বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

স্ট্রোকজনিত রোগ অ্যানিউরিজম, বাংলাদেশে চিকিৎসা সাফল্য

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩৯ পিএম

শেয়ার করুন:

স্ট্রোকজনিত রোগ অ্যানিউরিজম, বাংলাদেশে চিকিৎসা সাফল্য
স্ট্রোকজনিত রোগ অ্যানিউরিজম, বাংলাদেশে চিকিৎসা সাফল্য। ছবি: সংগৃহীত

হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা, খিচুনি, বমি কিংবা অজ্ঞান হয়ে যাওয়াএসব উপসর্গ অনেক সময় নিছক কোনো সাধারণ অসুস্থতা নয়, বরং এটি হতে পারে প্রাণঘাতী রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকের সংকেত। সাধারণত মস্তিষ্কের রক্তনালীর গায়ে থাকা জন্মগত ফোসকা (অ্যানিউরিজম) ফেটে যাওয়ার পর এসব লক্ষণ প্রকাশ পায়। এমন হলে ক্লিপিং বা কয়েলিংয়ের মাধ্যমে ফোসকা আটকে দেওয়া জরুরি। না হলে দ্বিতীয়বার ফেটে গিয়ে ফের স্ট্রোক ও মৃত্যুর আশঙ্কা ভয়াবহভাবে বেড়ে যায়। জরুরি এই চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে রোগীর দ্বিতীয়বার স্ট্রোকের ঝুঁকি পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব। আশার দিক হলো, বাংলাদেশে সরকারির পাশাপাশি অনেক বেসরকারি হাসপাতালেও দক্ষতার সঙ্গে এই চিকিৎসা করা হচ্ছে এবং চিকিৎসায় সফলতাও পেয়েছেন রোগীরা।


বিজ্ঞাপন


বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সোবহানবাগে একটি রেস্টুরেন্টে অ্যানিউরিজমে আক্রান্ত এক কিশোরীর সফল চিকিৎসা নিয়ে আয়োজিত কন্টিনিউইং মেডিকেল এডুকেশনে (সিএমই) এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। আলোচনায় রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোক এবং জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ক্লিনিক্যাল সিদ্ধান্তগুলো উঠে আসে। একই সঙ্গে অ্যানিউরিজমের ঝুঁকি ও আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার নানা দিক তুলে ধরেন বক্তারা। 

তারা বলেন, অ্যানিউরিজম রাপচার (ফেটে যাওয়া) হলে যত দ্রুত সম্ভব ক্লিপিং বা কয়েলিংয়ের মাধ্যমে রোগীকে ঝুঁকিমুক্ত করতে হবে। এতে কোনো বিলম্ব চলবে না। ক্লিপিং বা কয়ালিংয়ের মাঝখানে যে সময়টা রোগী হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) থাকে। এ দেশে ৭-১০ দিন আইসিইউতে পড়ে থাকে রোগী। তাই এ সময়ে ব্লাড ম্যানেজমেন্টের প্রটোকল কী হবে? এটি খুবই জটিল। ১০০/৬০ এর উপরে ব্লাড প্রেসার যেতে পারবে না; এর নিচে থাকতে হবে। যদি যায়, তাহলে রোগীর দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। আবার ক্লিপিং বা কয়েলিংয়ের মাধ্যমে রোগী ঝুঁকিমুক্ত হওয়ার পর সিস্টলিক ব্লাড প্রেসার ১০০/৬০ নিচে থাকতে হবে, এটা ১০০/৬০ এর উপরে থাকতে হবে এবং এটা ২২০ রাখতে হবে। এজন্য অ্যানিউরিজমে আক্রান্ত রোগী ঝুঁকিমুক্ত হওয়ার পর ব্লাড প্রেসার ম্যানেজমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

অনুষ্ঠানে স্ট্রোকের নানা দিক ও অ্যানিউরিজম সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সুমন রানা।

তিনি বলেন, স্ট্রোক হলো এমন একটি জরুরি চিকিৎসাজনিত অবস্থা, যখন হঠাৎ করে মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্তপ্রবাহ কমে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়, কিংবা মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে যায়। এতে মস্তিষ্কের কোষগুলো অক্সিজেন ও পুষ্টির অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা মারা যায়।


বিজ্ঞাপন


স্ট্রোক দুই ধরন ও লক্ষণ

স্ট্রোকের লক্ষণ তুলে ধরে বিআরবি হাসপাতালের এই কনসালটেন্ট বলেন, ‘সাধারণত হঠাৎ কারও মুখ বেঁকে গেলে, এক হাত-এক পা দুর্বল হয়ে গেলে অথবা হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি কমে গেলে বা নাই হয়ে গেলে কিংবা কথায় জড়তা চলে আসেএই অবস্থাকে আমরা বলি স্ট্রোক। স্ট্রোক দুই ধরনের হয়। এক হলো রক্তনালীর মধ্যে রক্ত জমে রক্তচলাচল বন্ধজনিত স্ট্রোক, আরেকটি হলো রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোক, অর্থাৎ ব্রেইনের যে সুক্ষ রক্তনালী রয়েছে, এগুলো ফেটে গিয়ে ভেতরে রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোক। সাধারণত রক্ত চলাচল বন্ধজনিত স্ট্রোকই বেশি হয়এর পরিমাণ ৮৫ ভাগ আর রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকের হার ১৫ ভাগ।’

অ্যানিউরিজম কী? 

‘আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় হলো অ্যানিউরিজম, যা রক্তক্ষরণজনিত একটি স্ট্রোকের ধরন। এটি মস্তিষ্কের মধ্যে রক্তনালীর গায়ে ফোসকা থাকে। এটা জন্মগতভাবেই অনেকের থাকে। বয়সের সাথে এই ফোসকা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এভাবে বড় হতে হতে রক্তের চাপে এক পর্যায়ে বেলুনের মতো ফোসকাটি ফেটে যায়। রক্তনালীর গায়ের এই ফোসকাকে আমরা বলি অ্যানিউরিজম। এটা ফেটে গিয়ে রক্তক্ষরণ হয়। এই অ্যানিউরিজমের কারণে মস্তিষ্কের পর্দার নিচে রক্তক্ষরণ হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে বলা হয়, সাবঅ্যারাকনয়েড হেমোরেজ‘—যোগ করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে অ্যানিউরিজমজনিত সাবঅ্যারাকনয়েড হেমোরেজ ও বিলম্বিত সেরিব্রাল ইস্কেমিয়ায় (ভাসোস্পাজম) আক্রান্ত সে ১৬ বছর বয়সী কিশোরীর চিকিৎসায় সাফল্যের গল্প তুলে ধরেন ডা. সুমন রানা।

অ্যানিউরিজমে সুরক্ষা পাওয়া কিশোরীর গল্প

অ্যানিউরিজম লক্ষণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আজকের আলোচনা ছিল রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোক নিয়ে। যে রোগীর চিকিৎসা নিয়ে আলোচনা হয়, সে ১৬ বছর বয়সী কিশোরী। তার পিতা-মাতা বলেছেন, আগে ওর কোনো সমস্যা ছিল না। রাতে ঘুমের মধ্যে হঠাৎ খিচুনি, বমি হওয়ার পর অজ্ঞান হয়ে যায় এবং তার এতো বেশি মাথাব্যথা হয়েছে, যা জীবনে কখনো হয়নি। ঘুমের মধ্যে মেয়েটির যেসব উপসর্গ হয়েছে সেগুলোই অ্যানিউরিজম বা সাবঅ্যারাকনয়েড হেমোরেজের লক্ষণ। এই লক্ষণ যাদের থাকবে আমরা ধরে নিই যে, তার মস্তিষ্কের পর্দার নিচে রক্তক্ষরণ হয়েছে এবং তার মস্তিষ্কের রক্তনালীর গায়ে কোনো ফোসকা আছে, যা ফেটে গেছে। সে কারণেই এই রক্তক্ষরণ হয়েছে। এটাই হলো অ্যানিউরিজম রাপচার।’

ডা. সুমন রানা বলেন, ‘রোগী আমাদের কাছে আসার পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আমরা এনজিওগ্রাম করলাম; সিটিস্ক্যানের পর দেখা যায় মস্তিষ্কের পর্দার নিচে অনেক রক্তক্ষরণ হয়েছে। এটা নির্ণয় হওয়ার সিটিস্ক্যান মেশিনে থাকা অবস্থায় আমরা সিটি অ্যানজিওগ্রাম করে ফেলি। যেহেতু রক্তনালীর গায়ে ফোসকা, সেহেতু এনজিওগ্রাম দরকার। এনজিওগ্রামের রিপোর্টে দেখা যায়, রক্তনালীর গায়ে একটি ছোট্ট ফোসকা, যা ফেটে গিয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে।’ 

আক্রান্তদের ঝুঁকি ও সুরক্ষার উপায় 

‘এই অবস্থায় যে সমস্যা হয় তা হলোএই যে ফোসকাটা ফেটে গেল, এটা আবার ফাটতে পারে। সেই ঝুঁকির মাত্রা ৪০-৫০ ভাগ। এসব রোগী দ্বিতীয়বার স্ট্রোক করলে সাধারণত রোগীদের ৭২ ভাগ মারা যান। যেহেতু ফোসকাটা রয়ে গেছে, সেহেতু দ্বিতীয়বার স্টোক করার আশঙ্কাও রয়েছে ৫০ ভাগ। এ কারণে এসব রোগীদের বেলায় আমাদের প্রথম লক্ষ্য থাকে, এই ফোসকাটা কিভাবে আটকানো যায়। আটকাতে পারলে রোগীর দ্বিতীয়বার স্ট্রোকের ঝুঁকি পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব। এসব রোগীদের দ্বিতীয়বারের স্ট্রোকে মর্টালিটি ও মর্বিডিটির ঝুঁকি অনেক বেশি।

