আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রায় প্রতিদিনই শোনা যাচ্ছে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ নিয়ে হুঁশিয়ারি। কোনো নেতা বলছেন—‘একটি মহল ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করতে পারে’, আবার কেউ বলছেন—‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হলে তা মেনে নেওয়া হবে না, প্রতিহত করা হবে।’
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বাংলাদেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারাই গত কয়েক দিনে একে অপরকে ইঙ্গিত করে একাধিকবার এমন বক্তব্য দিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
তবে শুধু রাজনৈতিক দলের নেতারাই নন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনও গত বছরের মার্চে এক আলোচনা সভায় রাজনৈতিক দলগুলোকে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ ও ‘ভোট–সন্ত্রাসের চেষ্টা’ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে আখেরে ভালো হয় না।”
এমনকি বাংলাদেশে সরকারি চাকরির পরীক্ষাতেও ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে কী বোঝায়?’—এ ধরনের প্রশ্ন দেখা গেছে।
কিন্তু এই ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ আসলে কী? অতীতে কোন কোন নির্বাচনকে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগে বিতর্কিত বলা হয়? আর সেসব অভিযোগের ধরনই বা কী ছিল?

বিজ্ঞাপন
ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কী?
২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে ‘ইলেক্টোরাল ইঞ্জিনিয়ারিং: ভোটিং রুলস এন্ড পলিটিক্যাল বিহেভিয়ার’ নামে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির পলিটিক্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক পিপ্পা নোরিসের একটি বই প্রকাশিত হয়।
ব্রিটিশ আমেরিকান এই পলিটিক্যাল সাইন্টিস্ট তার বইয়ে ইলেকটোরাল ইঞ্জিনিয়ারিং কীভাবে একটি নির্বাচনে ধাপে ধাপে এর সকল স্টেকহোল্ডারদের প্রভাবিত করে সেটি লিখেছেন।
এই বইয়ে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে পিপ্পা নোরিস বুঝিয়েছেন, ‘আনুষ্ঠানিক সকল নির্বাচনি নিয়মের পরিবর্তনকেই ইলেক্টোরাল ইঞ্জিনিয়ারিং বলে। রাজনৈতিক দল, রাজনীতিবিদ এবং জনগণের কৌশলগত আচরণ পরিবর্তন করে বড় ধরনের কনসিকোয়েন্স বা পরিণতি তৈরির ক্ষমতা রাখে এ পদ্ধতি।’
অর্থাৎ এই পদ্ধতির মাধ্যমে নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে এমনভাবে প্রভাবিত করা হয় যাতে বিশেষ একটি পক্ষের জন্য পূর্বনির্ধারিত ফলাফল নিশ্চিত করা হয়।
সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন সময়ের নির্বাচনে এর প্রয়োগের উদাহরণ তুলে ধরেছেন পিপ্পা নোরিস।
কোনো কোনো দেশে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার জন্য ব্যবহৃত হলেও বেশিরভাগ সময়ই তা গণতন্ত্রকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক, রাজনৈতিক ও নির্বাচন বিশ্লেষকসহ তিনজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দেশটিতে বেশিরভাগ সময়ই ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং শব্দটি নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশে নির্বাচনকে ‘ম্যানিপুলেট’ করার জন্যেই মূলত এই প্রক্রিয়া ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে বলে জানান রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ।
ভোট গণণায় কারচুপি, ভোটার তালিকায় ভুয়া ভোটার থাকা, প্রতিপক্ষের প্রার্থীর সমর্থকদের ভোটদানে বাধা বা জোর করে ভোট দেয়া, ব্যালট বাক্স চুরি, পোলিং এজেন্টদের বাধা এরকম নানা বিষয় এই পদ্ধতিতে যুক্ত বলে জানান তিনি।
মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশে ক্ষমতাধর প্রায় সব রাজনৈতিক দলই এটা (ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং) করতে চায়। যাদের ক্ষমতা বেশি তারা পারে, যাদের ক্ষমতা কম তারা পারে না।

বাংলাদেশে প্রথম কবে এর প্রয়োগ?
বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত ২০০০ সালের পরে বাংলাদেশের নির্বাচনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং শব্দটি বেশি শোনা গেলেও নানা নামে বা ফরম্যাটে এটি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় এর আগেও দেখা গেছে।
এর আগের নির্বাচনগুলো নিয়েও কারচুপি বা সরকারের ইচ্ছামত নির্বাচনি ফলাফল তৈরির অভিযোগ রয়েছে।
তবে সেই সময় এসব ঘটনায় কারচুপি, জালিয়াতি বা ভোট চুরির মতো অভিযোগ তোলা হলেও, ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর মূলত এই ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ শব্দটি রাজনীতিবিদদের মুখে শোনা যায় বলে জানান রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ।
বিভিন্ন অভিযোগে বিতর্কিত এরকম বেশ কয়েকটি নির্বাচনের উদাহরণ নিচে তুলে ধরা হলো।

প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন
১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকেই নির্বাচনকে প্রভাবিত করার অভিযোগ রয়েছে বলে জানান বিশ্লেষকরা।
লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ, বাংলাদেশের প্রথম সংসদ নির্বাচন নিয়ে ‘তেহাত্তরের নির্বাচন’ নামে একটা বইয়ে খন্দকার মোশতাককে জেতাতে আওয়ামী লীগ তখন কী করেছিল তার বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।নির্বাচনের সময়ের পত্রিকাগুলোর খবর ও তথ্য বিশ্লেষণ করে এ নিয়ে তথ্য উপাত্ত তুলে ধরেছেন তিনি।
নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে সরকার গঠন করতো এতে কোনো সন্দেহ ছিল না।
কিন্তু এরপরও সেই নির্বাচনে সারাদেশে ব্যাপক অনিয়ম-কারচুপির ঘটনা ঘটেছিল। এমনকি, একজন প্রার্থীকে জেতাতে হেলিকপ্টারে করে ব্যালট পেপার ঢাকায় নিয়ে আসার মতো ঘটনাও ঘটেছিল।
১৯৭৩ সালের নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয় তৎকালীন কুমিল্লা-৯ আসনের নির্বাচনকে। ওই নির্বাচনে কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়েছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। তিনি বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরে ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট শেখ মুজিবকে স্বপরিবারে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ।
মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, দাউদকান্দির রশিদ ইঞ্জিনিয়ার খুব জনপ্রিয় নেতা ছিল। অপরদিকে খন্দকার মোশতাকের ইমেজ অতটা ভালো ছিল না। ভোটের দিন খবর আসতে শুরু করলো খন্দকার মোশতাক বিপুল ভোটে হেরে যাচ্ছেন। এই খবর পেয়ে তখন কুমিল্লা থেকে ব্যালট বাক্স ঢাকায় নির্বাচন অফিসে নিয়ে আসা হয়।
এই গবেষক বলেন, ভোটের দিন এটা যখন স্পষ্ট হতে শুরু করে যে খন্দকার মোশতাক আহমেদ জিতবেন না, তখন ব্যালট পেপার সেখানে গুনতেই দেওয়া হয়নি। সব ব্যালট নিয়ে আসা হয় ঢাকায়।
ভোটের পর নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক ফলাফলে দেখা যায়, খন্দকার মোশতাক আহমেদ ৫২ হাজার ৪১৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আর তার বিপরীতে মি. রশিদের ভোট ছিল ৩৬ হাজার ৬৩০।
কুমিল্লার এই আসনের নির্বাচনটি যে কারণে বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আলোচিত ও সমালোচিত ঘটনা ছিল। ১৪টি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে ওই নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছিলেন, ওই নির্বাচনের পরে জাসদসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ভোট কারচুপির অভিযোগ তোলে।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর প্রথম নির্বাচনটি এমনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে তা কেউ ভাবেনি। যে কারণে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাহীনতা সেই শুরু থেকেই জন্ম নিয়েছে।
অর্থাৎ ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং নাম ধারণ অনেক পরে হলেও ভিন্ন ফরম্যাট বা নামে নির্বাচনকে প্রভাবিত করা হয়েছিলো অতীতেও।

গণভোট নিয়েও প্রশ্ন
বাংলাদেশে মোট যে তিনটি গণভোট হয়েছে তার প্রথম দুটিকে বলা হয় প্রশাসনিক গণভোট আর তৃতীয়টিকে বলা হয় সাংবিধানিক গণভোট।
এর কারণ হলও প্রথম দুটিতে দেশের দুই সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ হ্যাঁ-না ভোট করে নিজেদের শাসন কাজের বৈধতা নিয়েছেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যার পরে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসেন তৎকালীন আর্মি চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। তখন একই সাথে তিনি রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান এবং সামরিক শাসকের ভূমিকায় ছিলেন। কিন্তু এই অবস্থানের বৈধতা দেওয়ার জন্য ১৯৭৭ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি নিয়োগের বৈধতার জন্য প্রথম হ্যাঁ, না এর গণভোট আয়োজন করেন তিনি।
ওই ফলাফল অনুযায়ী, জিয়াউর রহমানের পক্ষে হ্যাঁ-তে ভোট পড়েছিলো ৯৮ দশমিক ৮০ শতাংশ।
এর আগে ওই বছরের এপ্রিলে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক থেকে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন তিনি।
আর ১৯৮৫ সালে দ্বিতীয় প্রশাসনিক গণভোটে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পক্ষে হ্যাঁ ভোট পড়েছিলো ৯৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।
এ নির্বাচনে বিষয়বস্তু ছিলো – এরশাদের নীতি ও কর্মসূচির প্রতি আস্থা এবং নির্বাচন হওয়া পর্যন্ত তার রাষ্ট্রপতি পদে থাকায় জনগণের সম্মতি আছে কি-না।
সংসদ বিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ বলছেন, ওই দুটি নির্বাচনে জনগণ আসলে ভোটে অংশ নেওয়ারই সুযোগ পায়নি।
তিনি বলেন, প্রথম দুটি গণভোটেই আর্মির লোকজন বা তাদের সমর্থকরা সিল মেরে বাক্স ভর্তি করেছে। ওগুলো কোনো নির্বাচনই ছিলো না।
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাসনাত কাইয়ুম বলেন, বাংলাদেশের গণভোটের ঐতিহ্য খুবই খারাপ।
তিনি বলেন, মূলত জনগণের সম্মতি ছাড়া যারা ক্ষমতা দখল করেছিলো, তারা নিজেদের বৈধতা দিতে গণভোট প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করেছে তখন।

‘মিডিয়া ক্যু’ এর নির্বাচন
বাংলাদেশের সাবেক সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেছিলেন।
ওই নির্বাচনটিও বেশ বিতর্কিত ছিলো বলে জানান রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ।
ওই নির্বাচনটি ‘মিডিয়া ক্যু’ এর নির্বাচন বলে সমালোচিত হয়।
বিষয়টি উল্লেখ করে এই বিশ্লেষক বলেন, নব্বইয়ের আগের নির্বাচনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত ৮৬ সালের নির্বাচন। এটি মিডিয়া ক্যু এর নির্বাচন বলে চালু হয়।
কেন এই নাম ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, মিডিয়াতে দুইদিন নির্বাচনের খবর প্রচার বন্ধ করা হয়েছিলো।
এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, নির্বাচনের সময় রেডিও, টিভিতে খবর এনাউন্স করা হচ্ছিলো তখন হঠাৎ করে দুই দিনের জন্য টিভি, রেডিও বন্ধ হয়ে যায়। প্রথম দেখাচ্ছিলো যে নৌকা মার্কা জিতছে, জিতছে। তারপর ফল ঘোষণা দুই দিন টেলিভিশনে বন্ধ ছিল, তারপরে দেখা গেলো যে, জাতীয় পার্টির লাঙল খালি জিততেছে।
মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন আশির দশকে সেসময় সরাসরি ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং শব্দটি মানুষের মুখে শোনা যায়নি।
কিন্তু একই প্রক্রিয়ায় ভিন্ন নামে নির্বাচনের ফলাফল নিজের পক্ষে নিতে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে নির্বাচন প্রভাবিত করা হয়েছিলো ছিয়াশির নির্বাচনে সে কারণেই এটি মিডিয়া ক্যু এর নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত বলে উল্লেখ করেন তিনি।

‘সূক্ষ কারচুপির নির্বাচন’
বাংলাদেশে ১৯৯০ সালে সামরিক শাসক জেনারেল এইচ এম এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হবার পর থেকে ‘গণতন্ত্রে উত্তরণের’ সময়কাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এরপর থেকে বাংলাদেশে যেসব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে সেগুলোর ফলাফল নিয়ে পরাজিত পক্ষ সবসময় নাখোশ ছিল।
বড় দুটি রাজনৈতিক দল- বিএনপি ও আওয়ামী লীগ - যখন পরাজিত হয়েছে, তখন তারা নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেয়নি।
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিলো পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচন ছিল সেটি। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিল। কিন্তু এই নির্বাচনে বিজয়ী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি।
এই ফলাফল ঘোষণার পর পরপরই আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, অগণতান্ত্রিক শক্তি সূক্ষ্ম কারচুপি করেছে।
তিনি বলেন, ভোটাররা আমাদের ভোট দিয়েছে, কিন্তু চিহ্নিত অগণতান্ত্রিক শক্তি সূক্ষ্ম কারচুপি, কালো টাকা, সন্ত্রাস এবং এক অদৃশ্য শক্তির সাথে ষড়যন্ত্র করে ভোটের রায়ের ফল পাওয়া থেকে ভোটারদের বঞ্চিত করেছে।

‘পুকুর নয় সাগর চুরি: ১৯৯৬’ র নির্বাচন’
ওই নির্বাচনের পরে ১৯৯৫ সাল জুড়ে বিরোধী দলগুলোর তীব্র আন্দোলন ও বয়কটের মুখেও বিএনপি সরকার একতরফা নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় বিতর্কিত ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এক পর্যায়ে ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেন এবং ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়।
পরে ওই একই বছর নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালের ১২ জুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আসন সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে জোরালো লড়াই ছিল এই সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ১৪৬টি আসন এবং বিএনপি পেয়েছিল ১১৬টি আসন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পর বিএনপির তরফ থেকে ফলাফল মেনে নেয়া হয়নি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির তৎকালীন সদস্য একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, ইতিহাসের নজিরবিহীন কারচুপি করা হয়েছে। এ কারচুপি পূর্বপরিকল্পিত ও ষড়যন্ত্রমূলক।
যদিও সেসময় যুক্তরাষ্ট্রের এনডিআই, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিল যে নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, এই নির্বাচনকে আবার বিএনপি পুকুর নয় সাগর চুরির সাথে তুলনা করলো।

‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং: ২০০১ নির্বাচন’
২০০১ সালের নির্বাচনের ফলাফলের পরই মূলত বাংলাদেশের নির্বানি ইতিহাসে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং শব্দের ব্যবহার শুরু হয় বলে জানান বিশ্লেষকরা।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর চারদলীয় জোটের নেতৃত্বে সরকার গঠন করা হয়। ওই সময়ই প্রথম আওয়ামী লীগ সরাসরি এই অভিযোগ তুলে যে, নির্বাচনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে।
নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, স্থূল কারচুপি করে জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। জনগণ নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে, আমার মেনে নেয়ার তো প্রশ্নই আসে না।
নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন
বেশিরভাগ বিশ্লেষকরাই বলছেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য মনে করা হলেও এই নির্বাচনকে ঘিরেও বিএনপি প্রশ্ন তুলেছিলো।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিএনপির মনে প্রশ্ন ছিল। বিএনপি কেবল ৩০টি আসনে ভোট পেয়েছিল। কিন্তু তারা মনে করে তারা আরও বেশি আসন পেতো। এই ভোটেও কারচুপির অভিযোগ তোলা হয়। এই নির্বাচনের ফল পূর্ব নির্ধারিত বলে দলটি মনে করে।
এই নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কারণ মৃত ব্যক্তি, প্রবাসী ব্যক্তিদের এই তালিকায় নাম ছিল। সে সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, প্রায় দেড় কোটি ভোটারের একটি তালিকা এই অভিযোগে বাতিল করা হয়েছিল। এই নির্বাচনের পরে ১৫ বছর আওয়ামী লীগের সরকার দেশের ক্ষমতায় ছিল। এই সরকারের অধীনে পরবর্তীতে যে তিনটি নির্বাচন হয়েছিল সেগুলোকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করার অভিযোগ রয়েছে।
ফলাফলকে প্রভাবিত করতে নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ সীমানা নির্ধারণ থেকে শুরু করে ভোট অনুষ্ঠানের পর গণনা ও ঘোষণা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে এই ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন নির্বাচন পর্যবেক্ষক জেসমিন টুলি।
জেসমিন টুলি অবশ্য মনে করেন, বাংলাদেশের চারটি নির্বাচন মোটামুটি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলো। এগুলো হলো: ১৯৯১ সালের নির্বাচন, ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচন, ২০০১ সাল এবং ২০০৮ সালের নির্বাচন।

‘তামাশার নির্বাচন’
আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধানে ২০১৪ সালের নির্বাচনে এমন এক পরিবেশ দেখা যায়, যেটা একবারেই অন্যরকম।
এমনভাবে নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয় যেটা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এর বড় উদাহরণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি না মানায় এই নির্বাচন বর্জন করেছিল প্রধান বিরোধীদল বিএনপি।
এর ফলে ২০১৪ সালে পাঁচই জানুয়ারির এই নির্বাচনে দেড় শতাধিক আসনে কোনো ভোট গ্রহণ হয়নি এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সেসব আসনে নির্বাচিত হয়ে গিয়েছিলেন। সেসময় ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের অনুপস্থিতি ছিলো লক্ষণীয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ জানান, এই নির্বাচনটি ‘তামাশার নির্বাচন’ বলে বেশি পরিচিত।
নির্বাচন পর্যবেক্ষক জেসমিন টুলি বলেন, এই নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন গ্রহণযোগ্যতা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি ওই ইসি।

‘রাতের ভোট: ২০১৮ নির্বাচন’
দিনের ভোট রাতে ব্যালট বাক্সে ভরে রাখার মতো নজীরবিহীন ঘটনা ঘটে ২০১৮ সালের নির্বাচনে। অথচ ২০০৮ সালের পর এই নির্বাচনে সকল রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছিল। তবে নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় জামায়াতে ইসলামী এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।
নির্বাচন পর্যবেক্ষক জেসমিন টুলি বলছেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে শুরু করে সব স্টেকহোল্ডারদেরকে ইনভলভ করার অভিযোগ ছিল।
ভোটের আগের দিন রাতেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ভোটকেন্দ্র দখল করার নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে এই নির্বাচনে। বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র থেকে আগের রাতেই গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে ভোট দিয়ে ব্যালট বাক্স ভরে রাখার অভিযোগ আসতে শুরু করে।
ভোটের দিন ৩০ ডিসেম্বর সকালে অনেক স্থানে এসব অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পেয়েছিলেন বিবিসি বাংলার সংবাদদাতারা।
জেসমিন টুলি বলেন, এই নির্বাচনে যে অস্বাভাবিক ব্যাপারগুলো ঘটেছে যেমন: একটা দলের প্রচারণা ছাড়া অন্য কোনো দলের প্রচারণা নেই, প্রার্থীদের এজেন্টদের মারধর, ভোটকেন্দ্রে যেতে না দেওয়া, বিএনপি ও তাদের জোট প্রার্থীদের ওপর হামলা, ইসিতে অভিযোগ দিলেও ব্যবস্থা না নেওয়াটাই প্রমাণ করে অনিয়মের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান ছিল না নির্বাচন কমিশনের।
রাতে ব্যালট বাক্স ভরে রাখা নিয়েও কোনো প্রশ্ন তোলেনি নির্বাচন কমিশন, যা তাদের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকাকে ইঙ্গিত করে বলে মনে করেন জেসমিন টুলি।
‘আমি আর ডামি: ২০২৪ নির্বাচন’
সব পর্যায়ে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এর নজির দেখা গেছে ২০২৪ সালের নির্বাচনে।
এই নির্বাচনে কিংস পার্টি শব্দটি পরিচিত হয়ে ওঠে। সেসময় তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি নামে ছোট তিনটি দল ইসির অনুমোদন পায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির অনুপস্থিতি পূরণ করতেই সুপরিকল্পিতভাবে তা করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপি বর্জন করায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে তাদেরই স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড়ায়। শেখ হাসিনা নিজে বলেছিলেন, আপনারা ডামি প্রার্থী দিন। পরে চালু হয়ে যায় আমি আর ডামির নির্বাচন।
স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তৎপরতা সবচেয়ে বেশি ছিল এই নির্বাচনে।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অনুপস্থিতি এবং ভোটার উপস্থিতির হারের কারণে বিতর্কিত হয় এই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সূত্র: বিবিসি বাংলা
/এএস

