শুক্রবার, ৬ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

সংসদের হুইপদের কাজ কী? বাড়তি কী সুবিধা পান তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬ মার্চ ২০২৬, ০২:৩৫ পিএম

শেয়ার করুন:

সংসদের হুইপদের কাজ কী? বাড়তি কী সুবিধা পান তারা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সংসদের কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে এবং সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছে। নতুন সংসদের কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগে বিভিন্ন সাংবিধানিক ও সংসদীয় পদ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে ব্যাপক আলোচনা। এসব পদের মধ্যে চিফ হুইপের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ হলো সংসদের হুইপ।

সংসদীয় ব্যবস্থায় আইন প্রণয়ন ও সংসদের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য দলীয় সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সমন্বয় বজায় রাখতে চিফ হুইপের সঙ্গে কয়েকজন হুইপ কাজ করেন। তারা সবাই সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকেই মনোনীত হন এবং সংসদের ভেতরে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা, সদস্যদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং দলীয় অবস্থান বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।


বিজ্ঞাপন


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্যরা গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণের মাধ্যমে নতুন সংসদের যাত্রা শুরু করেছেন। একই দিনে সরকারি দল মন্ত্রিসভা গঠন করে। অন্যদিকে বিরোধী জোটের বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নির্বাচন করা হয়। একই বৈঠকে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে। এদিকে সরকার দলের ছয়জনকে হুইপ নিযুক্ত করার কথা জানানো হয়েছে।

তারা হলেন— হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য জি কে গউছ, খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রকিবুল ইসলাম, শরীয়তপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপু, নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, দিনাজপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান মিয়া এবং লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজাম।

হুইপ কী?

‘হুইপ’ শব্দের অর্থ হলো সচেতক। সরকার দলীয় হুইপ তাদের সংসদ সদস্যদের সম্মতিক্রমে নির্বাচিত হন। আর বিরোধী দলের হুইপ তাদের সংসদ সদস্যদের সম্মতিক্রমে নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপন জারি করে সংসদ সচিবালয়।


বিজ্ঞাপন


হুইপদের দায়িত্ব

হুইপদের প্রধান কাজ হলো দলের সদস্যদের সংসদে উপস্থিতি নিশ্চিত করা। কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিল বা প্রস্তাব উত্থাপিত হলে তারা দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সদস্যদের ভোট প্রদানে সমন্বয় করেন। যারা দলীয় নীতির বিরুদ্ধে ভোট দেন, তাদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাজনিত ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকারও হুইপদের থাকে। সংসদে আলোচনা চলাকালে হুইপরা নিশ্চিত করেন কে কখন বক্তব্য রাখবেন এবং কতক্ষণ বক্তব্য দেবেন, যাতে দলীয় অবস্থান সুসংগঠিত থাকে।

তাদের কার্যক্রম কেবল ভোট গ্রহণে সীমাবদ্ধ নয়। হুইপরা সংসদের বিভিন্ন অধিবেশনে দলীয় সমন্বয় বজায় রাখেন, সদস্যদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন এবং আইন প্রণয়নে দলের একক অবস্থান নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করেন। বিশ্লেষকদের মতে, সংসদীয় কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনা ও দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখায় হুইপদের ভূমিকা অপরিহার্য।

হুইপদের সুযোগ-সুবিধা

আইন অনুযায়ী সংসদের হুইপরা প্রতিমন্ত্রীর সমমানের মর্যাদা ভোগ করেন। তাদের বেতন, ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রতিমন্ত্রীদের সমপরিমাণ। একজন প্রতিমন্ত্রীর মাসিক বেতন বর্তমানে প্রায় ৯২ হাজার টাকা।

দায়িত্ব পাওয়ার পর হুইপরা সরকারি ব্যয়ে সুসজ্জিত বাসভবনে থাকতে পারেন। যদি বাসভবনে না থেকে নিজস্ব বাসা বা ভাড়া বাড়িতে থাকেন, তাহলে সরকার থেকে মাসিক ৭০ হাজার টাকা ভাড়া ভাতা এবং বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বছরে তিন মাসের সমপরিমাণ অর্থ প্রদান করা হয়।

একজন হুইপ এলাকায় সামাজিক ও দাতব্য কার্যক্রমে বরাদ্দ হিসেবে বছরে সাড়ে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারেন। এর মধ্যে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত সুবিধা পেতে পারেন। এ ছাড়া হুইপদের দপ্তরে দেশি-বিদেশি অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য মাসে সাড়ে ৭ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকে।

স্বাস্থ্য, যাতায়াত ও গাড়ি সুবিধা

মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও হুইপদের অসুস্থতার ক্ষেত্রে চিকিৎসার পুরো খরচ সরকার বহন করে। সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য তারা একটি সরকারি গাড়ি ব্যবহার করতে পারেন। প্রয়োজনে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণের জন্য সরকারি জিপ ও ১৮ লিটার দৈনিক জ্বালানি সুবিধা পাবেন। দেশের মধ্যে ভ্রমণের সময় হুইপরা দৈনিক দুই হাজার টাকা ভাতা পান।

দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক সহায়তা

হুইপদের দপ্তরের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একান্ত সচিব, সহকারী সচিব, ব্যক্তিগত সহকারী, জমাদার, আরদালি, অফিস সহায়ক এবং পাচকসহ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক দল থাকে। তাদের সকল প্রশাসনিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা এই কর্মীবৃন্দের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এ ছাড়া মোবাইল ফোন, বাসভবনের বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও টেলিফোনের খরচও সরকার বহন করে।

সংসদ বিশেষজ্ঞদের মতে, হুইপরা সংসদীয় গণতন্ত্রের কার্যক্রমে দলীয় সমন্বয় বজায় রাখার ক্ষেত্রে চিফ হুইপের সহায়ক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাদের কার্যক্রম ছাড়া দলের একক অবস্থান বজায় রাখা এবং সংসদের আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।

দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব

সংসদের ভেতরে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা হুইপদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়। সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের সদস্যদের একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিচালিত করতে চায়। সংসদে দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে কোনো সদস্য যেন ভিন্ন অবস্থান না নেন বা ভোটদানে ভিন্নমত প্রকাশ না করেন, সে বিষয়েও হুইপরা নজর রাখেন।

কোনো সদস্য যদি নিয়মিত সংসদে উপস্থিত না থাকেন বা দলীয় সিদ্ধান্ত অনুসরণ না করেন, তাহলে সে বিষয়ে দলীয় নেতৃত্বকে অবহিত করার দায়িত্বও হুইপদের ওপর বর্তায়। অনেক ক্ষেত্রে সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে তারা সংসদের কার্যসূচি সম্পর্কে অবহিত করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহিত করেন।

সংসদের ভেতরে দলীয় অবস্থান সুসংহত রাখা এবং আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় দলীয় সমর্থন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে হুইপরা কার্যকর ভূমিকা পালন করেন বলে মনে করেন সংসদ বিষয়ক বিশ্লেষকরা।

সংসদীয় গণতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা

সংসদ বিশেষজ্ঞদের মতে, সংসদীয় গণতন্ত্রে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া সফলভাবে পরিচালনা করতে হলে দলীয় সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সমন্বয় বজায় রাখতে চিফ হুইপের পাশাপাশি হুইপদের ভূমিকা অপরিহার্য।

সংসদের প্রতিটি অধিবেশনে সদস্যদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, দলীয় অবস্থান অনুযায়ী ভোটাভুটি সম্পন্ন করা এবং সংসদের আলোচনায় সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে তারা সংসদীয় কার্যক্রমকে আরও সুশৃঙ্খল করে তোলেন। ফলে সংসদের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন রাখতে এবং দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হুইপদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

এএইচ/এফএ

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর