চলতি বছরের মার্চ মাসে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ৪৭২টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে বাংলাদেশের ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার। এ সময় বিএনপি সরকারকে জড়িয়ে ৬৭টি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। যার প্রায় ৭৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই সরকারকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
রিউমর স্ক্যানারের ওয়েবসাইটে ৪৪৯টি প্রতিবেদনের মাধ্যমে এসব ভুল তথ্যের ফ্যাক্টচেক প্রকাশ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষণ বলছে, মার্চে রাজনৈতিক বিষয়ে সবচেয়ে বেশি (২৫০) ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ মিলেছে, যা মোট ভুল তথ্যের প্রায় ৫৩ শতাংশ। এছাড়া জাতীয় বিষয়ে ৪৬টি, আন্তর্জাতিক বিষয়ে ১৪৫টি, খেলাধুলা বিষয়ে ৫টি, ধর্মীয় বিষয়ে ৬টি, বিনোদন বিষয়ে ৬টি এবং শিক্ষা বিষয়ে ২টি ও প্রতারণা বিষয়ে ৮টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে গত মাসে।
এসব ঘটনায় তথ্য কেন্দ্রিক ভুলই ছিল সবচেয়ে বেশি, ২২৯টি। এছাড়া ভিডিও কেন্দ্রিক ভুল ছিল ১৮১টি এবং ছবি কেন্দ্রিক ভুল ছিল ৬২টি। শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলোর মধ্যে মিথ্যা হিসেবে ৩৮৫টি, বিকৃত ৫১টি, বিভ্রান্তিকর হিসেবে ৩৬টি ঘটনাকে সাব্যস্ত করা হয়েছে।
শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, এই সময়ে পুরুষদের জড়িয়ে ভুল তথ্য প্রচার হয়েছে ২৪৭টি এবং নারীদের জড়িয়ে ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে ৯৭টি।
একই সময়ে বয়সের ধরন অনুযায়ী পুরুষ ও নারীদের চারটি করে ভাগে ভাগ করা হয়েছে ভুল তথ্যগুলোকে।
বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুরুষদের মধ্যে যুবদের নিয়ে ৭৭টি, মধ্যবয়সীদের নিয়ে ৭১টি এবং প্রবীণদের নিয়ে ৯৯টি ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। এছাড়া, নারীদের মধ্যে যুবদের নিয়ে ৩২টি, মধ্যবয়সীদের নিয়ে ৪৫টি এবং প্রবীণদের নিয়ে ২০টি ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে।
প্লাটফর্ম হিসেবে গত মাসে ফেসবু্কে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে, সংখ্যার হিসেবে যা ৩৮৩টি। এছাড়া ইনস্টাগ্রামে ৮৬টি, ইউটিউবে ৪১টি, এক্সে ১২টি, টিকটকে ১৪৪টি ও থ্রেডসে অন্তত ২২টি ভুল তথ্য প্রচারের প্রমাণ মিলেছে। ভুল তথ্য প্রচারের তালিকা থেকে বাদ যায়নি দেশের গণমাধ্যমও। ৩৪টি ঘটনায় দেশের একাধিক গণমাধ্যমে ভুল তথ্য প্রচার হতে দেখেছে রিউমর স্ক্যানার।
বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য প্রচারের বিষয়টি গেল বেশ কয়েক মাস ধরে আলোচনায়। মার্চে দুইটি সাম্প্রদায়িক অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। অপতথ্যগুলো ভারতীয় পরিচয়ধারী অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বিএনপি সরকারকে জড়িয়ে গত মাসে ৬৭টি অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার, যার প্রায় ৭৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই সরকারকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই সময়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে জড়িয়ে ৩৭টি অপতথ্যের প্রচার দেখেছে রিউমর স্ক্যানার, যার প্রায় ৬৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই তাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। মার্চে বিএনপি সরকারের মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ে ২৪টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি (৪টি করে, সবগুলোতেই নেতিবাচক উপস্থাপন) শিকার হয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ৷
রিউমর স্ক্যানার মার্চ মাসের ফ্যাক্টচেকগুলো বিশ্লেষণে দেখেছে, এই সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), তার অঙ্গসংগঠন এবং নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ৭১টি অপতথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে বিএনপিকে জড়িয়ে ১৪টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে, যার প্রায় ৭৮ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটিকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। এছাড়া, দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে জড়িয়ে এই সময়ে ৫টি অপতথ্য (প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই নেতিবাচক উপস্থাপন) প্রচার করা হয়েছে। এছাড়া, ছাত্রদলকে জড়িয়ে এই সময়ে ৬টি ও যুবদলকে জড়িয়ে ২টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, তার অঙ্গসংগঠন এবং নেতাকর্মীদের জড়িয়ে মার্চে ৪৯টি অপতথ্যের প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে জামায়াতকে জড়িয়ে ২৭টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। এসবের প্রায় ৭৪ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটিকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। একই সময়ে দলটির আমীর ডা. শফিকুর রহমানকে জড়িয়ে ৪টি অপতথ্য (প্রায় ৫০ শতাংশই নেতিবাচক) শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া, ছাত্রশিবিরকে জড়িয়ে এই সময়ে ৭টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে।
এছাড়া, মার্চ মাসে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও দলটির নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ৪০টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে দল হিসেবে এনসিপিকে জড়িয়ে কোনো অপতথ্য প্রচার হতে দেখা যায়নি। তবে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে জড়িয়ে ৫টি অপতথ্য (সবগুলোই নেতিবাচক) শনাক্ত হয়েছে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, তার অঙ্গ-ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন এবং নেতাকর্মীদের নিয়ে মার্চে ৯৬টি অপতথ্যের প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে জড়িয়ে ৩৩টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে যার প্রায় ৯৭ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটির পক্ষে ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। দলটির সভাপতি শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে এই সময়ে, ১৮টি অপতথ্য (প্রায় ৮৯ শতাংশই ইতিবাচক) প্রচারের প্রমাণ মিলেছে।
ভুল তথ্যের রোষানল থেকে রক্ষা পাচ্ছে না রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোও। মার্চে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে জড়িয়ে ২টিসহ এই বাহিনীকে নিয়ে ৯টি ভুল তথ্যের প্রচার দেখেছে রিউমর স্ক্যানার। এছাড়া বাংলাদেশ পুলিশকে জড়িয়ে ১৬টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।
মার্চে শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, এই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত হয়েছে ৯৩টি। এর মধ্যে ডিপফেক কনটেন্ট শনাক্ত করা হয়েছে ৬টি।
মার্চ মাসে দেশে ৭টি ঘটনা বা ইস্যুতে ভুল তথ্যের প্রচার ছিল। এর মধ্যে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত ইস্যুতে ১৪৫টি, জ্বালানী সংকট ইস্যুতে ১৪টি, ঈদ ইস্যুতে ১১টি, ফয়সাল করিম মাসুদ গ্রেফতার ইস্যুতে ৭টি, স্বাধীনতা দিবস ঘিরে ৫টি ভুল তথ্যের প্রচার ছিল।
গণমাধ্যমের নাম, লোগো, শিরোনাম এবং নকল ও ভুয়া ফটোকার্ড ব্যবহার করে ভুল তথ্য প্রচারের পরিমাণ আবার বৃদ্ধি পেতে দেখা যাচ্ছে৷ মার্চ মাসে এই পদ্ধতির ব্যবহার করে ৮০টি ঘটনায় দেশ-বিদেশি ২১টি সংবাদমাধ্যমকে জড়িয়ে ৮১টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে।
বিসিবি ও খেলোয়াড়দের নিয়ে ছড়াল বিভ্রান্তি
এপ্রিল ফুল অর্থাৎ বোকা বানানোর দিন। ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘অল ফুলস ডে’। প্রতি বছরের পয়লা এপ্রিল দিনটি পালন করা হয়। এ দিবসকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এবং বাংলাদেশ ক্রিকেটের জাতীয় দলের একাধিক খেলোয়াড়কে নিয়ে প্রচারিত ভুল তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার হতে দেখেছে রিউমর স্ক্যানার।
এরমধ্যে, “CricVerse”, “খেলার পাতা” এবং “Blitz Vision” নামক তিনটি ক্রিড়াবিষয়ক খবরের ফেসবুক পেজ থেকে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন দাবিতে তিনটি পোস্ট করা হয়।
তামিম ইকবাল বিসিবির সভাপতি হলে গণমাধ্যমে ফলাও করে সংবাদ প্রকাশ হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু, প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করে আলোচিত দাবির সপক্ষে কোনো তথ্য গণমাধ্যম কিংবা বিশ্বস্ত সূত্রে পাওয়া যায়নি। এমনকি তামিম ইকবালের ফেসবুক পেজেও এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে আলোচিত তিনটি পোস্টের মন্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পোস্টদাতা তিনটি পেজের মন্তব্যঘরেই এটিকে এপ্রিল ফুলকে কেন্দ্র করে করা পোস্ট বলে সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে। আর বাকি একটিতে, একজন ব্যবহারকারীর মন্তব্যের জবাবে এমন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশের যুদ্ধবিমান কেনা নিয়েও ছড়ানো হয় অপতথ্য
গত ১৮ মার্চ ফেসবুকে একটি ফটোকার্ড পোস্ট নজরে আসে রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের। ফটোকার্ডের শিরোনামে বলা হচ্ছে, ভারতের সম্মতি ছাড়া বাংলাদেশের ডিফেন্সের জন্য কোনো যুদ্ধ বিমান আধুনিক অন্ত্র বা সরঞ্জাম ক্রয় করতে পারবে না, বললেন আসাম মুখ্যমন্ত্রী!
মজার ব্যাপার হচ্ছে, আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার ছবি ব্যবহার না করে ফটোকার্ডে ব্যবহার হচ্ছে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ছবি!
এই পোস্টে পাঁচ দিনের ব্যবধানে ১৮ হাজার রিয়েকশন এসেছে এবং আড়াই হাজারেরও বেশি শেয়ার হয়েছে। শুধু ফেসবুকেই নয়, সমজাতীয় প্রায় সব প্ল্যাটফর্মেই (ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, থ্রেডস) কিওয়ার্ড সার্চ করে মিলেছে একই দাবির পোস্ট।
নানা উপায়ে অনুসন্ধান চালিয়ে তাদের এমন কোনো মন্তব্য করার প্রমাণ মেলেনি। আরো নিশ্চিত হতে ভারতীয় ফ্যাক্টচেকারদেরও শরণাপন্ন হয়েছে রিউমর স্ক্যানার। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আজতক বাংলা’র ফ্যাক্টচেক বিভাগের সদস্য ঋদ্ধীশ দত্ত বলছেন, দাবিটি তারাও দেখেছেন। তার প্রেক্ষিতে তারাও অনুসন্ধান করে দেখেছেন যে তাদের কেউ এমন কিছু বলেনি কোথাও।
এআরএম

