সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

দুই প্রতিমন্ত্রীর পিএস: একজন আওয়ামী ঘরানার, অপরজন পরকীয়ায় অভিযুক্ত

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:২৭ পিএম

শেয়ার করুন:

দুই প্রতিমন্ত্রীর পিএস: একজন আওয়ামী ঘরানার, অপরজন পরকীয়ায় অভিযুক্ত
মাহবুবুর রহমান রুমন ও মো. সারোয়ার সালাম। ছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর মন্ত্রীদের একান্ত সচিব (পিএস) ও সহকারী একান্ত সচিবসহ (এপিএস) গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগাতে দৌড়ঝাপ শুরু করেছেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনে জড়িত কর্মকর্তারা। এমনকি নারী কেলেঙ্কারি ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিভাগীয় শাস্তি পাওয়া বিতর্কিত কর্মকর্তারাও গুরুত্বপূর্ণ পদে পাচ্ছেন। যা নিয়ে খোদ প্রশাসনের অভ্যন্তরে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

বিমান প্রতিমন্ত্রীর পিএস ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’র নেতা


বিজ্ঞাপন


তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারে বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। তার একান্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ৩৬তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান রুমন। অভিযোগ আছে, এই কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ সমর্থিত সংগঠন ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ (আমুস)-এর কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। গত বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়েছে।

অভিযোগ আছে, সরকারি কর্মকর্তা হলেও বিমান প্রতিমন্ত্রীর পিএস হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া এই কর্মকর্তা বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব ছিলেন। ২০২৪ এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময়ে আন্দোলনের বিরুদ্ধে ফেসবুকে সক্রিয় ছিলেন তিন।

picture
বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের পিএস মাহবুবুর রহমান রুমন।

 


বিজ্ঞাপন


আন্দোলনের সময় বিসিএস-৭১ নামে হোয়াটসআপ গ্রুপে আওয়ামী লীগের পক্ষে এবং আন্দোলনের বিরুদ্ধে একাধিক ক্ষুদেবার্তা দেয়া হয়েছে তার পক্ষ থেকে। এছাড়া বিগত জাতীয় নির্বাচনে নিজ উপজেলায় আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণায় এবং দলীয় কার্যালয়ে বৈঠকে অংশ নিতে দেখা গেছে এই ক্যাডার কর্মকর্তাকে।

সবশেষ কর্মস্থল সাভারে ইউএনও হিসেবে পদায়ন হলেও পরে তাকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। সেখান থেকে নতুন সরকারের বিমান প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মাহবুবুর রহমান রুমন।

তবে নিজের বিরুদ্ধে আসা এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাহবুবুর রহমান রুমন। ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, ‘আমি মুক্তিযুদ্ধার সন্তান এটা ঠিক। কিন্তু যেসব কথাবার্তা বলা হয়েছে তার বেশিরভাগই বানোয়াট।এগুলো খণ্ডিত অংশ সামনে এনে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। বাস্তবতার কোনো মিল নেই। প্রফেশনাল জেলাসি থেকে এমনটা করা হতে পারে।’

সহকর্মীর সঙ্গে পরকীয়ায় শাস্তি পাওয়া কর্মকর্তা স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর এপিএস

এদিকে বিতর্কিত নিয়োগের তালিকায় আরও একজন রয়েছেন মো. সারোয়ার সালাম। তাকে বর্তমান স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিতের একান্ত সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) নিয়োগ পাওয়া এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ২০২২ সালে বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও অপর এক নারী কর্মকর্তার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তাকে ‘তিরস্কার’ সূচক লঘুদণ্ড দিয়ে বিভাগীয় মামলার নিষ্পত্তি করেছিল।

তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল যে, সারোয়ার সালাম নিজের স্ত্রীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন এবং দ্বিতীয় বিয়ে করার অনুমতির জন্য চাপ প্রয়োগ করেছিলেন। এমন একজন নৈতিক স্খলনজনিত দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত স্টাফ হিসেবে নিয়োগ পাওয়া নিয়ে অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করছেন।

picture
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিতের পিএস মো. সারোয়ার সালাম। 

ওই সময় শাস্তির কথা জানিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সারোয়ার সালামের বিরুদ্ধে বাঞ্ছারামপুরে চাকরিকালে মৌলভীবাজারের একটি উপজেলার একজন নারী কর্মকর্তার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া ও নিজের স্ত্রীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন এবং আবার বিয়ে করার অনুমতির জন্য স্ত্রীকে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে বিভাগীয় মামলা ও ব্যক্তিগত শুনানি হয়। এরপর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিবকে দিয়ে বিষয়টি তদন্ত করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা গত ১৯ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় দেখতে পায়, অভিযুক্ত কর্মকর্তা ফেনীতে কর্মরত থাকার সময় বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও অপর একজন চাকরিজীবী নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। পরে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী ‘তিরস্কার’ সূচক লঘুদণ্ড দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে একাধিকবার সারোয়ার সালামকে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিতকে টেলিফোন করলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

দফতরে দফতরে চলছে ‘ভোল্ট পাল্টানোর’ হিড়িক

সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, এদের মতো অনেক কর্মকর্তা এখন ‘ভোল্ট পাল্টিয়ে’ বর্তমান সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের আস্থাভাজন হওয়ার চেষ্টা করছেন। কেউ পরিচয় গোপন করছেন, কেউবা প্রভাবশালী লবিংয়ের মাধ্যমে মন্ত্রীদের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছেন। কেউ কেউ অতীতের সরকারের গুনকৃতন করে দেয়া ফেসবুক পোস্ট ডিলিট করে দিচ্ছেন বলেও জানা গেছে।

অন্যদিকে বিগত ১৫ বছর যারা নানা কারণে পদোন্নতি ও ভালো পদায়ন থেকে বঞ্চিত ছিলেন, প্রশাসনের এমন চিত্রে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘যেসব কর্মকর্তারা আওয়ামী লীগের পুরো আমলে দাপটের সঙ্গে ছিলেন, ভালো পোস্টিং পেয়েছেন এখনও তারাই সুযোগ করে নিচ্ছেন। পেশাদার কর্মকর্তারা আকর্ষনীয় পদগুলোতে যেতে পারছেন না।’

বিইউ/এআর

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর