- তিন দফায় বাড়ানো হয়েছে প্রকল্পের সময়সীমা
- ঢাকা মহানগরীর ৪১টি থানায় প্রিপেইড গ্যাস মিটার বাস্তবায়ন
- প্রকল্পের মোট ব্যয় ৯২৮ কোটি ২৩ লাখ ৩১ হাজার টাকা
- প্রকল্প চলাকালে একাধিকবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন হয়েছে
- লিকেজ শনাক্ত হলে মিটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করতে সক্ষম
- প্রিপেইড মিটারে প্রতি গ্রাহকের গড়ে প্রায় ১০ ঘনমিটার গ্যাস সাশ্রয় হচ্ছে
তিন দফা সময় বৃদ্ধি, প্রকল্প পরিচালকের একাধিক পরিবর্তন এবং নিরীক্ষা আপত্তি সম্পূর্ণভাবে নিষ্পত্তি না হওয়া সত্ত্বেও প্রিপেইড গ্যাস মিটার স্থাপন প্রকল্পের সমাপ্তি ঘোষণা করেছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি। দীর্ঘ প্রায় এক দশকের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় ঢাকা মহানগরীর ৪১টি থানায় প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা হলেও সময়সূচি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
বিজ্ঞাপন
প্রকল্প চলাকালে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা না থাকা এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতির প্রভাব নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে। যদিও পয়েন্ট অব সেল এজেন্টের মাধ্যমে রিচার্জ সুবিধা চালু ও লিকেজ শনাক্ত হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করার প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ায় সেবার কাঠামোয় পরিবর্তন এসেছে। তবে নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণের কিছু বিষয় এখনো প্রক্রিয়াধীন থাকায় প্রকল্পের সামগ্রিক জবাবদিহিতা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
জানা গেছে, রাজধানীতে আবাসিক খাতে গ্যাসের অপচয় কমানো, ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে স্বচ্ছ করার লক্ষ্য নিয়ে হাতে নেওয়া প্রিপেইড গ্যাস মিটার স্থাপন প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। তবে দীর্ঘ সময় আর একাধিক সংশোধনের পর শেষ পর্যন্ত জুন ২০২৪-এ প্রকল্পটি সমাপ্ত হয়েছে। শুরুতে নির্ধারিত সময়সীমা ছিল ডিসেম্বর ২০১৮, কিন্তু বাস্তবায়নের নানা জটিলতায় সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়নি। ফলে তিন দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয় এবং প্রকল্পের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে প্রিপেইড মিটার চালুর মাধ্যমে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল গ্যাস ব্যবহারে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর অধিকাংশ আবাসিক গ্রাহক মিটারবিহীন সংযোগে নির্দিষ্ট মাসিক বিল পরিশোধ করে গ্যাস ব্যবহার করতেন। এতে ব্যবহার যতই হোক, বিলের পরিমাণ একই থাকায় অযাচিত অপচয়ের প্রবণতা তৈরি হয়। এ প্রেক্ষাপটে দুই লাখ প্রিপেইড গ্যাস মিটার স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে ৭১২ কোটি ৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন পায়।
প্রকল্পটি ২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে অনুমোদিত হয়। অর্থায়নের বড় অংশ আসে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার ঋণ সহায়তা থেকে। আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং জাপানের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইপিসি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর প্রস্তুতিমূলক কাজ শেষ করে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মিটার স্থাপন শুরু হয়।
বিজ্ঞাপন
শুরুতেই প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা দেয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি, বাসাবাড়িতে প্রবেশ করে স্থাপন কাজ সম্পন্ন করা এবং বিদ্যমান সংযোগে কারিগরি সমন্বয় করা সহজ ছিল না। অনেক এলাকায় গ্রাহকদের অনীহা এবং সময়মতো সহযোগিতা না পাওয়ায় কাজ বিলম্বিত হয়। এ অবস্থায় প্রথম সংশোধনের মাধ্যমে মেয়াদ বাড়িয়ে ডিসেম্বর ২০২০ নির্ধারণ করা হয়। এ পর্যায়ে ব্যয়ও পুনর্নির্ধারণ করা হয় এবং কিছু খাতে ব্যয় কমে আসে।
প্রথম সংশোধনে ব্যয় কমে দাঁড়ায় ৪৯৮ কোটি ৯৪ লাখ ৩২ হাজার টাকা। তবে এই হ্রাস মূলত কিছু কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস ও বাস্তব পরিস্থিতির আলোকে ব্যয় পুনর্মূল্যায়নের ফল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন বাস্তবতা সামনে আসে। জাইকার ঋণ প্যাকেজের অব্যয়িত অর্থ ব্যবহার করে আরও ১ লাখ ২০ হাজার মিটার স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়। এতে প্রকল্পের পরিধি বাড়ে এবং দ্বিতীয় সংশোধনে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৭৫৩ কোটি ৮৩ লাখ ৯৫ হাজার টাকা, মেয়াদ বাড়ানো হয় ডিসেম্বর ২০২২ পর্যন্ত।
