দেশে গত ফেব্রুয়ারি মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৩২ জন নিহত হয়েছেন। এ সময় মোট ৫১৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১০৬৮ জন। নিহতদের মধ্যে নারী ৫৬ জন এবং শিশু ৬২ জন। নিহতদের প্রায় ৪০ শতাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে ১৮৭টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৭৪ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ৪০ দশমিক ২৭ শতাংশ। দুর্ঘটনায় ১০২ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ২৩ দশমিক ৬১ শতাংশ। এ ছাড়া যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৬৪ জন।
বিজ্ঞাপন
একই সময়ে দেশে ৮টি নৌ দুর্ঘটনায় ৩ জন নিহত ও ৯ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ৪৩টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ২৮ জন নিহত এবং ১৪ জন আহত হয়েছেন।
রোববার (৮ মার্চ) বেসরকারি সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ৯টি জাতীয় দৈনিক, ৭টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে এই তথ্য প্রকাশ করেছে।
যানবাহনভিত্তিক নিহতের চিত্র
যানবাহনভিত্তিক নিহতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ১৭৪ জন, যা মোট নিহতের ৪০ দশমিক ২৭ শতাংশ। বাসের যাত্রী ২২ জন, যা ৫ দশমিক ০৯ শতাংশ। ট্রাক-পিকআপ-ট্রাক্টর-লরি আরোহী ২৪ জন, যা ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ। প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসের আরোহী ১৬ জন, যা ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া থ্রি-হুইলার যাত্রী (ইজিবাইক, সিএনজি, অটোরিকশা, অটোভ্যান, লেগুনা) ৬৪ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ১৪ দশমিক ৮১ শতাংশ। স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী (নসিমন, ভটভটি, আলমসাধু, টমটম, মাহিন্দ্র) ২৩ জন, যা ৫ দশমিক ৩২ শতাংশ। বাইসাইকেল আরোহী ৭ জন, যা ১ দশমিক ৬২ শতাংশ।
দুর্ঘটনা সংঘটিত সড়কের ধরন
দুর্ঘটনা সংঘটিত সড়কের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, জাতীয় মহাসড়কে ১৫৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা মোট দুর্ঘটনার ৩০ দশমিক ৩৬ শতাংশ। আঞ্চলিক সড়কে ২১৩টি দুর্ঘটনা, যা ৪১ দশমিক ১৯ শতাংশ। গ্রামীণ সড়কে ৫৬টি দুর্ঘটনা, যা ১০ দশমিক ৮৩ শতাংশ। শহরের সড়কে ৮৪টি দুর্ঘটনা, যা ১৬ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং অন্যান্য স্থানে ৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
দুর্ঘটনার ধরন
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১১৩টি দুর্ঘটনা মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটেছে, যা মোট দুর্ঘটনার ২১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঘটেছে ২২৮টি দুর্ঘটনা, যা ৪৪ দশমিক ১০ শতাংশ। পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দিয়ে ঘটেছে ১০৪টি দুর্ঘটনা, যা ২০ দশমিক ১১ শতাংশ। যানবাহনের পেছনে আঘাত করার ঘটনা ৬৮টি, যা ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং অন্যান্য কারণে ঘটেছে ৪টি দুর্ঘটনা, যা ০ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহন
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা ছিল মোট ৮২৬টি। এর মধ্যে ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ-ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি-ড্রাম ট্রাক-কার্গো ট্রাক-সেনা বাহিনীর গাড়ি-পুলিশ ভ্যান-ট্যাংকারের সম্পৃক্ততা ছিল ২৯ দশমিক ০৫ শতাংশ। যাত্রীবাহী বাস ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ, মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার-অ্যাম্বুলেন্স-জিপ ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ, মোটরসাইকেল ২৪ দশমিক ০৯ শতাংশ, থ্রি-হুইলার ১৮ দশমিক ৪০ শতাংশ, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন ৫ দশমিক ০৮ শতাংশ, বাইসাইকেল-রিকশা ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং অজ্ঞাত যানবাহন ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ।
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা ছিল মোট ৮২৬টি। এর মধ্যে বাস ৯৪টি, ট্রাক ১৩৮টি, কাভার্ডভ্যান ১৩টি, পিকআপ ২৪টি, ট্রাক্টর ২৯টি, ট্রলি ৬টি, লরি ৯টি, ড্রাম ট্রাক ১২টি এবং কার্গো ট্রাক ৪টি রয়েছে। এ ছাড়া সেনা বাহিনীর গাড়ি ১টি, পুলিশ ভ্যান ২টি এবং ট্যাংকার ২টি দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত ছিল।
এ ছাড়া মাইক্রোবাস ১৪টি, প্রাইভেটকার ১২টি, অ্যাম্বুলেন্স ৩টি ও জিপ ২টি দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল। মোটরসাইকেল ১৯৯টি এবং থ্রি-হুইলার ১৫২টি (ইজিবাইক, সিএনজি, অটোরিকশা, অটোভ্যান ও লেগুনা) দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত ছিল। স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন ৪২টি (নসিমন, ভটভটি, আলমসাধু, টমটম ও মাহিন্দ্র), বাইসাইকেল ৭টি ও রিকশা ৯টি দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল। এ ছাড়া ৫২টি অজ্ঞাত যানবাহনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণ
সময়ের ভিত্তিতে বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনার ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ ভোরে, ২২ দশমিক ৪৩ শতাংশ সকালে, ২০ দশমিক ১১ শতাংশ দুপুরে, ১৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ বিকেলে, ১৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ সন্ধ্যায় এবং ১৯ দশমিক ৭২ শতাংশ রাতে ঘটেছে।
দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে দুর্ঘটনা ঘটেছে ২৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং প্রাণহানি ২৫ দশমিক ২৩ শতাংশ। রাজশাহী বিভাগে দুর্ঘটনা ১৪ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং প্রাণহানি ১৪ দশমিক ৮১ শতাংশ। চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্ঘটনা ১৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং প্রাণহানি ১৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
এ ছাড়া খুলনা বিভাগে দুর্ঘটনা ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ ও প্রাণহানি ১৩ দশমিক ১৯ শতাংশ, বরিশাল বিভাগে দুর্ঘটনা ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ ও প্রাণহানি ৫ দশমিক ০৯ শতাংশ, সিলেট বিভাগে দুর্ঘটনা ৭ দশমিক ১৫ শতাংশ ও প্রাণহানি ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ, রংপুর বিভাগে দুর্ঘটনা ১১ দশমিক ৬০ শতাংশ ও প্রাণহানি ১২ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং ময়মনসিংহ বিভাগে দুর্ঘটনা ৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ ও প্রাণহানি ৬ শতাংশ।
এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১২২টি দুর্ঘটনায় ১০৯ জন নিহত হয়েছেন। বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে কম ২৮টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২২ জন। রাজধানী ঢাকায় ৩২টি দুর্ঘটনায় ১৭ জন নিহত এবং ৪৬ জন আহত হয়েছেন।
নিহতদের পেশাগত পরিচয়
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, পুলিশ সদস্য ১ জন, শিক্ষক ১১ জন, সাংবাদিক ৪ জন, আইনজীবী ৩ জন, বিভিন্ন ব্যাংক-বীমা কর্মকর্তা ও কর্মচারী ১৪ জন, এনজিও কর্মী ১৭ জন, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ৩৪ জন, স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ২৩ জন, ওষুধ ও বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী বিক্রয় প্রতিনিধি ২৯ জন, পোশাক শ্রমিক ৬ জন, নির্মাণ শ্রমিক ৪ জন, প্রতিবন্ধী ২ জন এবং ৬১ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণসমূহ
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা অন্যতম। এ ছাড়া চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণ-যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতাও দুর্ঘটনার বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজিকেও দুর্ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সুপারিশ
দুর্ঘটনা কমাতে সংগঠনটি কয়েকটি সুপারিশও করেছে। এর মধ্যে দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বৃদ্ধি, চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা এবং বিআরটিএর সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিবহন মালিক-শ্রমিক, যাত্রী ও পথচারীদের প্রতি ট্রাফিক আইনের বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন বন্ধ করে এগুলোর জন্য আলাদা পার্শ্ব রাস্তা বা সার্ভিস রোড তৈরি করা এবং পর্যায়ক্রমে সব মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করা, রেল ও নৌপথ সংস্কার করে সড়কপথের ওপর চাপ কমানো, টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ বাধাহীনভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
দুর্ঘটনা পর্যালোচনা ও মন্তব্য
গত জানুয়ারি মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছিল ১৫.৭০ জন। ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছে ১৫.৪২ জন। এই হিসেবে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমেছে ১.৭৮ শতাংশ। দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমার এই হার কোনো টেকসই উন্নতির সূচক নির্দেশ করছে না। কারণ সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনায় কোনো দৃশ্যমান উন্নতি নেই।
অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে অতিরিক্ত গতির কারণে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে। এই গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি এবং চালকদের মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণ দরকার। যানবাহনের বেপরোয়া গতি এবং পথচারীদের অসচেতনতার কারণে পথচারী নিহতের ঘটনা বাড়ছে। এজন্য সরকারি উদ্যোগে গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে জীবনমুখী সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে।
পেশাগত সুযোগ-সুবিধা বিশেষ করে, নিয়োগপত্র, বেতন ও কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট না থাকার যানবাহনের অধিকাংশ চালক শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ। তারা সবসময় অস্বাভাবিক আচরণ করেন এবং বেপরোয়াভাবে যানবাহন চালান। ফলে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হন। তাই, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে হলে পরিবহন শ্রমিকদের পেশাগত সুযোগ-সুবিধা এবং সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কার করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
এএইচ/এফএ

