- ট্রাফিক সহায়তাকারীদের চুক্তির মেয়াদ এ বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত
- ১৬ মাসে সরকারের ব্যয় ১৯ কোটির বেশি
- নতুন করে বরাদ্দ দিতে নারাজ সরকার
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজধানীর সড়কে যানজট নিয়ন্ত্রণ ও পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চালু হওয়া ট্রাফিক সহায়তাকারী প্রকল্পটি অর্থ সংকটের কারণে হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেছে। ট্রাফিক সহায়তাকারী শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন করে এ প্রকল্পে বরাদ্দ দিতে নারাজ সরকার। যদিও সরকারের চুক্তি অনুযায়ী, ৩০ জুন পর্যন্ত রাজধানীতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করার কথা ছিল শিক্ষার্থীদের। প্রকল্পটি নির্ধারিত মেয়াদ শেষ না হওয়ার আগেই বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এদিকে, সরকার ট্রাফিক সহায়তাকারী হিসেবে গতো ১৬ মাসে এ প্রকল্পে ১৯ কোটি ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করেছে। এতো টাকা ব্যয়ের পর সরকার নতুন করে চুক্তি নবায়ন হবে কি না সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেও কোন সাড়া পাননি।
বিজ্ঞাপন
রাজধানীর আটটি ট্রাফিক বিভাগে ট্রাফিক সহায়তাকারী সদস্য হিসেবে মোট ১ হাজার শিক্ষার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রথম ধাপে ২৪৬, ২০২৫ সালের মার্চে দ্বিতীয় ধাপে ৬০০ এবং শেষ ধাপে ১৫৪ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনধাপে এ ১ হাজার শিক্ষার্থীকে ট্রাফিক সহায়তাকারী হিসেবে নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। শিক্ষার্থীরা প্রতি শিফটে প্রতিদিন চার ঘণ্টা করে ডিউটি করতো। তাদেরকে দৈনিক ভাতা হিসেবে ভ্যাট,ট্যাক্স বাদ দিয়ে ৫০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হতো।
প্রথম ধাপের ২৪৬ শিক্ষার্থীকে ১৬ মাসে দেওয়া হয় ৫ কোটি ৯০ লাখ ৪০ হাজার, দ্বিতীয় ধাপে ৬০০ জনকে ১২ মাসে ১০ কোটি ৮০ লাখ এবং শেষ ধাপে ১১ মাসে ১৫৪ শিক্ষার্থীকে দেওয়া হয় ২ কোটি ৫৪ লাখ ১০ হাজার টাকা। সব মিলে ১৬ মাসে ট্রাফিক সহায়তাকারী হিসাবে দায়িত্ব পালন করা শিক্ষার্থীদের পেছনে সরকারের ব্যয় হয় ১৯ কোটি ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্প পরিচালনার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ মাসের শুরু থেকে কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় থাকা প্রায় ১ হাজার সহায়তাকারী এখন বেকার হয়ে পড়েছেন।
রাজধানীর শ্যামলী, যাত্রাবাড়ী, ফার্মগেট ও মিরপুরসহ বিভিন্ন ব্যস্ত এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, ট্রাফিক সহায়তাকারীদের অনুপস্থিতিতে মোড়গুলোতে শৃঙ্খলা রক্ষা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে অফিস সময় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটির সময় যানজট আরও তীব্র হচ্ছে। পথচারী ও গণপরিবহন চালকরাও হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, সামান্য অর্থের অভাবে এমন একটি জনবান্ধব উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি। দ্রুত বরাদ্দ নিশ্চিত করে প্রকল্পটি পুনরায় চালুর আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বিজ্ঞাপন
প্রকল্প নিয়ে শিক্ষার্থীদের ভাবনা:
ট্রাফিক সহায়তাকারী গ্রুপের সদস্য আরমান রহমান বলেন, আমরা ট্রাফিকের সাথে সহায়তাকারী হিসেবে প্রতিদিন ৪ ঘন্টা করে কাজ করতাম। আমাদের প্রতিদিন যে ভাতা দেওয়া হতো, তা দিয়ে মাস শেষে আমরা আমাদের পড়াশোনার খরচ,মেস ভাড়া ও আনুষাঙ্গিক খরচ মেটাতে পারতাম। এখন প্রকল্প বন্ধ করে দিলে আমরা সবচেয়ে ক্ষতির মুখে পড়বো। কারণ, ট্রাফিকে পার্টটাইম চাকরি করে আমাদের পকেট খরচ চলত। শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে সরকার এ প্রকল্পটি চালু রাখা উচিত। এ বিষয়ে আমরা সরকারের উচ্চপর্যায় এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। আশা করছি, সরকার প্রকল্পটি চদলু করে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করবে।
আরেক সদস্য ইনসিয়াত উদ্দিন রিহান বলেন, আমরা ২০২৪ এর পর আমরা রাজধানীর বিভিন্ন মোড় ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে ট্রাফিক সহায়তাকারী হিসেবে কাজ শুরু করি। আমাদের নিয়োগের আগে আমাদেরকে ট্রেনিং দিয়েছিলো। এরপর আমরা সড়কে প্রতিদিন ৪ ঘন্টা হিসেবে পার্টটাইম কাজ শুরু করি। আমাদের পড়াশোনার পাশাপাশি একটা আয় হচ্ছিলো। যা দিয়ে আমরা পড়াশোনা,খাবার খরচ,মেস ভাড়া ও আনুষাঙ্গিক খরচ বহন করতাম। এমন একটি প্রকল্প সরকার খরচ মেটাতে পারবেনা বলে বন্ধ করে দিলো। অথচ, সরকারের কতো সহস্রাধিক প্রকল্প নামে বেনামে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারের এ প্রকল্প মেয়াদ থাকার পরও কার পরামর্শে বন্ধ করতে হলো? আমরা সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কথা বলার চেষ্টা করছি। যদি এ প্রকল্প আবারও শুরু না করে। তাহলে আমরা আন্দোলনে নামবো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, যে সময় সড়কে একেবারে বিশৃঙ্খলা চলছিলো। সে সময় সীকার শিক্ষার্থীদের ট্রাফিক সহায়তাকারী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। ট্রাফিকের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ভালো কাজ করেছে। এটা যেমন সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর ভালো একটি উদ্যোগ ছিলো। তেমনি, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি পার্টটাইম হিসেবে আয়ের একটি ভালো কর্মসংস্থান ছিলো। আমাদের দেশে এ সিস্টেমটা ধরে রাখা গেলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি ভালো একটি কর্মসংস্থান খুঁজে পাবে।
সড়কে চলাচলের সময় দেখি ট্রাফিকের সঙ্গে শিক্ষার্থীরা কাজ করছে। সড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারের এ উদ্যোগটি কাজে লেগেছে। রাজধানীতে তখন সরকার ১ হাজার শিক্ষার্থী ট্রাফিক সহায়তাকারী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলো। এখন যদি অথ সংকট দেখিয়ে এ প্রকল্পটি সরকার বন্ধ করে দেয়। তাহলে সড়কে আবারও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি, শিক্ষার্থীরা আয়ের উৎস না পেলে তারা শিক্ষাজীবন থেকে সরে দাঁড়াবে। এরপর ক্রমান্বয়ে তারা অপরাধের দিকে ঝুঁকবে। আমাদের সমাজে তখন অপরাধের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। তাই সরকারের উচিত, প্রকল্পটিতে বরাদ্ধ দিয়ে আবারও শুরু করা।
এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, আমাদের ক্রান্তিকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা পেয়েছি। কিন্তু বাজেট বরাদ্দ না পাওয়ায় তাদের আমরা আর রাখতে পারছি না। বিষয়টি নিয়ে আমরা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলাম, কিন্তু মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য নির্দেশনা পাইনি। ফলে রাস্তায় শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয়তা আমরা অনুভব করা সত্ত্বেও আপাতত আর দায়িত্ব পালনে রাখতে পারছি না।
একেএস/এআর

