সংস্কারের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে তার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের সভাপতি জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, ‘অতীতের মতো বর্তমান সময়েও সংস্কার শব্দটি আলোচনায় এলেও তা কার্যকর উদ্যোগে রূপ নিচ্ছে না। বরং রাজনৈতিক অঙ্গীকার, শ্বেতপত্র ও কমিশনের আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকছে কাগজে-কলমে, যা দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও রাজনৈতিক অন্তর্ভু্ক্তির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীতে ‘অঙ্গীকার থেকে বাস্তবায়ন: রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
বিজ্ঞাপন
জিল্লুর রহমান বলেন, ‘রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে না পারার কারণেই আমরা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান প্রত্যক্ষ করেছি। এই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে অনেক আশা, আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই অভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকে। বিশেষ করে সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এক পর্যায়ে এমন অবস্থায় পৌঁছে যায়। যেখানে একটি সরকার, যাকে অনেকে স্বৈরতান্ত্রিক বা কর্তৃত্ববাদী সরকার বলে আখ্যা দেন, সেই সরকারের বিদায় নিশ্চিত হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘টানা পনেরো বছরে দেশে অনেক কিছু ঘটেছে। এসব ঘটনা নিয়ে মানুষের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছিল। বিশেষ করে শেষ ছত্রিশ দিনে যা ঘটেছে, তা মানুষকে ব্যথিত করেছে, ক্ষুব্ধ করেছে এবং প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে নামতে বাধ্য করেছে। কিন্তু আমরা যদি পেছনে ফিরে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব যে বাংলাদেশের বৈষম্য আসলে সর্বত্র বিস্তৃত। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য, ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রভিত্তিক বৈষম্য, অঞ্চলভেদে বৈষম্য, নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈষম্য— কোনো বৈষম্যই আমরা দূর করতে পারিনি।’
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের এই গবেষক বলেন, ‘সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থা কার্যত অনুপস্থিত। অনেক ক্ষেত্রে বিচার প্রহসনে পরিণত হয়, অনেক ক্ষেত্রে বিচার দীর্ঘসূত্রতার অজুহাতে স্থগিত থাকে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিচার আর হয় না। এই গবেষণা প্রতিবেদন ধর্মীয়, সামাজিক, গোত্রভিত্তিক ও আঞ্চলিক বিবেচনায় যাদের সংখ্যালঘু বলা হয়; তাদের বাস্তব অবস্থান বিশ্লেষণ করেছে। আমরা অনেক সময় ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটি ব্যবহার করতে চাই না। অনেক রাজনৈতিক নেতা বলেন, তারা এই শব্দ উচ্চারণ করতেই চান না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান, পাহাড় ও সমতলের বিভাজন এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বাস্তবতায় বাংলাদেশে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।’
মবের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, ‘অভ্যুত্থানের পর হিন্দু ধর্মাবলম্বী নেতৃবৃন্দ প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তখন প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে এসব সমস্যার সমাধান হবে। আইনের শাসন থাকলে এত কথা বলতে হবে না, এত কষ্ট করতে হবে না। কিন্তু আজ প্রায় সতেরো মাস পার হয়ে গেছে। নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রশ্ন তোলার অধিকার রয়েছে— আইনের শাসন আসলে কোথায় প্রতিষ্ঠিত হলো, কতখানি প্রতিষ্ঠিত হলো? আমরা বরং দেখেছি, আইনের শাসনকে রাস্তায় নামিয়ে আনা হয়েছে। মবের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। আবার ‘মব’ শব্দটি ব্যবহার করলেও কেউ কেউ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। কখনো বলা হয়, এরা মব নয়, এরা বঞ্চিত মানুষের চাপগোষ্ঠী। আবার সরকারের আরেকজন শীর্ষ আইন কর্মকর্তা বলেন, রাষ্ট্র মবকে বরদাস্ত করবে না। এই দ্বৈত অবস্থানই রাষ্ট্রের সংকটকে স্পষ্ট করে তোলে।’
বিজ্ঞাপন
বৈষম্যের প্রশ্নে শুধু ধর্মীয় সংখ্যালঘু নয়, নারীরাও গভীর বৈষম্যের শিকার মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ নারী। কিন্তু নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ কোথায়? যে দলটি নিজেকে বড় দল হিসেবে দাবি করছে, তারা মাত্র দশজন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে, তাও মূলত সংরক্ষিত আসনের বিবেচনায়। আরেকটি বড় দল, যারা নারীর অধিকার নিয়ে নানা কথা বলে, তারা একজন নারী প্রার্থীও মনোনয়ন দেয়নি। তাহলে ইনক্লুসিভিটির কথা আমরা কীভাবে বলি?’
গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রসঙ্গ টেনে জিল্লুর রহমান বলেন, ‘রাষ্ট্র যতক্ষণ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের মূল মূল্যবোধে ফিরে না যেতে পারবে, ততক্ষণ ধর্ম, পরিচয় বা জাতিগত বিভাজনে গিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। এই সংকট পুরো রাষ্ট্রের, পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার। গণতান্ত্রিক উত্তরণের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু যারা এই উত্তরণ ঘটাবেন, তারা নিজেরা কতটা গণতান্ত্রিক আচরণ করছেন, সেটাই বড় প্রশ্ন।’
সংস্কার প্রসঙ্গে জিল্লুর রহমান বলেন, ‘আমরা অতীতেও সংস্কারের কথা শুনেছি। ২০০৭-০৮ সালে সংস্কার শব্দটি একসময় ঘৃণার শব্দে পরিণত হয়েছিল। এখন আবার সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু সংস্কার কার্যত ঘুমিয়ে পড়েছে। ড. বদিউল আলম মজুমদার চেষ্টা করেছেন, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য দুর্নীতি ও অর্থপাচার নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছেন। কিন্তু বাস্তব সংস্কার কোথায়? ১৯৯১ সালে নব্বইয়ের অভ্যুত্থানের পর বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে যে টাস্কফোর্স গঠিত হয়েছিল, তারা প্রায় ত্রিশটি প্রতিবেদন দিয়েছিল। কোনো দল ক্ষমতায় গিয়ে সেই প্রতিবেদনগুলো বাস্তবায়ন করেনি। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের আগে সুন্দর ইশতেহার দেয়, কিন্তু নির্বাচনের পর সেই ইশতেহার আর খোলা হয় না।’
আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- নির্বাচনসংক্রান্ত সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের অন্যতম সদস্য, সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক ও লেখক, দীর্ঘদিন জাতিসংঘ সদর দফতরে কর্মরত ড. সেলিম জাহান, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ডিস্টিংগুইশড ফেলো এবং দেশের স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
এএইচ/এফএ

