ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া সকল প্রার্থীদের আগামী ১৫ মার্চের মধ্যে নির্বাচনের ব্যয়ের হিসাবে দিতে হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিল না করলে সর্বোচ্চ সাত বছরের জেল বা জরিমানা করা হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
ইসির সংশ্লিষ্ট শাখার এক কর্মকর্তা জানান, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিজয়ীদের নামসহ গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, গেজেট প্রকাশের পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচনে অংশ নেওয়া সকল প্রার্থীর ব্যয়ের হিসাব রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হয়। সেক্ষেত্রে আগামী ১৫ মার্চ সময় শেষ হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও জানান, এসময়ের মধ্যে যদি কেউ ব্যয়ের হিসাব জমা না দেয় তাহলে এটি আরপিও অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে। এরজন্য সর্বোচ্চ ৭ বছর বা সর্বনিম্ন ২ বছর কিংবা অর্থ দণ্ড দেওয়া যেতে পারে।
ইসির সিনিয়র সহকারী সচিব এ এস এম ইকবাল হাসান জানান, নির্বাচনে প্রার্থীদের ব্যয় হিসাব গ্রহণ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গ্রহণ করে তা আগামী ২৫ মার্চের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে পাঠানোর জন্য ইতোমধ্যে সকল রিটার্নিং কর্মকর্তাদের চিঠি দেওয়া হয়েছে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৪৪গ(১) অনুযায়ী নির্বাচিত প্রার্থীর নাম সরকারি গেজেটে প্রকাশের পর থেকে ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচনি ব্যয়ের হিসাব (ফরম-২২) সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কাছে দাখিল করতে হবে। নির্বাচনি এজেন্ট নিয়োগ না থাকলে প্রার্থী নিজেই নির্বাচনি এজেন্ট হিসেবে গণ্য হবেন। নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা, ২০০৮-এর বিধি ৩১ অনুসারে নির্ধারিত ফরমে প্রয়োজনীয় হলফনামাসহ রিটার্ন জমা দিতে হবে এবং এর অনুলিপি রেজিস্টার্ড ডাকযোগে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়েও পাঠাতে হবে।
আইনের বিধান অনুযায়ী নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী—বিজয়ী, পরাজিত ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত প্রার্থীদেরও নির্বাচনি ব্যয়ের রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ১৯(১) অনুযায়ী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত প্রার্থীর ক্ষেত্রেও এই বাধ্যবাধকতা প্রযোজ্য। কোনো ব্যয় না হলেও তা নির্ধারিত ফরমে উল্লেখ করে রিটার্ন জমা দিতে হবে।
বিজ্ঞাপন
নির্বাচনি ব্যয়ের রিটার্ন যথাযথভাবে দাখিল না করলে বা এ সংক্রান্ত আদেশ লঙ্ঘন করলে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৪৪গ অনুযায়ী তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ক্ষেত্রে অনুচ্ছেদ ৭৪ অনুসারে দোষী প্রার্থী অনধিক সাত বছর এবং অন্যূন দুই বছর সশ্রম কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
নির্বাচনি ব্যয়ের রিটার্ন সংক্রান্ত বিধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের অবহিত করার দায়িত্ব রিটার্নিং অফিসারের। বিধান লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে তিনি আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। যেক্ষেত্রে নির্বাচনি মামলা না থাকে, সেক্ষেত্রে অপরাধ সংঘটনের তারিখ থেকে ছয় মাসের মধ্যে মামলা দায়ের করতে হবে। আর হাইকোর্ট বিভাগে মামলা বিচারাধীন থাকলে আদালতের আদেশের তিন মাসের মধ্যে মামলা দায়ের করতে হবে। এ জন্য নির্বাচন কমিশনের পূর্বানুমতির প্রয়োজন নেই।
