সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

শহীদ মিনারে রাকিব হত্যার নেপথ্যে যে কারণ জানা যাচ্ছে

আব্দুল কাইয়ুম
প্রকাশিত: ১৬ মার্চ ২০২৬, ০৪:৪১ পিএম

শেয়ার করুন:

R
মূল ছবিতে গুলি এবং ছুরিকাঘাতে ক্ষতবিক্ষত রাকিবুল ইসলাম। ইনসেটে তার বাইকে বসে তোলা একটি ছবি

রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কয়েক রাউন্ড গুলি করে এবং কুপিয়ে হত্যা করা হয় রাকিবুল ইসলাম নামে এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে। রোববার (১৫ মার্চ) রাতের ওই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ সম্পর্কে উঠে এসেছে মাদকের যোগ। 

নিহতের পরিবারের দাবি, আরেক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের মাদক ব্যবসার কথা জেনে যাওয়ায় জীবন দিতে হয়েছে রাকিবকে। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে দুজনকে আটক করেছে পুলিশ।

পরিবার সূত্র জানায়, নিহত রাকিব ‘শেখ বোরহানুদ্দিন পোস্ট গ্রেজুয়েট কলেজে’র ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে রাজধানীর বংশালের নাজিমুদ্দিন রোডে ভাড়া বাসায় থাকতেন। তার গ্রামের বাড়ি ভোলা সদর থানার পৌর বাত্তা ১নং ওয়ার্ডে। রাকিবের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কুয়েত মৈত্রী হলের অফিস সহায়ক হিসেবে কর্মরত। তার মা শেখ বোরহানুদ্দিন কলেজের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শাখায় অফিস সহায়ক হিসেবে কর্মরত।


বিজ্ঞাপন


‎হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, রোববার (১৫ মার্চ) রাত সাড়ে ৯টায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রাকিবকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাকে হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ইমারজেন্সি সেন্টারে নিয়ে গেলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সাড়ে ১০টায় তার মৃত্যু হয়।

সুরতহাল প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাকিবের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় মোট ১০টি কোপের চিহ্ন রয়েছে। এ ছাড়া দুটি গুলির চিহ্নও রয়েছে। যার মধ্যে একটি গুলি মাথার ডান পাশে কানের উপর দিয়ে ঢুকে মাথার বাম পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। আরেকটি পিঠের ডানপাশ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে।

মর্গের সামনে মা ও স্ত্রীর বুকফাঁটা আর্তনাদ


বিজ্ঞাপন


‎নিহত রাকিবুল ইসলামের মা রাজিয়া বেগম হাসপাতালের মর্গের সামনে সন্তানকে হারিয়ে আহাজারি করছিলেন। 

তিনি বলেন, পরশুদিন ভোরে আমার ছেলে সাহরি খেতে পারে নাই, রোজাও রাখতে পারে নাই। দুপুর সাড়ে ১২টায় আমার কাছে এসে বলে, মা ভাত দাও। আমি তখন আমার ছেলেকে বড় মাছ দিয়ে ভাত খেতে দিয়েছিলাম। এরপর বিকেল সাড়ে পাঁচটায় এসে আবার ভাত চায়। আমি বললাম, একটু বসো রান্না করে দিচ্ছি। তখন আমার ছেলে রাগ করে না খেয়ে চলে গেছে। আমি তার স্ত্রীকে ফোন দিয়ে বলি, মা রাকিব আমার সঙ্গে রাগ করে বাসা থেকে না খেয়ে চলে গেছে। তুই একটু ভাত দিস ওরে। তখন আমার ছেলের বউ বলে, মা সে আমাদের বাসায় এসে না খেয়ে বের হয়ে গেছে।’ 

রাকিবের মা বলেন, ‘আমার ছেলেটা অনাহারে আমার কাছ থেকে চলেই গেল। আমার বুকের ধনটা সন্ত্রাসীরা কেঁড়ে নিল। তার সঙ্গে কারও কোনো শত্রুতা ছিল না। কোনো ঝগড়া-বিবাদ ছিল না। কেন আমার ছেলেকে কেঁড়ে নিল। আমি সরকারের কাছে আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।’

22
ছেলে হারিয়ে ঢাকা মেডিকেলের সামনে আর্তনাদ করছেন নিহত রাকিবুল ইসলামের মা। ছবি- ঢাকা মেইল

‎তিনি আরও বলেন, ‘আমার এক ছেলে এক মেয়ে। আমি শেখ বোরহানুদ্দিন পোস্ট গ্রেজুয়েট কলেজের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শাখায় চাকরি করি। সেখানেই ছেলেকে ভর্তি করিয়েছি। সে সেখানে ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছিল। ২০২১ সালে আমার ছেলে বিয়ে করেছে। সে তার স্ত্রীর সঙ্গে থাকে। আমার ছেলের রক্ত দিয়া শহীদ মিনার লাল করছে। আমি এ হত্যার কঠিন বিচার চাই।’

‎রাকিবুল ইসলামের স্ত্রী হাবিবা আক্তার বলেন, ‘গতকাল (রোববার) সন্ধ্যার পর রাকিব আমাকে বলে মিরপুর থেকে তার এক বড় ভাই শহীদ মিনারের দিকে এসেছে। সে তাদের সঙ্গে কথা বলতে যাচ্ছে। এরপর রাতে শুনি আমার স্বামীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।’

‎তিনি বলেন, ‘বগুড়ায় এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের বিয়ে খেতে গিয়ে খুলনার জান্নাত মুন নামে এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের সঙ্গে আমার স্বামীর পরিচয় হয়। এরপর থেকে জান্নাত আমার বাসায় যাতায়াত করতো। আমাদের বাসায় থাকাকালীন আমার স্বামী টের পায়, সে কার সঙ্গে যেন ফোনে মাদক বহনের বিষয়ে কথা বলতো। বিষয়টি নিয়ে আমার স্বামী তাকে সরাসরি মাদক বহনের বিষয়টি নিয়ে জিজ্ঞেস করে। জান্নাত তার বয়ফ্রেন্ড সাজিদকে বিষয়টি জানায়। এরপর এক মাস আগে জান্নাতের ওই বয়ফ্রেন্ড আমার স্বামীকে ফোনে মাদকের বিষয়টি নিয়ে গালাগালি করে। এক পর্যায়ে সে বলে, তোরে ঢাকায় এসে খেয়ে দিয়ে যাব। তুই বিষয়গুলা নিয়ে বাড়াবাড়ি করবি না।’

‎হাবিবা জানান, ‘এরপর একদিন আমার স্বামীর এক কনটেন্টে একটা মেয়ে কমেন্ট করে। সেখানে জান্নাত মুন গিয়ে রিপ্লাই দেয়। আমার স্বামীর আইডির কনটেন্টে কেন জান্নাত রিপ্লাই দিল, এটা নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়। এক পর্যায়ে জান্নাত মুনের বয়ফ্রেন্ড তাকে বলে, রাকিবের আইডিতে এমন রিপ্লাই রাকিবের স্ত্রী দেবে, তুমি কেন দিছো। তাদের ঝগড়ার পর সাজিদ আমাকে টেক্সট করে বিষয়টা জানায়। আমি ওই সময় বলি, রাকিবের কনটেন্টে কে কমেন্ট করল না করল, এটা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। তখন সাজিদ এক পর্যায়ে আমাকে হুমকি দিয়ে বলে, আমাদের মধ্যে যেহেতু রাকিব ঝামেলা লাগিয়ে দিয়েছে, তাই আপনি রাকিবের জীবন থেকে সরে যান, না হয় রাকিবকে আপনার জীবন থেকে সরিয়ে দেব।

তিনি বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগে আমার স্বামীর পারসোনাল হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে একটা প্রোডাক্টের প্রমোশনাল কাজের জন্য টেক্সট আসে। তিনি রাকিবকে খিলগাঁও এলাকা থেকে প্রমোশনের প্রোডাক্টের পার্সেল রিসিভ করতে বলেন। ওই সময় রাকিব বিষয়টা আমাকে বলে, আমার এ নাম্বার তো কেউ জানে না। আমার প্রমোশনের কাজের জন্য সবাই আমার মেইলে যোগাযোগ করে। কিন্তু আমার পারসোনাল হোয়াটসঅ্যাপে তো টেক্সট বা কল আসার কথা না। এরপর আবার ওই একই নাম্বার থেকে কল আসতে থাকে। কল রিসিভ করার পর রাকিবের সঙ্গে তাদের কথা কাটাকাটি হয়। তখন ওই নাম্বার থেকে রাকিবকে বলে, তোরে তোর এলাকায় এসে গুলি করে যাব। কে কী করে দেখি।’

‎হাবিবা জানান, ‘সপ্তাহ খানেক আগে জান্নাত মুনের আইডি থেকে আমার ফেসবুক আইডিতে টেক্সট করে বলে, আপু তোমাদের বাসার গলির নাম কী? আমি জান্নাতকে বলি, তুমি অগণিত বার আমাদের বাসায় এসেছো। তুমি এখন বলো আমাদের বাসার গলির নাম কী। তখন আমি জান্নাতকে বলি, তুমি নাজিমউদ্দীন রোড এসে আমাকে কল দিয়ো। আমি তোমাকে লোকেশন বলে দেব। এ কথা বলার পর সে আমাকে ফেসবুক থেকে ব্লক করে দেয়।’

‎নিহত রাকিবের স্ত্রী সবশেষে বলেন, ‘আমি আমার স্বামীকে হত্যার কঠোর বিচার চাই।’ তার অভিযোগ, ‘ঘটনার পর পুলিশ আমাদের সঙ্গে এখনো কোনো যোগাযোগ করেনি।’

‎এ বিষয়ে রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম বলেন, ‘শহীদ মিনারে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের বাবা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুজনকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেফতারে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।’

এর আগে রোববার (১৫ মার্চ) রাত সাড়ে ৯টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদীর সামনে রাকিবকে গুলি করে ও কুপিয়ে গুরুতর জখম করে সন্ত্রাসীরা। ঘটনার পর কয়েকজন পথচারী তাকে ঢাকা মেডিকেলে নিলেও বাঁচানো যায়নি। 

‎একেএস/এএইচ

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর