জাতীয় সংসদে নবনির্বাচিত সরকারের প্রথম অধিবেশন বসতে যাচ্ছে বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ)। সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিএনপির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সংসদ নেতা তারেক রহমানের প্রারম্ভিক বা স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে এ অধিবেশনটি শুরু হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করার কথা থাকলেও সংসদের এ অধিবেশনটির সূচনা হবে ‘স্পিকারের শূন্য আসন নিয়ে’।
বিজ্ঞাপন
নিজের বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন কোনো একজন সংসদ সদস্যকে অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিত্ব করার আহ্বান জানাবেন এবং সেই সভাপতির সভাপতিত্বেই নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধান ও জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী, বিদায়ী সংসদের স্পিকার কিংবা ডেপুটি স্পিকারের নতুন সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার কথা।
এর আগে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন শিরীন শারমিন চৌধুরী। ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন শামসুল হক টুকু।
বিজ্ঞাপন
কিন্তু ওই বছরের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সংসদের স্পিকারের পদ থেকে পদত্যাগ করেন শিরীন শারমিন চৌধুরী। অন্যদিকে ডেপুটি স্পিকার মামলার আসামি হয়ে এখন কারাগারে।
ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই অনেকের মধ্যেই এই কৌতূহল আছে যে, সংসদ অধিবেশনের সূচনায় কে সভাপতিত্ব করবেন। ধারণা করা হচ্ছিল, অধিবেশনের আগের দিন সরকারি দলের সংসদীয় দলের সভায় এটি চূড়ান্ত হতে পারে।
কিন্তু ওই সভায় বলা হয়েছে, অধিবেশনের প্রারম্ভিক সভাপতি এবং নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার– এসব কিছুই চূড়ান্ত করার দায়িত্ব সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
সংসদীয় দলের সভা শেষে সাংবাদিকদের বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এ অধিবেশনটি জাতীয় জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক। কাল বেশ কিছু ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত হবে। সংসদ নেতা প্রারম্ভিক বা স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন, সেটি বিধি মোতাবেক আহ্বান করবেন।’
আরও পড়ুন: যে কারণে ব্যতিক্রম এবারের সংসদ
কাল প্রথম দিনে যা যা হবে
সাধারণত সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন এবং প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ভাষণের দিকেই সবার নজর থাকলেও এবার পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন।
বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ ও চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি দুজনই সাংবাদিকদের বলেছেন, এবার সংসদের কার্যক্রমের শুরুতেই সংসদ নেতা হিসেবে তারেক রহমান একজনকে সভাপতিত্ব করার আহ্বান জানাবেন এবং ‘সেই একজন’ কে হবেন, সেটি তিনিই নির্ধারণ করবেন।
সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘একজন পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করবেন। এরপর সংসদ নেতা এই সভায় সভাপতিত্ব করার জন্য কোনো একজন সিনিয়র নেতার নাম প্রস্তাব করবেন। কোনো একজন সংসদ সদস্য তা সমর্থন করবেন। তারপর ওই সদস্য সভাপতিত্ব করবেন।’
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকে সংসদ সদস্যদের মধ্য হইতে সংসদ একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করবে।
সংসদ নেতার আহ্বানে কোনো একজনের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরুর পর নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু হবে। যদি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে একাধিক প্রার্থী না থাকে, তাহলে কণ্ঠভোটের মাধ্যমেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার কথা।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর অধিবেশন কিছুক্ষণের জন্য মুলতবি হবে। ওই মুলতবি সময়ে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে সংসদ ভবনেই শপথবাক্য পাঠ করাবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এরপর নতুন স্পিকারের সভাপতিত্বে অধিবেশনের কার্যক্রম শুরু হবে।
এরপর সংসদে পাঁচ সদস্যের একটি সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন, শোক প্রস্তাব উত্থাপন ও আলোচনা, অন্তর্র্বতী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলো উত্থাপন, কিছু সংসদীয় কমিটি গঠন ও রাষ্ট্রপতির ভাষণের কর্মসূচির কথা জানিয়েছেন চিফ হুইপ।
চিফ হুইপ বলেন, অর্ডিন্যান্সের জন্য বিশেষ কমিটি হবে। তারা বাছাই করবে এবং এরপর যেটা থাকার সেটা থাকবে আর বাকিটা ল্যাপ্স হয়ে যাবে। এরপর রাষ্ট্রপতির ভাষণের মাধ্যমে দিনের কার্যক্রম শেষ হবে এবং প্রথম দিনের অধিবেশন মুলতবি হবে।
প্রসঙ্গত, দেশের সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার দুটি পদই সরকারি দল থেকে নির্বাচিত হয়। তবে অন্তর্র্বতী সরকারের সময়ে রাষ্ট্র ব্যবস্থা সংস্কারে যে জুলাই সনদ করা হয়েছে, সেখানে বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার পদ রাখার কথা বলা হয়েছে।
নির্বাচনের পর বিএনপি জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী গণপরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি। এক্ষেত্রে তারা যুক্তি দিয়েছে যে, সংবিধানে এমন বিধান না থাকায় তারা শপথ নেয়নি।
তবে দলটি নিজেদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে সংসদের ডেপুটি স্পিকার পদটি নেওয়ার জন্য বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে প্রস্তাব দিলেও তারা সেটি গ্রহণ করেনি।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তের আগে জামায়াত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার পদে নিয়োগ নিতে চায় না বলে জানিয়েছেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
সংসদ ভবনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নাকচ করেছি বলতে হবে, এই মুহূর্তে এইভাবে আমরা ডেপুটি স্পিকার তো নিতে চাইনি। এটা সংসদে আলোচনা হবে, জুলাই সনদের প্রশ্নটা আগে নিষ্পত্তি হতে হবে।’
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভ করার পর সরকার গঠন করেছে বিএনপি। নির্বাচনের পরদিন (১৩ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নামে গেজেট প্রকাশিত হয়। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি তারেক রহমানকে সংসদীয় দলের প্রধান ও সংসদ নেতা নির্বাচনের পর ওই দিনই বিকেলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন।
এবারের জাতীয় সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতাসহ যারা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের ৭৬ শতাংশই নতুন। যে কারণে এই সংসদকে একটি ব্যতিক্রমী সংসদ বলেও মনে করেন সংসদ গবেষকরা।
বিএনপির সংসদীয় দলের সভা
অধিবেশনকে সামনে রেখে সংসদ ভবনে সরকারি দলের সভাকক্ষে বুধবার (১১ মার্চ) বিএনপির সংসদীয় দলের সভা হয়েছে সংসদ নেতা তারেক রহমানের সভাপতিত্বে।
সভায় তারেক রহমানের সঙ্গে মঞ্চে একপাশে ছিলেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। অন্য পাশে ছিলেন যথাক্রমে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সালাহউদ্দিন আহমদ।
সভায় অংশ নিয়েছেন- বিএনপির এমন একজন সংসদ সদস্য বলেছেন, তারেক রহমান তার নির্দেশনামূলক বক্তব্যে বলেছেন, জুলাই সনদের যেসব বিষয় বাস্তবায়নযোগ্য, সরকার সেগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে।
এএইচ