এছাড়া গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৪৪ঘ(১) অনুযায়ী নির্বাচনি ব্যয়ের রিটার্ন, সম্ভাব্য তহবিলের উৎসের বিবরণী ও সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র এক বছর পর্যন্ত রিটার্নিং অফিসারের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণ করতে হবে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৪৪ঘ এবং নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা, ২০০৮-এর বিধি ২৮ অনুযায়ী নির্বাচনি ব্যয় সংক্রান্ত সংরক্ষিত সকল দলিল-দস্তাবেজ ও ব্যয়ের রিটার্ন অফিস চলাকালীন সময়ে জনসাধারণের পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক দলিল পরিদর্শনের জন্য ১০০ টাকা হারে ফি নির্ধারিত রয়েছে। এছাড়া কোনো ব্যক্তি দরখাস্তের মাধ্যমে নির্বাচনি ব্যয়ের বিবরণী, রিটার্ন বা সংশ্লিষ্ট দলিলের কপি কিংবা উদ্ধৃতাংশ চাইলে প্রতি পৃষ্ঠা ১০০ টাকা ফি প্রদান সাপেক্ষে তা সরবরাহ করা যাবে।
নির্বাচনি ব্যয়ের বিবরণী দাখিলের জন্য নির্ধারিত ফরম-২২, ২২ক, ২২খ ও ২২গ ইতোমধ্যে রিটার্নিং অফিসারদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এসব ফরম প্রত্যেক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কাছে সরবরাহ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
এছাড়া নির্বাচিত প্রার্থীর নাম সরকারি গেজেটে প্রকাশের পর ৩০ দিনের মধ্যে সকল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নির্ধারিত ফরমে হলফনামাসহ নির্বাচনি ব্যয়ের রিটার্ন দাখিল করেছে কিনা, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করতে হবে। যারা আইনের বিধান পরিপালনে ব্যর্থ হবে, তাদের বিরুদ্ধে গৃহীত আইনানুগ ব্যবস্থার বিষয়টিও নির্বাচন কমিশনকে জানাতে হবে।
নিবন্ধিত ৬০টি দলের মধ্যে ২৯৯ আসনের ৫০টি দল অংশগ্রহণ করেছে। এরমধ্যে ২৯৭টি আসনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করেছে ইসি। চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হবে আদালতের মামলা নিষ্পত্তির পর।
>> আরও পড়ুন
এবার নির্বাচনে দলের প্রার্থী ছিল ১ হাজার ৭৫৫ জন। স্বতন্ত্র ২৭৩ জন। মহিলা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা ৮৩ জন। এর মধ্যে দলীয় প্রার্থীর সংখ্যা ৬৩ জন। বাকি ২০ জন হচ্ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। ভোটের পুরুষ প্রার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৯৪৬ জন। এর মধ্যে ১ হাজার ৬৯২ জন দলীয় প্রার্থী। পুরুষদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৫৩ জন। শেরপুর-৩ আসনে একজন বৈধ প্রার্থী মারা যাওয়ায় আসনটিতে পরবর্তীতে নতুন তফসিলের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করা হবে।
নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছিল বিএনপি। ২৯০ জন প্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছে এই দলের। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী রয়েছে ২২৭ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৫৭ জন, জাতীয় পার্টির (জাপা) ২০০ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৩২ জন, গণঅধিকার পরিষদের ৯৪ জন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলো।
ভোটগ্রহণ শেষে ইসির ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী ভোটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৭টি আসনে ভোট পড়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ভোট পড়েছে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। আর গণভোটে ২৯৯ আসনে ভোট পড়েছে। ২৯৯ আসনে গণভোটে ভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। ‘হ্যা’ ভোটের পক্ষে ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি। আর ‘না’ ভোটের পক্ষে ভোট পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ ভোট।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি আসন পেয়েছে ২০৯টি। জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি। এনসিপি ৬টি। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আসন পেয়েছে ১টি। গণঅধিকার পরিষদ আসন পেয়েছে ১টি। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ১ আসনে জয় লাভ করেছে। গণসংহতি পেয়েছে একটি আসন। খেলাফত মজলিস পেয়েছে ১টি আসন। অন্যদিকে জাতীয় পার্টিসহ ৪১টি দল কোনো আসনই পায়নি।
এমএইচএইচ/এএস

