মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস, বীরদের পরিচয় এবং তাদের বীরত্বগাথা—সবকিছুর এক অনন্য সমাহার রাজধানীর শেরেবাংলানগরে অবস্থিত সামরিক জাদুঘর। এখানে এলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে যুদ্ধক্ষেত্রের নানা দৃশ্য, আর কাছ থেকে দেখা যায় সেইসব অস্ত্র ও সরঞ্জাম, যা এতদিন কেবল সিনেমা বা বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল।
যারা এখনো এই জাদুঘরে ঘুরতে যাননি, তারা মূলত যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতার একটি বড় অংশ থেকেই বঞ্চিত—এমনটাই মনে করছেন দর্শনার্থীরা। অস্ত্র, গোলাবারুদ, যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে নৌযানের নানা প্রদর্শনী এখানে দর্শকদের সামনে উন্মুক্ত।
বিজ্ঞাপন
সোমবার বিকেলে ঈদুল ফিতরের ছুটিকে ঘিরে জাদুঘরে নেমেছিল দর্শনার্থীদের ঢল। প্রতিটি ফ্লোরেই ছিল উপচে পড়া ভিড়, যেখানে নানা বয়সী মানুষ আগ্রহ নিয়ে ঘুরে দেখছিলেন প্রদর্শনীগুলো।
মিরপুর থেকে আসা কলেজ শিক্ষার্থী মোস্তাক বলেন, “টিকিট কাটার সময় ভাবছিলাম, ভেতরে নতুন কী-ই বা দেখব! কিন্তু ঢোকার পর তো চোখ ছানাবড়া—এত বিমান, এত অস্ত্র! সত্যিই প্রবেশ ফি উসুল হয়ে গেছে।”
তার সঙ্গে আসা মা রুবিনা আক্তার জানান, “আমাদের সময়ে বইয়ে যেসব অস্ত্রের কথা পড়েছি, আজ সেগুলো চোখের সামনে দেখছি। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানীর ব্যবহৃত জিপ গাড়িটিও এখানে প্রদর্শিত হয়েছে—এটা সত্যিই ভিন্নরকম অভিজ্ঞতা।”
তিন তলা বিশিষ্ট এই জাদুঘরের প্রতিটি তলায় রয়েছে আলাদা আলাদা প্রদর্শনী। নিচতলায় নৌবাহিনী, দ্বিতীয় তলায় সেনাবাহিনী এবং তৃতীয় তলায় বিমানবাহিনীর বিভিন্ন অস্ত্র ও সরঞ্জাম প্রদর্শন করা হয়েছে। এক তলা থেকে অন্য তলায় যেতে রয়েছে চলন্ত সিঁড়ির ব্যবস্থা। পাশাপাশি শিশুদের জন্য রয়েছে বিশেষ কর্নার ও ‘কিডস রেঞ্জার এরিনা’, যেখানে অতিরিক্ত ফি দিয়ে প্রবেশ করা যায়।
বিজ্ঞাপন
একটি টিকিটেই প্রায় পুরো জাদুঘর ঘুরে দেখা সম্ভব হলেও কিছু নির্দিষ্ট কর্নারে বাড়তি ফি রাখা হয়েছে, যেখানে দর্শকদের জন্য রয়েছে বিশেষ আকর্ষণ।
দর্শনার্থীদের মতে, জাদুঘরটি এত বড় যে পুরোটা ঘুরে দেখতে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা সময় লেগে যেতে পারে। বসিলা থেকে আসা আসিফ রহমান বলেন, “এক-দুই ঘণ্টায় পুরো জাদুঘর দেখা সম্ভব নয়। সময় নিয়ে আসা উচিত।”
তার স্ত্রী সুমাইয়া বলেন, “ঢাকায় পড়াশোনা করেছি, কিন্তু কখনো এখানে আসা হয়নি। আজ এসে বুঝলাম, কত বড় একটি জায়গা মিস করেছি। এখানে স্বাধীনতার ইতিহাস, বীরদের গল্প এবং তিন বাহিনীর নানা সরঞ্জাম একসঙ্গে দেখা যায়।”
জাদুঘরে প্রবেশের পরই দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটি কাঠের নৌকার প্রদর্শনী, যার সামনে ছবি তোলার হিড়িক পড়ে যায়। কেউ কেউ এটিকে মজা করে ‘সিন্দাবাদের নৌকা’ বলেও আখ্যা দিচ্ছেন।
এছাড়া এখানে রয়েছে ফাইটার বিমানের মডেল, রকেট লঞ্চার, বিভিন্ন বাহিনীর র্যাংক ব্যাজ, সেনা-নৌ-বিমান বাহিনীর প্রধানদের ছবি, সাত বীরশ্রেষ্ঠের তথ্যসহ নানা ঐতিহাসিক উপকরণ। বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের ছবিও প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে।
দ্বিতীয় তলায় প্রবেশ করলে মনে হবে যেন যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছেন দর্শনার্থীরা। বিভিন্ন ভঙ্গিতে অবস্থানরত সেনাসদস্যদের মডেল, ঘোড়াসহ যুদ্ধের দৃশ্য এবং মাথার ওপরে উড়ন্ত বিমানের প্রতিরূপ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে বাস্তবসম্মত পরিবেশ। তৃতীয় তলায় গিয়ে দেখা যায় বিমান পরিচালনার নানা দিক।
জাদুঘরের বিভিন্ন স্থানে বড় স্ক্রিনে ভিডিও প্রদর্শনের মাধ্যমে তিন বাহিনীর কার্যক্রম তুলে ধরা হয়, যা দর্শনার্থীদের বাস্তবধর্মী ধারণা দেয়।
বিশেষভাবে দৃষ্টি কাড়ে দ্বিতীয় তলার ‘পিলখানা হত্যাকাণ্ডের শহীদগণ’ কর্নার। সেখানে শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের ছবি, পরিচয় এবং ব্যবহৃত সামগ্রী সংরক্ষিত রয়েছে। অনেক দর্শনার্থীই এই অংশে এসে কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন, শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন তাদের।
সব মিলিয়ে সামরিক জাদুঘর কেবল বিনোদনের জায়গা নয়, বরং এটি ইতিহাস জানার, দেশপ্রেম জাগ্রত করার এবং নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ ও সামরিক ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
এমআইকে/এএস