পরবর্তীতে আরও ১ লাখ মিটার যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে মোট লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়ায় ৪ লাখ ২০ হাজার। তৃতীয় সংশোধনে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে জুন ২০২৪ করা হয় এবং ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৯২৮ কোটি ২৩ লাখ ৩১ হাজার টাকা। সর্বশেষ অনুমোদিত ব্যয়ের বিপরীতে প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ৮৮৪ কোটি ৭৩ লাখ ২৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রাক্কলিত মোট ব্যয়ের প্রায় ৯৫ দশমিক ৩১ শতাংশ ব্যবহার হয়েছে। এতে সাশ্রয় হয়েছে ৪৩ কোটি ৫০ লাখ ৪ হাজার টাকা।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে ঢাকা মহানগরীর ৪১টি থানায়। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন বিস্তৃত এলাকায় ধাপে ধাপে মিটার স্থাপন করা হয়। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ৪ লাখ ২০ হাজার প্রিপেইড মিটার স্থাপন ও কমিশনিং সম্পন্ন হয়েছে জুন ২০২৪-এর মধ্যে। যদিও কিছু নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বা অন্যান্য কারণে মিটার স্থাপন সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রিপেইড মিটার চালুর আগে একজন গ্রাহকের মাসিক গ্যাস ব্যবহার গড়ে ৪১ দশমিক ৭৩ ঘনমিটার ছিল। প্রিপেইড ব্যবস্থায় আসার পর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৫৭ ঘনমিটারে। অর্থাৎ গড়ে প্রায় ১০ ঘনমিটার গ্যাস সাশ্রয় হচ্ছে প্রতি গ্রাহকের ক্ষেত্রে। প্রিপেইড মিটার স্থাপনের আগে প্রতিটি বাসাবাড়িতে লিকেজ পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় মেরামত করা হয়েছে। এতে নিরাপত্তা ঝুঁকি কমেছে। কোনো কারণে লিকেজ শনাক্ত হলে মিটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করার সক্ষমতা রাখে। ফলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা হ্রাস পেয়েছে এবং মিথেন নিঃসরণ কমে পরিবেশগত সুবিধাও অর্জিত হয়েছে।
অডিট প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন সময়ে কিছু আপত্তি উত্থাপিত হয়। বহিঃনিরীক্ষা ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী বেশিরভাগ আপত্তি ইতোমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে। কয়েকটি আপত্তি এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও ক্রয়প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করেই সম্পন্ন করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে সেবা জোরদার করতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ১২৫ জন জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রিপেইড ব্যবস্থায় আসার ফলে গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। আগে নির্দিষ্ট বিলের কারণে ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের তাগিদ ছিল না, এখন গ্রাহক নিজেই ব্যবহার কমাতে আগ্রহী হচ্ছেন। এতে গ্যাস সাশ্রয়ের পাশাপাশি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার হচ্ছে। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার অবকাঠামো স্থাপন করা হয়েছে। ওয়েবভিত্তিক ব্যবস্থাপনা সিস্টেমের মাধ্যমে গ্রাহকের ব্যবহার, রিচার্জ, বকেয়া এবং অন্যান্য তথ্য রিয়েল টাইমে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। পয়েন্ট অব সেল এজেন্টের মাধ্যমে রিচার্জের পাশাপাশি এনএফসি সুবিধাসম্পন্ন মোবাইল অ্যাপ চালু করা হয়েছে, যাতে গ্রাহকরা সহজে নিজ নিজ মিটার রিচার্জ করতে পারেন।
কর্মকর্তারা জানান, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও ছিল প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশি ও বিদেশি প্রশিক্ষণে শতাধিক কর্মকর্তা অংশ নেন। কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি, সফটওয়্যার পরিচালনা, গ্রাহকসেবা ব্যবস্থাপনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। যদিও নির্ধারিত কিছু স্থানীয় প্রশিক্ষণ প্রকল্প মেয়াদে সম্পন্ন হয়নি, সেগুলোর বিষয়বস্তু অন্যান্য প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
তবে সমালোচকরা বলছেন, প্রকল্পের মেয়াদ তিন দফা বাড়ানো এবং ব্যয়ের বড় ধরনের ওঠানামা পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সমন্বয় ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। তবে লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে উপকারভোগীর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি করায় প্রকল্পের সামগ্রিক প্রভাব বেড়েছে। প্রকল্পের উদ্দেশ্য মোটামুটি অর্জিত হয়েছে। আবাসিক খাতে গ্যাস ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, সিস্টেম লস হ্রাস, রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং পরিবেশগত সুফল পাচ্ছে।
দীর্ঘ সময় ও ব্যয় সংশোধনের পরও প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সম্প্রসারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পেরেছে। এখন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, এই প্রিপেইড ব্যবস্থাকে টেকসই রাখা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে নতুন এলাকায় সম্প্রসারণের সম্ভাবনা যাচাই করা।
এএইচ/এফএ

