- প্রকল্প ব্যয় ৩ হাজার ৭৫৪ কোটি ২০ লাখ ৮০ হাজার টাকা
- ৩টি এনিম্যাল প্যাসেজ নির্মাণ
- ১২টি আরসিসি ব্রিজ ও ৪টি বেইলি ব্রিজ
- ৫টি ক্যাম্প ও ২টি ডাকবাংলো এবং ৬টি পৃথক সড়ক নির্মাণ
- ৩৬টি সামাজিক অবকাঠামো নির্মাণ
রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলায় ২৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ‘সীমান্ত সড়ক (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা) নির্মাণ প্রকল্প-২য় পর্যায়’ শীর্ষক এ বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পটি বর্তমানে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় বিস্তারিত পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) এম এ আকমল হোসেন আজাদের সভাপতিত্বে ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সম্মেলন কক্ষে (ব্লক-৩, কক্ষ-১) অনুষ্ঠিত এ সভায় প্রকল্পটির বিভিন্ন দিক উপস্থাপন ও বিশদ আলোচনা করা হয়। সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বাস্তবায়নকারী সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে প্রকল্পের কারিগরি, আর্থিক ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিষয় তুলে ধরেন। প্রকল্পটি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের মাধ্যমে এবং সড়ক ও জনপথ অধিদফতর কর্তৃক বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। প্রায় পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৭৫৪ কোটি ২০ লাখ ৮০ হাজার টাকা, যা সম্পূর্ণ সরকারি (জিওবি) অর্থায়নে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) প্রকল্পটি অননুমোদিত নতুন প্রকল্প তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং এ খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা প্রকল্পটির গুরুত্ব ও অগ্রাধিকারকে প্রতিফলিত করে।
প্রকল্প এলাকা হিসেবে চট্টগ্রাম বিভাগের তিন পার্বত্য জেলা— খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আওতায় খাগড়াছড়ির পানছড়ি, রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাইছড়ি ও বিলাইছড়ি এবং বান্দরবানের থানচি ও রুমা উপজেলায় কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। এসব এলাকা ভৌগোলিকভাবে দুর্গম এবং যোগাযোগব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে দুর্বল হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হয়ে আসছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ২৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলে নিরাপদ, টেকসই ও আধুনিক সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা, নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রম আরও কার্যকর করা এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করাও এর অন্যতম লক্ষ্য। এর পাশাপাশি কৃষিপণ্য দ্রুত পরিবহন, পর্যটন খাতের বিকাশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সার্বিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার বিষয়টিও প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় প্রায় ৫৪০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা রয়েছে, যার একটি বড় অংশ এখনো উন্নত সড়ক যোগাযোগের আওতার বাইরে। ফলে সীমান্ত এলাকায় কার্যকর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা তদারকি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নানা সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সীমান্ত বরাবর নির্ভরযোগ্য সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা থেকে এ প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় মোট ৬টি সড়কে ২৮৮ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে খাগড়াছড়ি জেলার নাড়াইছড়ি-লক্ষ্যাছড়া সড়ক (৩৫ কিমি), রাঙ্গামাটি জেলার বৈরাগীপাড়া-বেতলিং (৪৬ কিমি), মাঝিপাড়া-ঘাসকাপাছড়া (২৫ কিমি), কারলাছড়া-বড়করদিয়া (২৮ কিমি), থালীপাড়া-ছাইথাংপাড়া (৪৬ কিমি) এবং বান্দরবান জেলার ফাতরাজিরা-লিকরি সড়ক (১০৮ কিমি) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব সড়ক নির্মিত হলে পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকা মূল সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পার্বত্য অঞ্চলে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সংকট দূর হবে এবং দুর্গম এলাকায় যাতায়াত সহজ হবে। সীমান্ত এলাকায় দ্রুত যাতায়াত নিশ্চিত হওয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি পাবে এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটবে। একই সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা সহজ হবে।
এ ছাড়া উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার ফলে পার্বত্য অঞ্চলের কৃষিপণ্য দ্রুত দেশের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হবে, ফলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এ ছাড়া পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটবে, নতুন পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠবে এবং দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগমন বাড়বে। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতি আরো গতিশীল হবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন অবকাঠামোগত কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১. ভূমি ও পরামর্শক সেবা: ভূমি অধিগ্রহণ: ৩৬.২১ একর, পরামর্শক সেবা: ৫১৭১ জন-মাস; ২. নির্মাণ ও উন্নয়ন কার্যক্রম: অবকাঠামো: ৫টি ক্যাম্প এবং ২টি ডাকবাংলো নির্মাণ; স্থানীয় সুবিধা: ৩৬টি স্কুল, হাসপাতাল, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং পর্যটক বিশ্রামাগার নির্মাণ; ৩. রাস্তা নির্মাণ: ফ্লেক্সিবল পেভমেন্ট: ২৭২.১৩ কিলোমিটার, রিজিড পেভমেন্ট: ১৪.০৩ কিলোমিটার। এই প্রকল্পের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সামাজিক ও মৌলিক চাহিদা পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি ২৫০০ মিটার রিটেইনিং ওয়াল, ২৫ হাজার বর্গমিটার পাহাড়ি ঢাল সুরক্ষা কাজ, ২০০০টি সাইন পোস্ট, ৪৩ হাজার ২০০টি গাইড পোস্ট, ৫টি হেলিপ্যাড, ১২টি আরসিসি ব্রিজ (৬১৫ মিটার), ৪টি বেইলি ব্রিজ, ১৮০টি আরসিসি বক্স কালভার্ট এবং ৩টি এনিম্যাল প্যাসেজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ৪৫০ কিলোমিটার সাইড ড্রেন নির্মাণ এবং ২৮৬ দশমিক ১৬ কিলোমিটার এলাকায় বনায়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পের আওতায় রক্ষণাবেক্ষণ বাবদও অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
সভায় পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটির বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত মতামত প্রদান করে। বিশেষ করে প্রথম পর্যায়ের প্রকল্পের অভিজ্ঞতা, আইএমইডি’র মূল্যায়ন প্রতিবেদনের সুপারিশ এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের সম্ভাব্য ফলাফল তুলনামূলকভাবে উপস্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রকল্পের সাসটেইনেবিলিটি নিশ্চিত করতে যথাযথ ডিজাইন ও প্রাক্কলন করা হয়েছে কিনা তা নিয়েও আলোচনা হয়।
ভূমি অধিগ্রহণ খাতে প্রস্তাবিত ব্যয়ের যৌক্তিকতা, জেলা প্রশাসনের সম্পৃক্ততা এবং পুনর্বাসন সহায়তার পরিমাণ ও কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সংখ্যা নির্ধারণ, তাদের পুনর্বাসনের ধরন এবং এ সংক্রান্ত জরিপের বিষয়গুলো সভায় গুরুত্ব পায়।
এ ছাড়া অবকাঠামো নির্মাণের বিভিন্ন খাত যেমন: সাইড ড্রেন, রিজিড পেভমেন্ট, রিটেইনিং ওয়াল, বক্স কালভার্ট, মাটি পুনরায় ভরাট এবং অন্যান্য নির্মাণ কাজের ব্যয় প্রাক্কলনের ভিত্তি নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। পরামর্শক নিয়োগ, হেলিপ্যাড নির্মাণ, এনিম্যাল প্যাসেজ এবং বনায়ন কার্যক্রমের পরিকল্পনার যৌক্তিকতা যাচাই করা হয়।
প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র গ্রহণ, ক্রয় পরিকল্পনা প্রণয়ন, এমটিবিএফ সিলিং হালনাগাদ, সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত এবং এক্সিট প্ল্যান অন্তর্ভুক্তির বিষয়েও সভায় গুরুত্বারোপ করা হয়। বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে প্রকল্পের ওপর পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন উপস্থাপনের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে যথাসময়ে সভায় অংশগ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পার্বত্য অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। এতে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সার্বিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। একই সঙ্গে দেশের মূল অর্থনীতির সঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলের সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এএইচ/এফএ

