বিএনপি ক্ষমতায় গিয়েই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে বলে অভিযোগ করেছেন রাষ্ট্রচিন্তার সদস্য সেলিম খান। তিনি বলেন, নির্বাচনপূর্ব সময়ে জনগণের পক্ষে বিভিন্ন সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেই অঙ্গীকার থেকে সরে গিয়ে দলটি আবারও জনগণের সঙ্গে ‘বেইমানি’র নজির স্থাপন করেছে।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র থেকে জুলাই সনদ: প্রতারণার ফাঁদে বাংলাদেশ’ শীর্ষক বিশেষ আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
বিজ্ঞাপন
সেলিম খান বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা, সাম্য ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ছিল এদেশের সাধারণ মানুষের সংগ্রামের ফসল। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর জনগণের প্রতিনিধিত্বের মূল চেতনাকে ভুলে যায়।
তিনি বলেন, ক্ষমতা গ্রহণের পর দলটি নিজেদের একক নেতৃত্বের দাবিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যদের অবদান অস্বীকার করে এবং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে যেন মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কারও কোনো ভূমিকা ছিল না। এই ‘অপরায়ণ’ বা অস্বীকারের ধারাই নতুন রাষ্ট্রের শুরুতেই প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আজও বহমান রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণ নতুন আশার আলো দেখেছিল। এরশাদের নয় বছরের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনের পর তিনদলীয় রাজনৈতিক জোট যে রূপরেখা প্রণয়ন করেছিল, তা ছিল জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। সেই রূপরেখায় পরপর তিনটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আয়োজন এবং রাষ্ট্রক্ষমতার কাঠামোকে গণতান্ত্রিক করার স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল। কিন্তু বিএনপি বিপুল ভোটে ক্ষমতায় এসে সেই রূপরেখাকে উপেক্ষা করে এবং জনগণের প্রত্যাশাকে পদদলিত করে।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৭ বছরের শাসনামলে নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ১৪০০ মানুষের প্রাণহানি এবং প্রায় ২০ হাজার মানুষের আহত হওয়ার ঘটনার মধ্য দিয়ে যে গণঅভ্যুত্থান গড়ে ওঠে, তা নতুন করে জনগণের মধ্যে আশা জাগায়। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। নির্বাচনপূর্ব সময়ে বিএনপি এসব দাবির পক্ষে অবস্থান নেয় এবং ঐকমত্য কমিশনের কাছে লিখিত অঙ্গীকারও করে।
বিজ্ঞাপন
কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর অল্প সময়ের মধ্যেই বিএনপির মধ্যে জনগণকে উপেক্ষা করার প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন তিনি। সেলিম খান বলেন, জনগণের পক্ষে গৃহীত বিভিন্ন অধ্যাদেশ বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা গণঅভ্যুত্থানের চেতনার পরিপন্থী। তিনি এই তিনটি সময়কাল—১৯৭২, ১৯৯০ পরবর্তী সময় এবং বর্তমান পরিস্থিতিকে—বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে ধারাবাহিক বিশ্বাসঘাতকতার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, গত ৫০ বছরে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা প্রধান দুই রাজনৈতিক দলই বারবার জনগণের সঙ্গে বেইমানি করেছে এবং বর্তমানেও সেই ধারার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে তিনি নতুন করে আন্দোলনে নামার আহ্বান জানান এবং বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে সেলিম খান বলেন, সংগঠনটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামোর প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং জনগণের পক্ষে রাষ্ট্রকে কার্যকর করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানও এই সংস্কারের দাবির ভিত্তিতেই সংঘটিত হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে বর্তমানে সেই দাবি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়ছে এবং বিএনপির মতো একটি রাজনৈতিক দলের ‘দুর্বৃত্তায়নের’ মাধ্যমে তা আবারও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আলোচনা সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন অহিংস গণঅভ্যুত্থান আন্দোলন বাংলাদেশের সভাপতি আবুল বাশার, গীতিকার ও অ্যাক্টিভিস্ট শহিদুল্লাহ ফরাজি, নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনের (এনপিএ) কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সদস্য বাকি বিল্লাহ এবং জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টির (জেডিপি) সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল আলীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
এএইচ/এএস




