানো জরুরি। শুধু একটি দিন উদযাপন নয়, বরং বছরের প্রতিটি দিনে বাংলা তারিখের ব্যবহার বাড়াতে হবে। তবেই এই ঐতিহ্য বেঁচে থাকবে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর দক্ষিণ এশিয়ায় একটি অভিন্ন জাতীয় পঞ্জিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে ১৯৫২ সালের নভেম্বরে ভারতের সরকার ড. মেঘনাদ সাহার নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। এই কমিটি প্রচলিত নাক্ষত্রিক পঞ্জিকার পরিবর্তে ক্রান্তীয় সৌর পঞ্জিকা গ্রহণ এবং শকাব্দকে জাতীয় পঞ্জিকা হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করে। পরবর্তীতে ১৯৫৭ সালে ভারত সরকার ওই সুপারিশ গ্রহণ করে শকাব্দভিত্তিক জাতীয় পঞ্জিকা চালু করে। এই পঞ্জিকায় বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস ৩১ দিনের এবং অন্যান্য মাস ৩০ দিনের নির্ধারণ করা হয়। অধিবর্ষে চৈত্র মাস ৩১ দিনের হয়। তবে সময়ের সঙ্গে এই পঞ্জিকা প্রত্যাশিত জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি এবং ২০১৫ সালের পর ভারতে এর ব্যবহার আরও সীমিত হয়ে পড়ে।
বাংলা অঞ্চলেও পঞ্জিকা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৬৬ সালে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি বাংলা পঞ্জিকা সংস্কারের সুপারিশ করে। পরে বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৭ সালে এই সুপারিশ গ্রহণ করে বাংলা পঞ্জিকা সংস্কার করে। এতে ১৪ এপ্রিলকে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন হিসেবে নির্ধারণ করা হয় এবং মাসগুলোর দিন সংখ্যা পুনর্বিন্যাস করা হয়, যাতে বৈশাখ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত ৩১ দিন এবং অন্যান্য মাস ৩০ দিনের হয়।
তবে এই সংস্কার নিয়ে মতভেদ রয়েছে। সমালোচকদের মতে, পঞ্জিকা সংস্কার প্রক্রিয়ায় জনগণের ঐতিহ্য, কৃষিভিত্তিক বাস্তবতা এবং সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা পুরোপুরি বিবেচনায় আনা হয়নি। তাদের দাবি, বাংলা পঞ্জিকা মূলত একটি প্রাচীন সৌর ও নাক্ষত্রিক কৃষিভিত্তিক ব্যবস্থা, যা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফসলি সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই অঞ্চলে পহেলা বৈশাখসহ নানা নববর্ষ উদযাপন ঐতিহ্যগতভাবে কৃষি ও ঋতুচক্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে সংস্কারের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যের কিছু পরিবর্তন ঘটেছে বলে মনে করেন তারা।
এএইচ/এমআর




