ই-সিগারেট নিষিদ্ধের বিধান বাতিলের সুপারিশ আত্মঘাতী বলে মনে করছেন তামাক বিরোধী সংগঠনগুলো। ই-সিগারেটের এই বিধান বিলুপ্ত করা হলে লক্ষ কোটি তরুণের জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও মনে করেন সংগঠনগুলোর নেতারা।
রোববার (৫ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১১টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে নিষিদ্ধের বিধানটি বাতিল না করার দাবিও জানানো হয়।
বিজ্ঞাপন
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়, আমরা খুবই উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে ধূমপান ও তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ২০২৫ এর ধারা ৬ (গ) সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে, কিন্তু আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখেছি যে সরকার এই ধারা বিলুপ্তির জন্য কাজ করছে। শঙ্কার বিষয় যে, এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত তার অবস্থান পরিষ্কার করেনি।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, মূলত ই-সিগারেট কোম্পানিগুলো দুটি বিষয়ের উপর প্রাধান্য দিয়ে ই-সিগারেটকে প্রমোট করতে চাচ্ছে। প্রথমত, এটি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য কম ক্ষতিকর। বাংলাদেশে বর্তমানে যে সিগরেটগুলো আছে, সেগুলোই প্রাপ্তবয়স্কদের কাছে বিক্রয় নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না, ঠিক একইভাবে ই-সিগরেটও বিক্রি করা সম্ভব হবে না।
সুতরাং প্রাপ্তবয়স্কদের কাছে বিক্রির যুক্তি দিয়ে যদি ই-সিগারেট বাজারে আনা হয়, তা নিঃসন্দেহে শিশু-কিশোরদের হাতে পৌঁছাবে এবং এটি মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করবে। ইতোমধ্যেই স্কুলের বাচ্চাদের ব্যাগে ই-সিগারেট পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বৈধতা পেলে এটা কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠবে তা নিশ্চয়ই আপনারা বুঝতে পারছেন।
দ্বিতীয়ত, কম ক্ষতিকর বলে যে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে তার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বাংলাদেশে নেই, এমনকি বিশ্বব্যাপীও নেই। কোনো দেশই এটিকে কম ক্ষতিকর বলার পক্ষে আছে নিশ্চিতভাবে এমন কোনো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা যায়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং Centers for Disease Control and Prevention (CDC)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এটিকে ক্ষতিকর বলে প্রচারণা চালাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
যেখানে বাংলাদেশে এই পণ্যের ব্যবহার নেই, সেখানে এই পণ্যকে কম ক্ষতিকর বলে বাজারে এনে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে নতুন ঝুঁকিতে ফেলার কোনো মুক্তিই হয় না।
মূল প্রবন্ধে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির টোব্যাকো কন্ট্রোল এন্ড রির্চাচ (টিসিআরসি) প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর ফারজানা জামান লিজা বলেন, এছাড়াও আমরা অনেকটি বিষয় বলতে চাই। বাংলাদেশ সরকার ধুমপান ত্যাগের জন্য ইতোমধ্যে Quiting System এবং ধূমপান ত্যাগে সহায়ক ওষুধ চালু করেছে। যদি সরকার ওষুধ এবং ধুমপান ত্যাগের কর্মসূচি নিয়ে আসে, তাহলে একই সময়ে কম ক্ষতিকর বলে এমন একটি নেশা পণ্য কেন নিয়ে আসা হবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা আরও একটি বিষয় জানতে চাই- একইভাবে কম ক্ষতিকর হলে সিগারেট কোম্পানিগুলো বিভিন্ন সময় তাদের ব্যবসা প্রসারের জন্য নানা ধরনের ধোঁকাবাজি করেছে। যেমন লাইট, মাইন্ড সিগারেট, ফিল্টারযুক্ত সিগারেট- এগুলোও কম ক্ষতিকর বলে বাজারে আনা হয়েছিল।
কিন্তু আমরা সবাই জানি এগুলো সবই এখনও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বলে পরিচিত, এই সিগারেটগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং বাজার দখল করে নিয়েছে। কম ক্ষতিকর বলা পণ্য শুধুমাত্র তাদের বাজার ধরার কৌশল।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও গ্লোবাল টোব্যাকো এপিডেমিক-২০১১ রিপোর্ট অনুযায়ী ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম (ENDS) আসক্তি তৈরি করে এবং এটা মোটেও নিরাপদ নয়, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ মোট ৪২টি দেশে ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম (ENDS)/ই-সিগারেট পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
প্রবন্ধে আরও বলা হয়, ইতিমধ্যেই ই-সিগারেটের ডিভাইসগুলোতে এমডিএমবিসহ বিভিন্ন রকমের ভয়াবহ মাদক আনা হচ্ছে ও তা গ্রহণ করা হচ্ছে।
সুতরাং, এই পণ্য বৈধতা পেলে দেশে মাদকের ব্যবহারও ভয়াবহ ভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে আমরা মনে করছি। সব দিক থেকেই তরুণদের ধ্বংসের পথে নিয়ে যাওয়া হবে, ওই ধারা বাতিল করা হলে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গভীর উদ্বেগের বিষয়, এই আইনটি পাস করার ক্ষেত্রে নানা ভাবে সিগারেট কোম্পানিগুলো প্রভাব বিস্তার করেছে এবং আইনটিকে ধীরে ধীরে দুর্বল করেছে। এই আইনে চায়ের স্টলসহ পাবলিক প্লেসে সম্পূর্ণ ধুমপান নিষিদ্ধের কথা বলা ছিল, কিন্তু সংশোধনের প্রক্রিয়ায় এবং খসড়া প্রক্রিয়ায় এটি বাতিল করা হয়েছে।
পরবর্তীতে অধ্যাদেশ আকারে যখন এই আইনটি উপস্থাপন করা হয়, তখন এই আইন থেকে সিগারেট বিক্রিতে লাইসেন্সিং, ফ্লেভারযুক্ত সিগারেট নিষিদ্ধকরণ এবং খোলা সিগারেট বিক্রি বন্ধের বিষয়গুলো বাতিল করা হয়েছে।
এবং সর্বশেষ সংবিধান সংস্কার কমিটির মাধ্যমে এই আইন থেকে ই-সিগারেট নিষিদ্ধের বিধানও বাতিলের চেষ্টা করা হচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত শুধু তরুণদের ধ্বংস করবে না, দেশে জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি সৃষ্টি করবে।
সংগঠনগুলো বলছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে এই ই-সিগারেট নিষিদ্ধের বিধান বজায় রাখার জন্য কঠোর অবস্থান নেওয়া। ভারত, নেপালসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন ই-সিগারেট নিষিদ্ধ করেছে, ঠিক একই সময়ে আমরা বালাদেশে এই অপ্রচালিত পণ্যটি শুধু একটি বিদেশি কোম্পানি এবং কিছু ব্যবসায়ীর জন্য উন্মুক্ত করছি।
আজ যদি এই ই-সিগারেটের বিধান তুলে দেওয়া হয় এবং বৈধতা দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের হতে মারাত্মক নেশাদ্রব্য পৌঁছে যাবে এবং তরুণ সমাজ ধ্বংসের পথে চলে যাবে। আমরা যখন সিগারেটের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতেই হিমশিম খাচ্ছি, তখন কেন এই নতুন পণ্য ই-সিগারেট নিয়ে আসবো তা আমাদের বোধগম্য নয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিএনপি সরকার ২০০৫ সালে প্রথম একটি সমন্বিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করে, যা তখনকার সময়ে বিশ্বের একটি শক্তিশালী তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এত বছর পর কেন এই আইনকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হচ্ছে, কারা এর পেছনে রয়েছে তা সরকারের খতিয়ে দেখা দরকার। সরকার নির্বাচন ইশতেহারে যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হলে ই-সিগারেট নিষিদ্ধের বিধানে অটল থাকাই যুক্তিযুক্ত।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ড. গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক। এতে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির টোব্যাকো কন্ট্রোল এন্ড রির্চাচ (টিসিআরসি) সহযোগী অধ্যাপক মো. বজলুর রহমান, মানসের অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী, বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়ক হেলাল আহমেদ প্রমুখ।
সংবাদ সম্মেলনটি আয়োজন করে বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট (বাটা), বালাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল এডভোকেটস (বিটিসিএ), বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি), বাংলাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল রিসর্ট নেটওয়ার্ক (বিটিসিআরএন), বাংলাদেশ সেন্টার ফর গভর্নেন্স এন্ড ডেভেলপমেন্ট (বিসিজিডি), বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি, আর্থ ফাউন্ডেশন, সেতু, লিয়ার্স ইন টোব্যাকো কন্ট্রোল এলামনাই এসোসিয়েশন, লেটথ ওয়ার্ক, প্রত্যাশা মাদক বিরোধী সংগঠন, পাবলিক হেলথ ল' ইয়ার্স নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্য অন্দোলন, তামাক বিরোধী নারী জোট (তাবিনাজ), ইউনাইটেড ফোরাম এগেইনস্ট টোব্যাকো, স্কুল অব লাইফ, ইয়ুথ ফর টোব্যাকো ফ্রি বাংলাদেশ।
এএম/এআরএম

