মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

দেশজুড়ে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় উদ্বেগ

মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশিত: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:০২ পিএম

শেয়ার করুন:

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় সারাদেশে উদ্বেগ
নাটোরে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার একটি চিত্র। এই ঘটনায় আহত হন ৩৭ জন। ছবি: সংগৃহীত
  • সারাদেশে আহত দুই শতাধিক
  • বেশির ভাগ হামলার শিকার প্রতিপক্ষ
  • বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির নিন্দা ও প্রতিবাদ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন ভোট গ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হলেও পরদিন থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। ভোট-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে বাড়িঘরে হামলা, মারধর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় অন্তত তিনজন নিহত ও দুই শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।


বিজ্ঞাপন


হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় অন্তত ৩০ জেলায় ২০০টির বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। খুলনা, কক্সবাজার, পঞ্চগড়, দিনাজপুর, রংপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, ময়মনসিংহ, বাগেরহাট, ঝিনাইদহ, কিশোরগঞ্জ, মেহেরপুর, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, কুমিল্লা ও ঠাকুরগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব ঘটনা ঘটে

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা ও হামলা

নির্বাচন শেষ হওয়ার পর থেকেই দেশজুড়ে সহিংসতার খবর আসছে। কুয়েটের ভিসি থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষার্থী এবং ভিন্নমতের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনের পরদিন নোয়াখালীর হাতিয়ায় এনসিপি প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে তুলে নেওয়ার পর তাঁর স্ত্রীকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ওই নারীকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে তাঁর স্বামীর এখনো কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

picture


বিজ্ঞাপন


খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির কার্যালয়ে গিয়ে একটি পক্ষের লোকজন জড়ো হয়ে ভিসির ওপর হামলা, জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা ও হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি আলোচনায় এলে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা সংশ্লিষ্ট পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। পরে ছাত্রদল দাবি করে, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের কোনো কমিটি নেই এবং তারা এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে।

দিনাজপুরে ছেলের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে এক বাবাকে মারধর ও বাড়ি পোড়ানোর হুমকির অভিযোগ উঠেছে। ১৪ ফেব্রুয়ারি রাতে দিনাজপুর সদর উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর কর্মপরিষদ সদস্য ও শ্রমিক কল্যাণ সভাপতি জুয়েল রানার বাসায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ ঘটনায় জামায়াতে ইসলামী উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

পঞ্চগড়ে বিএনপি কর্মীদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের অভিযোগ এনেছেন এনসিপির সার্জিস আলম। রংপুরের পীরগাছায় এনসিপি থেকে নির্বাচিত এমপি আকতার হোসেন তাঁর নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও বাড়িঘর ভাঙচুরের অভিযোগ তুলেছেন।

ফেনীর ফুলগাজীতে জামায়াত নেতার দোকানে হামলা, নোয়াখালীর সেনবাগে অতর্কিত হামলা, উখিয়ায় সংঘর্ষ, কুড়িগ্রামে কুপিয়ে জখম, খুলনায় এক শিক্ষার্থীর বাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন স্থানে হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাগেরহাটে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের ওপর হামলায় ২০ জন আহত হওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। গোপালগঞ্জ, বগুড়া, চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, সন্দ্বীপ ও দিরাইসহ বিভিন্ন এলাকায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৩ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এসব ঘটনা ঘটেছে। অনেক ঘটনায় থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়নি বলেও জানা গেছে।

নাটোরে একাধিক হামলা, মাছ লুট ও গুলির ঘটনা

নির্বাচনের তৃতীয় দিনে নাটোরে একাধিক সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা ঘটে। নলডাঙ্গায় মৎস্যচাষী হামিদুল ইসলামকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। গুরুদাসপুরে পৃথক হামলায় তিনজন আহত হন। সিংড়ায় এক নারী কর্মীর আঙুল ভেঙে দেওয়ার অভিযোগে একজনকে আটক করেছে পুলিশ।

সিংড়ায় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আলতাব হোসেনকে মারধরের অভিযোগ ওঠে যুবদল নেতার বিরুদ্ধে। আহত আলতাব হোসেন অভিযোগ করেন, অতর্কিত হামলা চালিয়ে তাঁর পুকুরের মাছ বিক্রির লক্ষাধিক টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং তিনি মামলা করবেন।

বড়াইগ্রামে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হন এবং কয়েকটি বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়। গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। নাটোর জেলায় দিনভর সংঘর্ষে অন্তত ৩৭ জন আহত হয়েছেন এবং সাতজনকে আটক করেছে পুলিশ।

picture

এ ছাড়া বাগেরহাট, ময়মনসিংহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও মেহেরপুরেও সংঘর্ষ, প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় প্রতিবাদ ও উদ্বেগ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-পরবর্তী সময়ে সহিংসতার ঘটনায় বিভিন্ন ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংস্থা উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে।

ইলেকশন ওয়ার্কিং অ্যালায়েন্সের প্রধান মো. শরিফুল আলম জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, নির্বাচনের দিন ও পরবর্তী দুই দিনে সারাদেশে ২১০টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৫৩ শতাংশ শারীরিক হামলা, ১৪ শতাংশ বাড়িঘর ও অফিসে হামলা, ১৩ শতাংশ হুমকি, ১০ শতাংশ অগ্নিসংযোগ এবং ১০ শতাংশ অন্যান্য সহিংসতা।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র সারাদেশে ঘটে যাওয়া সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংযম প্রদর্শন ও কর্তৃপক্ষকে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, মুন্সীগঞ্জ ও বাগেরহাটে দুজন নিহত হয়েছেন এবং দুই শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। একটি ধর্ষণের অভিযোগও উঠেছে। এটি শুধু ফৌজদারি অপরাধ নয়, মানবিক মর্যাদা ও মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান নির্বাচনের পর নিরীহ নাগরিকদের ওপর সহিংসতার অভিযোগ তুলে নিন্দা জানিয়েছেন এবং ভুক্তভোগীদের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন।

picture

জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি দেশব্যাপী সহিংসতা, প্রতিহিংসা ও দখলদারিত্বের রাজনীতির নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, এটি সংগঠিত শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েমের চেষ্টা।

৩৭ জন বিশিষ্ট নাগরিক নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই দিন ডাকসু নেতারাও সংবাদ সম্মেলন করে ভিন্নমতের ভোটারদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানান।

পুলিশ সদর দফতরের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এমআইকে/এআর

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর