মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

রমনা বটমূলে বৈশাখ: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও চেতনার বিস্তার

মাহফুজুর রহমান
প্রকাশিত: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৩ এএম

শেয়ার করুন:

রমনা বটমূলে বৈশাখ: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও চেতনার বিস্তার
প্রতি বছর রমনা বটমূলে ছয়ানটের অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পহেলা বৈশাখের কর্মসূচি শুরু হয়।

বাংলা নববর্ষের প্রথম সকাল মানেই ঢাকার রমনা বটমূল। শতবর্ষী বটগাছের ছায়ায় সূর্যোদয়ের সঙ্গে যখন ভেসে ওঠে “এসো হে বৈশাখ” গান, তখন তা শুধু সাংস্কৃতিক আয়োজন থাকে না—এটি হয়ে ওঠে বাঙালির আত্মপরিচয়ের এক গভীর উচ্চারণ।

রমনা পার্কের এই বটমূল দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকার সাংস্কৃতিক চর্চার কেন্দ্র। তবে পহেলা বৈশাখের সঙ্গে এর সম্পর্ক গড়ে ওঠে বিশেষ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে।


বিজ্ঞাপন


সূচনা: সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ভাষা

রমনা বটমূলে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের সূচনা হয় ১৯৬৭ সালে। উদ্যোগ নেয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট।

তখন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি হচ্ছিল। রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধের চেষ্টা এবং বাঙালি পরিচয়ের অবমূল্যায়নের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। সেই প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবেই ছায়ানট রমনা বটমূলে নববর্ষ উদযাপন শুরু করে।

১৯৬৭ সালের সেই আয়োজন ছিল এক অর্থে ঘোষণা—“আমরা বাঙালি, আমাদের সংস্কৃতি আমাদের শক্তি।”


বিজ্ঞাপন


স্বাধীনতার পর: জাতীয় উৎসবের রূপ

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর রমনা বটমূলে বৈশাখ উদযাপন আরও ব্যাপকতা পায়। ধীরে ধীরে এটি জাতীয় উৎসবে রূপ নেয়। ছায়ানটের পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিল্পী ও কবিরাও এতে যুক্ত হন।

পহেলা বৈশাখ তখন শুধু ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন নয়; এটি হয়ে ওঠে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি চেতনার উৎসব, যেখানে ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণি নির্বিশেষে সবাই অংশ নেয়।

২০০১ সালের বোমা হামলা: শোক থেকে শক্তি

২০০১ সালের পহেলা বৈশাখে রমনা বটমূলে ভয়াবহ বোমা হামলা হয়। এতে বহু মানুষ নিহত ও আহত হন। এটি ছিল বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার ওপর এক নির্মম আঘাত।

তবে এই ঘটনা মানুষকে দমাতে পারেনি। বরং পরবর্তী বছরগুলোতে আরও দৃঢ়ভাবে মানুষ রমনা বটমূলে জড়ো হয়েছে। বৈশাখ উদযাপন হয়ে উঠেছে প্রতিরোধ, সাহস ও ঐক্যের প্রতীক।

ছায়ানটের আয়োজন: সংগীতের ভেতর চেতনা

রমনা বটমূলে বৈশাখের মূল আকর্ষণ ছায়ানটের ভোরের সংগীতানুষ্ঠান। সূর্যোদয়ের সঙ্গে শুরু হয় গান, কবিতা ও আবৃত্তি।

রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি ও লোকসংগীতের সমন্বয়ে তৈরি হয় এক বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরিবেশ। এখানে শিল্পীরা শুধু গানই পরিবেশন করেন না; তারা ইতিহাস, চেতনা ও পরিচয়ের কথাও তুলে ধরেন।

উৎসবের রূপ: পোশাক, মানুষ, মেলা

রমনা বটমূলের বৈশাখ মানেই রঙের উৎসব। লাল-সাদা পোশাক, ফুলের মালা, আলপনা—সব মিলিয়ে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ।

ভোর থেকেই মানুষ আসতে শুরু করে। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে। আশপাশে বসে ছোট ছোট মেলা, খাবারের দোকান ও বইয়ের স্টল। পান্তা-ইলিশ, পিঠা—সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে এক পূর্ণাঙ্গ সামাজিক উৎসব।

আজকের বৈশাখ: ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন

রমনা বটমূল এখন শুধু ঢাকার নয়, পুরো দেশের বৈশাখ উদযাপনের প্রতীক। টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই আয়োজন সরাসরি সম্প্রচার হয়।

সময়ের সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও জনসমাগম নিয়ন্ত্রণসহ নানা পরিবর্তন এলেও মূল চেতনা অপরিবর্তিত থেকেছে—বাঙালিত্ব, অসাম্প্রদায়িকতা এবং সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা।

রমনা বটমূল তাই শুধু একটি স্থান নয়, এটি একটি প্রতীক। প্রতি বছর এখানে বৈশাখের সূচনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমাদের ইতিহাস সংগ্রামের, আমাদের সংস্কৃতি প্রতিরোধের, আর আমাদের উৎসব একতার।

অনুভূতি

তানভীর আহমেদ (বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী) বলেন, ‘লাল-সাদা পোশাক, গান, মানুষের ভিড়—সবকিছু মিলিয়ে রমনা বটমূল আমাকে নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করে। এখানে এলে মনে হয় সব দুঃখ ভুলে নতুন করে শুরু করতে পারব।’

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর