- ১২১টি কাতারে নামাজ পড়তে পারবেন ৩৫ হাজার মুসল্লি
- ৪৩ হাজার বাঁশ, ১৫ টন রশি, ১৯০০ ত্রিপলে বিশাল প্যান্ডেল
- গরমের জন্যে ১১০০টি ফ্যান, আলোকসজ্জায় ৯০০ লাইট
- পুরো ঈদগাহ এলাকা সিসিটিভির আওতায় আনা হয়েছে
- ৩৫০০ নারী মুসল্লির জন্য সংরক্ষিত নামাজের স্থান
ঈদ মানেই আনন্দ, মিলন আর ধর্মীয় আবেগের এক অনন্য সমাবেশ। আর সেই আবেগের সবচেয়ে বড় প্রতিফলন ঘটে রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদুল ফিতরের প্রধান জামাতকে ঘিরে এখানে গড়ে উঠেছে এক বিশাল আয়োজন—যেখানে ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে মিশেছে পরিকল্পনা, পরিশ্রম আর প্রযুক্তির ছোঁয়া।
বিজ্ঞাপন
রমজানের শেষ প্রহর পেরিয়ে ঈদের দিনকে ঘিরে যখন রাজধানী ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে আসে, ঠিক তখনই জাতীয় ঈদগাহ হয়ে ওঠে হাজারো মানুষের মিলনস্থল। আগামীকাল সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া প্রধান জামাতকে সামনে রেখে এখানে টানা ২৮ দিনের প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে।
বাঁশ, রশি আর ত্রিপলের নিচে এক বিশাল আয়োজন
এই বিশাল মাঠটিকে নামাজের উপযোগী করে তুলতে যে শ্রম আর পরিকল্পনা লেগেছে, তা যেন এক অদৃশ্য কারিগরি শিল্প। প্রায় ৪৩ হাজার বাঁশ, ১৫ টনের বেশি রশি এবং ১৯০০ উন্নতমানের ত্রিপল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে সুবিশাল প্যান্ডেল।
দিন-রাত পরিশ্রম করে শতাধিক কর্মী এই মাঠটিকে পরিণত করেছেন একটি সুশৃঙ্খল নামাজের স্থানে। উপরে টানানো ত্রিপল শুধু ছায়াই দেবে না, বরং আকস্মিক বৃষ্টি থেকেও রক্ষা করবে মুসল্লিদের।
বিজ্ঞাপন
প্যান্ডেলের ভেতরে সারি সারি কাতার—মোট ১২১টি—যেখানে প্রতিটি লাইনে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে নামাজ আদায় করবেন হাজারো মানুষ। বড় ও ছোট কাতারের সমন্বয়ে তৈরি এই বিন্যাস পুরো আয়োজনকে দিয়েছে এক ধরনের শৃঙ্খল সৌন্দর্য।
মানুষের স্বস্তিই মূল লক্ষ্য
এবারের আয়োজনের বড় বৈশিষ্ট্য হলো মুসল্লিদের স্বস্তি নিশ্চিত করার চেষ্টা। গরমের কথা মাথায় রেখে বসানো হয়েছে ১১০০টি ফ্যান—৯০০টি সিলিং ও ২০০টি স্ট্যান্ড ফ্যান। আলোর জন্য লাগানো হয়েছে প্রায় ৯০০টি টিউবলাইট।

পানি ও ওজুর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে। প্যান্ডেলের ভেতরেই আলাদা স্থানে নারী-পুরুষের জন্য ওজুর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পুরো এলাকায় সুপেয় পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।
নারী মুসল্লিদের জন্য রাখা হয়েছে আলাদা প্রবেশপথ, নির্দিষ্ট নামাজের স্থান এবং পর্দার ব্যবস্থা—যা অনেকের জন্য স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলায় কড়াকড়ি
এত বড় জমায়েতকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে কঠোর। পুরো ঈদগাহ এলাকা সিসিটিভির আওতায় আনা হয়েছে। প্রবেশের জন্য রাখা হয়েছে চারটি নির্ধারিত ফটক, আর নামাজ শেষে দ্রুত বের হওয়ার জন্য সাতটি প্রস্থানপথ।
বিশেষ করে ভিআইপি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আলাদা জোন তৈরি করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দীর্ঘ ৩৬ বছর পর একসঙ্গে এই ঈদগাহে নামাজ আদায় করবেন—যা এবারের আয়োজনকে দিয়েছে বিশেষ মাত্রা।
তাদের সঙ্গে থাকবেন বিচারপতি, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, কূটনীতিকসহ প্রায় ৩৩০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি। তাদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ সুবিধা এবং নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে।
ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মেলবন্ধন
১৯৮৭-৮৮ সালে জাতীয় ঈদগাহ হিসেবে ঘোষণার পর থেকে এই মাঠ শুধু একটি নামাজের স্থান নয়—বরং রাজধানীর ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ২০০০ সাল থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা করে আসছে।

এবার প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে মাঠ প্রস্তুত করা হয়েছে। আধুনিক আলোকসজ্জা, সুশৃঙ্খল কাতার বিন্যাস এবং প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে এটি এখন এক আধুনিক ধর্মীয় আয়োজনের উদাহরণ।
বিকল্প পরিকল্পনাও প্রস্তুত
প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা মাথায় রেখে রাখা হয়েছে বিকল্প ব্যবস্থাও। আবহাওয়া প্রতিকূল হলে প্রধান জামাত সরিয়ে নেওয়া হবে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে, যেখানে সকাল ৯টায় নামাজ অনুষ্ঠিত হবে।
আরও পড়ুন
বিএনপির শীর্ষ নেতারা ঈদ করবেন যেখানে
আয়োজকরা জানিয়েছেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে জাতীয় ঈদগাহে প্রায় ৩৫ হাজার মুসল্লির নামাজের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ নারী মুসল্লির জন্য রাখা হয়েছে পৃথক ও সংরক্ষিত নামাজের স্থান। নারীদের জন্য আলাদা প্রবেশপথ, ওজু এবং নামাজ আদায়ের সুবিধাও নিশ্চিত করা হয়েছে।

মুসল্লিদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখতে প্রবেশের সময় নির্দিষ্টসংখ্যক গেট ব্যবহার করা হলেও নামাজ শেষে দ্রুত ও স্বাচ্ছন্দ্যে বের হওয়ার জন্য সবগুলো গেট খুলে দেওয়া হবে বলে জানান তারা।
ঈদের সকাল: এক অন্যরকম দৃশ্যপট
ঈদের দিন ভোর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসবেন এই ঈদগাহে। সাদা পাঞ্জাবি, নতুন পোশাক আর মুখে হাসি—সব মিলিয়ে তৈরি হবে এক অপূর্ব দৃশ্য।
নামাজ শেষে কোলাকুলি, শুভেচ্ছা বিনিময়—এই মাঠ তখন হয়ে উঠবে আনন্দ আর ভ্রাতৃত্বের প্রতীক।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় ঈদগাহের এবারের আয়োজন শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি এক বিশাল মানবসমাবেশকে ঘিরে সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার এক জীবন্ত উদাহরণ। যেখানে ঈদের আনন্দের পাশাপাশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা আর সম্মিলিত প্রচেষ্টার শক্তি।
এমআর/জেবি

