পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপনে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছেন রাজধানী ঢাকার কর্মজীবী মানুষ। বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা ছেড়েছেন কয়েকদিন আগেই। আজ (মঙ্গলবার) থেকে ঈদের ছুটি শুরু হওয়ায় পেশাজীবীদের যাত্রা শুরু হয়েছে পুরোদমে।
মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) ভোর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন বাস টার্মিনাল, কমলাপুর রেলস্টেশন এবং সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ঘুরমুখো যাত্রীদের বাড়তি চাপ লক্ষ্য করা গেছে।
বিজ্ঞাপন
তবে যাত্রীর চাপ বাড়লেও সড়কে নেই যানজটের ভোগান্তি। ব্যক্তিগত গাড়ি কমে যাওয়ায় ঢাকার রাস্তা অনেকটাই ফাঁকা। ফলে বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন এবং লঞ্চ টার্মিনাল পর্যন্ত যানজটের কোনো প্রকার ভোগান্তি ছাড়াই অপেক্ষাকৃত দ্রুত সময়ের মধ্যে যেতে পারছে মানুষ। এছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সড়কগুলোও যানজটমুক্ত।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানী থেকে নির্ধারিত যানবাহনে চড়ার পর দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ, পদ্মা সেতু হয়ে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক দিয়ে, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে এমনকি দৌলতদিয়া-পাটুলিয়া দিয়েও মানুষ নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরতে পারছেন।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ১৪০ কিলোমিটারে সেই যানজট নেই
বিজ্ঞাপন
এবারের ঈদ যাত্রায় দেশের ‘লাইফলেন’ খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার ১৪০ কিলোমিটার অংশে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। সড়কে যানজট না থাকলেও পরিবহনের চাপ বেড়েছে। এই রুটের যানজট মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে হাইওয়ে পুলিশ এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগ।
কুমিল্লার দাউদকান্দি হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল বাহার মজুমদার বলেন, ‘এবারের ঈদযাত্রা হাইওয়ে পুলিশ চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা আনন্দদায়ক করতে আমরা দিনরাত মহাসড়কে অবস্থান করছি।’
তিনি আরও জানান, মঙ্গলবার থেকে ঈদের ছুটি শুরু হলেও এখনো পর্যন্ত যানচলাচল স্বাভাবিক। তবে মহাসড়কে পরিবহনের চাপ বেড়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা থেকে চট্টগ্রামমুখী লেনে গাড়ির চাপ বেশি।

উত্তরাঞ্চলের মহাসড়কে চাপ বাড়লেও নেই যানজট
পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে নাড়ির টানে ফিরছে উত্তরাঞ্চলের মানুষও। ফলে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার যমুনা সেতু পশ্চিমপাড় সিরাজগঞ্জের মহাসড়কে বাড়ছে যানবাহনের চাপ। তবে এ মহাসড়কেও নেই যানজট বা যানবাহনের ধীরগতি। এতে ভোগান্তি ছাড়াই ঘরে ফিরছে মানুষ।
মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) বিকেল পর্যন্ত কড্ডার মোড়, নলকা, হাটিকুমরুল গোল-চত্বরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার যমুনা সেতুর পশ্চিমপাড় সিরাজগঞ্জের মহাসড়কে অন্যান্য দিনের তুলনায় বেড়েছে যানবাহনের চাপ। তবে কোথাও যানজটের ভোগান্তি নেই।
ঢাকা থেকে উত্তরাঞ্চলগামী এসআই এন্টারপ্রাইজের বাসচালক আজাদ রহমান বলেন, ‘ঈদ এলেই যানজটের কারণে আমরা সবাই এই মহাসড়ক নিয়ে একটা আতঙ্কের মধ্যে থাকি। কিন্তু এবার কোনো যানজট বা ধীরগতি না থাকায় খুব স্বাভাবিকভাবেই চলাচল করতে পারছি।’
পদ্মা সেতু দিয়ে স্বস্তিতে ফিরছেন দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীরা
ঈদ উপলক্ষে দক্ষিণাঞ্চলের ২৯ জেলার যাত্রীরা ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে পদ্মা সেতু দিয়ে যানজটমুক্ত পরিবেশে বাড়ি ফিরছেন। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) সকাল থেকেই এই রুটে যানবাহনের অতিরিক্ত কোনো চাপ নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে টোল প্লাজায় দ্রুত টোল পরিশোধ করে মোটরসাইকেল, যাত্রীবাহী বাস পদ্মা সেতু পাড়ি দিচ্ছে।
পদ্মা সেতু সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়াদ জানান, ঈদের ছুটির প্রথম দিন হওয়ায় সকালে কিছুটা চাপ থাকলেও পরে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়ে যায়। গাড়ির চাপ বেশি হলে তা সামাল দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে।
ভিড় বেড়েছে সদরঘাটে, ভাড়া নিয়ে সন্তুষ্ট যাত্রীরা
ঈদযাত্রায় রাজধানীর প্রধান নদীবন্দর সদরঘাটে বেড়েছে লঞ্চশ্রমিক ও কুলি-মজুরদের ব্যস্ততা। পুরনো রূপে ফিরতে শুরু করেছে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল। পদ্মা সেতু হওয়ার পর থেকে ঈদ ছাড়া যেন প্রাণহীন থাকে সদরঘাট। ঈদ উপলক্ষে আগের সেই প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে।
মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই ঘরমুখো মানুষের ভিড়ে সরগরম পুরো সদরঘাট। কেউ কাঁধে ব্যাগ, কেউ পরিবারের হাত ধরে ছুটছেন লঞ্চের দিকে। দীর্ঘদিনের নিস্তব্ধতা ভেঙে যেন আবার চেনা ছন্দে ফিরেছে বৃহৎ এই লঞ্চ টার্মিনাল।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রায় ৪০টি লঞ্চ ছেড়ে গেছে। দিনশেষে এ সংখ্যা ৭০ থেকে ৭৫ ছাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে ভাড়া নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা।
লঞ্চ শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা-বরিশাল রুটে ডেক ভাড়া ৩০০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন ১ হাজার ২০০ টাকা এবং ডাবল কেবিন ২ হাজার ৪০০ টাকা। ভিআইপি কেবিনের ভাড়া ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া ঢাকা-মুলাদি ও ভাসানচর রুটে ডেক ভাড়া ৪০০ টাকা এবং কেবিন ভাড়া ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা। চাঁদপুর রুটে ডেক ভাড়া ২০০ টাকা এবং কেবিন ভাড়া ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকার মধ্যে রয়েছে।
ভোগান্তি নেই পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথেও
ঈদযাত্রায় পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ও আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে যাত্রী ও যানবাহনের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের ভোগান্তির খবর পাওয়া যায়নি।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই দুই নৌরুটে যাত্রী পারাপার স্বাভাবিক রাখতে সমন্বিতভাবে কাজ করছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি), জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বিআইডব্লিউটিসি ডিজিএম আব্দুস সালাম জানান, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে বর্তমানে ১৭টি ফেরি চলাচল করছে। অন্যদিকে আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে রয়েছে পাঁচটি ফেরি। এছাড়া যাত্রী পারাপার নির্বিঘ্ন রাখতে ৩৫টি লঞ্চও চালু রাখা হয়েছে।
ঘাট এলাকায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি যানজট এড়াতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকার কারণে এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনার কারণে এবারের ঈদযাত্রা এখন পর্যন্ত স্বস্তিদায়ক। তবে যাত্রীর চাপ আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ধীরগতি থাকলেও নেই যানজট
এই রুটে ঈদযাত্রায় কয়েকদিন আগে ভোগান্তির আশঙ্কা করা হলেও চিত্র ভিন্ন। যানবাহনের চাপের কারণে মহাসড়কে ধীরগতি থাকলেও নেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে দাঁড়িয়ে থাকার ভোগান্তি। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার অনেকটা স্বস্তিতেই বাড়ি ফিরতে পারছেন এই রুটের যাত্রীরা।
ঢাকা থেকে সিলেট রুটের যাত্রী প্রথম পছন্দ ট্রেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে সময় মেনেই এ রুটে ট্রেন ছেড়ে গেছে। ভিড় আগের দিনগুলোর চেয়ে কম। ফলে খুব একটা ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি ঘরমুখো যাত্রীদের।
সরেজমিনে দেখা যায়, মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) সকাল ১০টা থেকে বিকেল পর্যন্ত বেশির ভাগ ট্রেনই যথাসময়ে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে গেছে। যাত্রীর বাড়তি চাপ সামলানোর জন্য বেশির ভাগ ট্রেনে অতিরিক্ত কোচ যুক্ত করা হয়েছে।

বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রী মারুফা বিনতে শাহবাজ। বাড়ি রাজশাহীর সাগরপাড়ায়। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর ট্রেনে করে বাড়িতে ফিরি। অন্যবার যেমন ভিড় দেখি, আজ সে রকম কিছুই দেখিনি। স্বস্তিতে বাড়ি ফিরছি বলা যায়।’
তবে পথের ভোগান্তি না পোহাতে হলেও বিভিন্ন টার্মিনালে কিছু বাস কোম্পানি ঈদ উপলক্ষে দ্বিগুণ বা তারও বেশি ভাড়া আদায় করছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের।
যদিও সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে, বাড়তি ভাড়া নিলে সংশ্লিষ্ট বাস কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোথাও কোথাও বাড়তি ভাড়া নেওয়ায় বিভিন্ন পরিবহনকে জরিমানা করা হয়েছে। সবমিলিয়ে এবারের ঈদযাত্রাকে স্বস্তিদায়কই বলছেন ঘুরমুখো মানুষেরা।
এএইচ