অ্যানিউরিজমের চিকিৎসা

ডা. সুমন রানা বলেন, ‘মস্তিষ্কের রক্তনালীর গায়ে থাকা এসব ফোসকার (অ্যানিউরিজম) চিকিৎসা দুইভাবে করা হয়। এর আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি হলো, এক এনজিওগ্রামের মাধ্যমে। যেমন আমরা হার্টের রোগীদের রিং পড়াই, অস্ত্রোপচার ছাড়া এনজিওগ্রামের মাধ্যমে, ও রকম রক্তনালীর ভেতরে দিয়ে আমরা একটি চিকন তারের মতো একটি নিয়ে ওই ফোসকার মধ্যে স্থাপন করি। এর পর ওটার ভেতরে দিয়ে আরেকটি সুক্ষ তারের মতো কয়েল দিয়ে ফোসকাটা ভেতর থেকে পূর্ণ করে দিই। এতে রক্ত আর ফোসকার মধ্যে যেতে পারে না। ফেলে আর ফাটতে পারে না। এটাই হলো আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি। এটাকে আমরা বলি অ্যানিউরিজম কয়েলিং। এটা আধুনিক বিশ্বে অস্ত্রোপচার ছাড়াই করা হয়। বাংলাদেশেও অনেক দক্ষতার সঙ্গে করা হচ্ছে। ঢাকা মেডিকেল, নিউরোসায়েন্স, বিএমইউ হাসপাতালে এটি অহরহই হচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালে যেখানেক্যাথল্যাব আছে, অ্যানজিওগ্রামের মেশিন আছেসেখানে এই চিকিৎসা হয়। একটি বেসরকারি হাসপাতালে আমরা সফলভাবে এই কয়েলিং করেছি।’

‘আরেকটি হলোক্লিপিং। এটি একটি ওপেন ব্রেন সার্জারি। মাথার খুলি খুলে অ্যানিউরিজমের মুখে একটি মেটাল ক্লিপ বসানো হয়, যাতে ওই ফোসকার ভেতরে আর রক্ত ঢুকতে না পারে’—যোগ করেন তিনি।

শনাক্তকরণের উপায়

একটি শিশুর অ্যানিউরিজমের বিষয়ে কীভাবে ধারণা পাওয়া যায়? এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. সুমন রানা বলেন, ‘আজকের সিএমইতে রোগীর বাবা-মা বলেছেন, তাদের মেয়ে একেবারে সুস্থ ছিল। কোনো সমস্যা ছিল না। হঠাৎ করেই তার এই রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোক নিয়ে আমাদের কাছে আসে। এটা বেশিরভাগ ক্ষেতেই বোঝা যায় না। এর কোনো লক্ষণ থাকে না, রক্তক্ষরণই হলো প্রথম উপসর্গ। এজন্য উন্নত বিশ্বে এই রোগটা শনাক্ত করার জন্য স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম আছে। চল্লিশ বছর হওয়ার পর একজন সুস্থ মানুষেরও এনজিওগ্রাম করা হয়। জাপানে একটি হেলথ প্রটোকল আছে, সেখানে ন্যাশনাল হেলথ গাইড লাইনের আওতায় চল্লিশ বছর বয়সীদের একটি ব্রেইনের এনজিওগ্রাম করা হয়। এতেই এই রোগ সম্পর্কে ধারণা হয়ে যায়, যদিও এর উপসর্গ তার মধ্যে নেই। এভাবে সূচনাতেই তারা শনাক্ত হওয়ার পর স্ট্রোকের তারা সতর্ক থাকতে পারেন।’

তিনি বলেন, অ্যানিউরিজমে আক্রান্ত রোগীদের ২০ ভাগের মাথা ব্যথার ইতিহাস থাকে। তাই বলে সব ধরনের মাথা ব্যথাকেই এই ধরনের ফোসকাজনিত সমস্যা বলা যাবে না। 

অধ্যাপক ডা. ইকবাল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী। বিশেষ অতিথি ছিলেন অধ্যাপক ডা. হাশিম রাব্বি ও ডা. মো. শাহরিয়ার আরাফাত (শৌরভ)।

অনুষ্ঠানে অ্যানিউরিজমে আক্রান্ত কিশোরীর ক্লিনিক্যাল ইতিহাস তুলে ধরেন ডা. জাকিয়া সুলতানা। সাবঅ্যারাকনয়েড হেমোরেজের পর কয়েলিং পর্যায় ও ভ্যাসোস্পাজমের ওপর আলোচনা করেন ডা. মো. রাশিক আলভী। 

এ ছাড়া ভ্যাসোস্পাজম ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক গাইডলাইন নিয়ে ডা. লোকেশ চৌধুরী ও ভ্যাসোস্পাজমের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলেন ডা. সাইয়েদ মুহাম্মদ শাহীন-উর হায়াত।

এসএইচ/এআর

 

 

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর