বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

বিএনপি সরকারের নতুন যাত্রা, সামনে প্রত্যাশা ও চাপের দ্বৈরথ

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৪২ পিএম

শেয়ার করুন:

বিএনপি সরকারের নতুন যাত্রা, সামনে প্রত্যাশা ও চাপের দ্বৈরথ
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর স্বাক্ষর করছেন তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত
  • দলীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে অর্থনীতি, সামনে বহুস্তর চ্যালেঞ্জ
  • বৈদেশিক সম্পর্ক নিয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখার পরামর্শ
  • চ্যালেঞ্জগুলো সাধারণ কোনো নতুন সরকারের মতো নয়
  • অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বাস্তবমুখী পদক্ষেপের আহ্বান

নির্বাচনের পর দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন সরকারের সামনে একগুচ্ছ জটিল চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হবে।


বিজ্ঞাপন


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্যরা আজ শপথ গ্রহণ করেছেন। একই দিনে ৪৯ জন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীও দায়িত্ব নিতে শপথ নেন। নতুন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো বিএনপি নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের কার্যক্রম। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, যিনি এবারই প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন এসেছে। একই সঙ্গে গণভোটে উচ্চমাত্রার অংশগ্রহণ ও হ্যাঁ ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নতুন সরকারের ওপর অতিরিক্ত প্রত্যাশা তৈরি করেছে। সে কারণে এই সরকারের চ্যালেঞ্জগুলো সাধারণ কোনো নতুন সরকারের মতো নয়।

আরও পড়ুন: ভেঙে দেওয়া হলো অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার গঠনের পর দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি দলে তৃণমূল পর্যায়ে নানা প্রত্যাশা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। সেই প্রত্যাশা সামাল দিয়ে প্রশাসন ও দল পরিচালনায় ভারসাম্য রক্ষা করা হবে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।


বিজ্ঞাপন


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দলকে সুশৃঙ্খল রাখা জরুরি। নিয়োগ-বদলি কিংবা প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে একক দলীয় আধিপত্যের ধারণা তৈরি হলে জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে চাঁদাবাজি ও অনিয়ম দমনে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তাঁরা তুলে ধরেন। বিরোধী দলে শক্ত অবস্থানে থাকা জামায়াত সংসদ ও রাজনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তাঁরা।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তাৎক্ষণিক চাপের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম মনে করেন, রমজান সামনে রেখে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা সরকারের প্রথম পরীক্ষা। এরপর বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আস্থা পুনর্গঠন এবং রাজস্ব ব্যবস্থার দুর্বলতা কাটানোও অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত বলে মত দেন তিনি।

tarek

নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ভয়েস ফর রিফর্ম-এর সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর বলেন, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার কেন্দ্রে রয়েছে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অবসান। এ ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান না নিলে হতাশা বাড়তে পারে। কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং সংস্কার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখার দিকেও তিনি গুরুত্ব দেন।

সংস্কার ইস্যুতে মতভেদের আভাসও মিলছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ, জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি, সংবিধান সংস্কার, গণপরিষদের কার্যক্রম এবং উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্বের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বৈদেশিক সম্পর্ক নিয়েও সতর্ক দৃষ্টি রাখার পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক কূটনীতিক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম। তাঁর মতে, আঞ্চলিক কূটনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখা নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।

tarek

এদিকে, নবনির্বাচিত সরকারের প্রতি অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে দ্রুত ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ডিসিসিআই। এক বার্তায় সংগঠনটি জানায়, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতার কারণে বিনিয়োগ ও রপ্তানিতে কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, বন্দর ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়, এনবিআর সংস্কার, জ্বালানি প্রাপ্যতা, ঋণপ্রাপ্তি সহজীকরণ এবং সুদের হার যুক্তিসংগত পর্যায়ে আনার ওপর জোর দেয় ডিসিসিআই।

আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী হয়েই ভারত সফরের আমন্ত্রণ পেলেন তারেক রহমান

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রাপথ নিয়েও আলোচনা রয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন দেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও এবারই প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রেই তাঁর জন্য নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রায় ১৭ বছর প্রবাসজীবন কাটানোর পর দায়িত্ব গ্রহণ এবং ভোটার হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হওয়াকে অনেকেই রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।

সব মিলিয়ে রাজনৈতিক প্রত্যাশা, অর্থনৈতিক চাপ এবং সংস্কার বাস্তবায়নের সমন্বয়ে নতুন সরকারের সামনে পথচলা শুরু হলো এক জটিল বাস্তবতায়। এখন নজর থাকবে সিদ্ধান্ত, অগ্রাধিকার ও বাস্তবায়নের ওপর।

এমআর/এআর

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর