- মাহে রমজানে ট্রাফিক সদস্যদের ইফতার
- জনবল থাকলেও মাঠ ছাড়ার সুযোগ নাই
- পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার সরবরাহের দাবি
- একজন ট্রাফিকের ইনসেনটিভ সময়ের দাবি
গলা শুকিয়ে যায়। প্রচুর পিপাসা লাগে। কিন্তু রাস্তা তো ছাড়তে পারি না। আর পানি খাওয়া তো সম্ভব না। বেশির ভাগ সময় গাড়ির চাপ থাকে। ফলে রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়েই এক ঢোক পানি খেয়ে ডিউটি শুরু করতে হয়। পরে দেখা যায়, রাস্তা ফাঁকা হলে সেই সময় ইফতারি করতে পারি; না হলে অনেক সময় সম্ভবও হয় না।
বিজ্ঞাপন
মাহে রজমানে ঢাকার রাস্তায় ট্রাফিক সামলানো বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জিং অভিজ্ঞতার কথা ঢাকা মেইলকে জানাচ্ছিলেন গুলশান ট্রাফিকের টিআই কে এম মেহেদী হাসান।
মেহেদীর মতে, রমজানের বিকেলে একই সময় সকল গাড়ি সড়কে নামায় চাপটা সবচেয়ে বেশি থাকে। ফলে তখন ট্রাফিক সামাল দেওয়াটা কঠিন হয়ে যায়। আর রাস্তা ছেড়ে যাওয়া তো কল্পনার বাইরে থাকে। ডিউটির কারণে এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই তাদের কাজ করতে হয়।
টিআই কে এম মেহেদী হাসান বলছিলেন, ডিউটি পালনের সময় এমন অবস্থা হয় যে মুখ শুকিয়ে যায়। পানি খেতে মন চায়। কিন্তু আসলে রোজার কারণে তো পানি খাওয়া সম্ভব হয় না। ইফতারের আগে আগে সবাই যখন একযোগে ছুটতে থাকে তখন আমাদের ইফতার করার সময় থাকে না। কারণ আমরা যদি রাস্তা থেকে উঠে যাই তাহলে রাস্তায় যানজট লেগে যাবে। বিশৃঙ্খলা ঘটবে। এ কারণে আমরা কমবেশি সবাই ডিউটিতে আসার সময় অন্তত একটা খেজুর বা এক পানির বোতল সঙ্গে নিয়ে আসি। একটা খেজুর এবং এক ঢোক পানি খেয়ে যেন আমরা রোজা ভাঙতে পারি। তবে বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায় যে ৩টা থেকে ইফতারের আগে বা বিশেষ করে পরে প্রায় আধা ঘন্টা পর্যন্ত রাস্তায় প্রচুর গাড়ির চাপ থাকে। এ কারণে আমরা ইফতার করতে পারি না। দেখা যায়, আমাদের ইফতার করতে হয় পরে।

বিজ্ঞাপন
ট্রাফিক সদস্যদের নির্ধারিত পোশাকেই (ইউনিফর্ম) গরম কি শীত, রোজা কি ভরপেট সব সময় ওই পোশাকেই ডিউটি করতে হয়। কাপড়গুলোও বেশ মোটা। ফলে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেখা যায় যে তাদের শরীরে আর কুলায় না। ডিউটি করতে মন চায় না কিন্তু তাদের দায়িত্বের কথা মাথায় রেখে আর রাস্তা ছাড়তে পারেন না। কারণ তিনি রাস্তা ছাড়লে যানজট লেগে যাবে।
গুলশান বিভাগের ট্রাফিক জোনের সার্জেন্ট মাহমুদুল হাসান সিদ্দিকীর মতে, রমজান মাসে ট্রাফিকিং করা খুব চ্যালেঞ্জিং কারণ হচ্ছে সকালে এবং বিকেলে একই টাইমে অফিস শুরু হয় আবার একই টাইমে অফিস শেষ হয়। এই সময়টাতে সবাই একযোগে বাসায় ফেরার চেষ্টা করে। সবারই লক্ষ্য থাকে যে পরিবারের সঙ্গে যেন তারা ইফতার করতে পারে। এ কারণে গাড়ির প্রচণ্ড চাপ থাকে। প্রচণ্ড চাপের মাঝে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হয়।
রাস্তায় দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলছিলেন, ডিউটির সময় খারাপ লাগে তবে আমি হয়তো একটা মানুষ কষ্ট করছি; কিন্তু আমার জন্য অন্তত ১০০ গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। এই মানুষগুলো তো তাদের বাসায় গিয়ে পৌঁছে পরিবারের সাথে ইফতার করবে সেটাও আমরা মাথায় রাখি। যেহেতু আমার কাঁধে দায়িত্ব।
ডিউটির মধ্যে অটোরিকশা সামাল দেওয়া অনেক চ্যালেঞ্জিং। তাদের কারণে সড়কে অল্পতেই যানজট লেগে যায়। তিনি বলছিলেন, অটোরিকশাগুলো হুট করে প্রধান সড়কে চলে আসে। এ কারণে যানজট তৈরি হয়। এই অটোরিকশা সামাল দিতে আমরা হিমশিম খেয়ে যাই। মূলত রমজান মাসে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ কষ্টকর হয়ে যায় জনবল সংকটের কারণে।
তিনি জানান, ঢাকায় তিন কোটি মানুষের জন্য পুরো শহরে মাত্র ৪ হাজার ট্রাফিক সদস্য কাজ করেন। যা অনেক কম বলে মনে করেন তিনি। কিন্তু তবুও তাদের দায়িত্ব পালন করতে হয়।

কষ্ট হোক তবুও চাই সকলে বাসায় গিয়ে যেন ইফতারি করে
ট্রাফিক বিভাগে অনেকদিন ধরেই কাজ করছেন গুলশানের ট্রাফিক জোনের সার্জেন্ট কেএম সাদ্দাম হোসেন।
তিনি জানান, তাদের ডিউটি শুরু হয় সকাল সাড়ে ৬টা থেকে। আবার দুপুরের পরও শুরু হয় আরেক টিমের। কিন্তু দুপুরের পর থেকে বিকেল অর্থ্যাৎ ইফতারি পর্যন্ত প্রচণ্ড চাপ থাকে সড়কে। ফলে এই সময়টুকুতে তাদের দম ফেলার ফুরসত থাকে না। ডিউটি পালন করতে গিয়ে গলা শুকিয়ে যায়, পিপাসা লাগে, শরীর ঘেমে যায়, ক্লান্তিবোধ লাগে কিন্তু রাস্তা ছাড়তে পারেন না তারা। এর বাইরেও বাড়তি ডিউটি করতে হয়।
তিনি বলছিলেন, আমরা চাই যে সবাই নির্বিঘ্নে ঘরে ফিরে ইফতারি করুক। আমাদের কষ্ট হোক। অন্তত শহরের প্রত্যেকটা মানুষ সঠিক সময় যেন তাদের বাসায় গিয়ে পৌঁছে পরিবারের সঙ্গে ইফতরিটা করতে পারে। এজন্য আমাদের ওপর থেকে নির্দেশ আছে। কমিশনার স্যার বলেছেন যে, তোমাদের যত কষ্টই হোক না কেন তোমরা রাস্তা ছাড়বা না এবং রাস্তায় থেকে তোমরা দায়িত্ব পালন করবা।
তিনি আরও বলেন, আমাদের অন্য সময়গুলোতে বেশি কষ্ট হয়। বিশেষ করে মার্চ-এপ্রিলের দিকে যখন রমজান হয় তখন আমাদের রাস্তায় থাকাটা বেশ কষ্টকর হয়। কিন্তু এবার সেই কষ্টটা খুব একটা না হলেও শেষ দিকে গিয়ে শরীর খুব ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে। আর এটা তো মেনে নিয়েই আমাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। যেহেতু আমরা এই বিভাগে কাজ করি। আমরা চাই সবাই মিলে সবার কষ্টের মাধ্যমে এই দেশটাকে এগিয়ে নিতে।

ট্রাফিক সদস্যদের ইফতারে থাকে না পুষ্টিকর খাবার
গুলশান ট্রাফিকের সদস্যরা ছাড়াও ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকার ট্রাফিক সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে ট্রাফিক সদস্যদের জন্য এখন রমজানে ইফতারির যে বরাদ্দ থাকে তা পর্যাপ্ত নয়। সেই ইফতারিতে থাকে না কোনো পুষ্টিকর খাবার। একজন ট্রাফিক সদস্যের ডিউটি পালনকালে যে ডিহাইড্রেশন হয় তা পূরণ না হলে শরীর ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে যায়। আর সেই দুর্বল শরীর নিয়ে পরদিন আবারও ডিউটি করা কঠিন হয় তাদের জন্য।
তারা আরও জানিয়েছেন, তারা প্রতি বছর ডিএমপি থেকে ইফতারির জন্য যে বরাদ্দ পান তা দিয়ে তাদের মানসম্মত পুষ্টিকর খাবার সেই ইফতারে থাকে না। তারা প্রতি রমজানে প্রতিটি ট্রাফিক সদস্যদের জন্য পুষ্টিকর ইফতার ও ডিউটির জন্য বাড়তি ইনসেনটিভ দেওয়ার প্রয়োজন বলে মনে করেন।
গুলশানের ট্রাফিক এডিসি জিয়াউর রহমান বলেন, আমাদের প্রতিটি সদস্য সড়কে ডিউটিকালে অনেক কষ্ট করেন। বেশির ভাগ সময় তারা রমজানে ডিউটি চলাকালে ইফতারিটাও করতে পারেন না। শুধুমাত্র পানি মুখে দিয়েই ডিউটি চালিয়ে যান।
এমআইকে/এফএ

