বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

ভোট নিয়ে এখনো কেন জনমনে সংশয়?

ঢাকা মেইল ডেস্ক
প্রকাশিত: ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:২৪ পিএম

শেয়ার করুন:

ভোট নিয়ে এখনো কেন জনমনে সংশয়?
জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারি (ফাইল ছবি)

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আর মাত্র তিন সপ্তাহ বাকি। কিন্তু এখনো যে প্রশ্ন অনেকের মুখেই শোনা যাচ্ছে, তা হলো- নির্বাচনটি আসলে হবে তো?

নির্বাচন কমিশন বা ইসির ঘোষিত সময়সীমা অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি এই নির্বাচন হওয়ার কথা এবং আজ বুধবার প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ শেষে বৃহস্পতিবার থেকেই অংশগ্রহণকারী দল ও প্রার্থীদের পুরোদমে নির্বাচনী প্রচারে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা।


বিজ্ঞাপন


এর মধ্যেই আড্ডা-আলোচনা-কিংবা ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় ঘুরে ফিরেই অনেকে প্রশ্ন করছেন যে –'নির্বাচন আসলে হবে কি-না'। সংবাদকর্মীদের অনেককেই গত কয়েক দিন ধরে এ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে পরিচিত- অপরিচিত অনেকের কাছ থেকেই।  

 


বিজ্ঞাপন


বিশ্লেষকরা কেউ কেউ বলছেন, সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে শুরু থেকেই যে ধরনের শৈথিল্য দেখা গেছে সেটি পুরোপুরি কাটেনি বলেই এ সংশয় জনমনে তৈরি হয়েছে।

আবার কেউ এটিকে পুরোপুরি ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও এর সমর্থকদের গুজব বা প্রোপাগান্ডা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আবার কেউ বলছেন, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে নির্বাচনি সহিংসতা হলে সেটিও নির্বাচন বানচালের আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।

ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম আজ বুধবার বলেছেন, ‘পতিত স্বৈরাচারের দোসররা দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে কনফিউশন (সংশয়) ছড়াতে ব্যস্ত রয়েছে’।

এর আগে সোমবার শফিকুল আলম বলেছিলেন, ‘নির্ধারিত দিনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং তা খুব সুন্দরভাবে সম্পন্ন হবে বলে সরকার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে’। 

Vote_bangladesh_iii
নির্বাচন কমিশন ১২ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য ভোট গ্রহণের দিন ধার্য করে তফসিল ঘোষণা করেছিল গত ১১ ডিসেম্বর (ফাইল ছবি)

 

সংশয়ের কারণ কী
নির্বাচন কমিশন ১২ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য ভোট গ্রহণের দিন ধার্য করে তফসিল ঘোষণা করেছিল গত ১১ ডিসেম্বর। এরপর থেকে সরকার ও নির্বাচন কমিশন ধারবাহিকভাবে নির্বাচন আয়োজনের নানা পদক্ষেপ নিয়ে আসছে।

কিন্তু এরপরেও 'নির্বাচন আসলেই হবে কি না'- এই প্রশ্ন যারা করছেন তাদের কয়েকজন জানিয়েছেন যে 'আইনশৃঙ্খলা ও সার্বিক পরিবেশ পরিস্থিতি' থেকে তারা এমনটি অনুমান করছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচনের জন্য যে ধরনের তৎপরতা প্রত্যাশা করা হয় সেটি তাদের চোখে এখনো তৈরি হয়নি।

এমন প্রশ্ন কর্তাদের দুই-একজন বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে 'সরকারের আনুকূল্য পাওয়া' দলগুলো নির্বাচন ঠিক মতো হতে দেবে বলে তারা মনে করেন না। 

অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের অগাস্টে দায়িত্ব নেওয়ার পর সংস্কারের জন্য যে আলোচনা করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে, তাতে সক্রিয় ছিলেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম।

হাসনাত কাইয়ুমও বলছেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার যেসব সংগঠনকে আনুকূল্য দিয়েছে তাদের হম্বিতম্বিও এমন ধারণা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। যদিও নির্বাচনের আগে এগুলো অস্বাভাবিক নয়। আমি আশা করি সরকার যথাসময়েই নির্বাচনটি আয়োজনে সফল হবে’।

তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে এবং মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারায় নির্বাচনের সময় সহিংসতার আশঙ্কা আছে অনেকের মধ্যে। যদিও আজ আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, ‘আমাদের সবকিছুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এই মুহূর্তে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং যে প্রস্তুতি রয়েছে, তাতে একটি সুন্দর নির্বাচন সম্ভব’।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দীন আহমদ বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কাদা ছোড়াছুঁড়ির কারণেই অনেকের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।

মহিউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘ইউনূস সাহেব ক্ষমতায় থাকতে চান এমন প্রচারও আছে। যদিও আমার তা মনে হয় না। তবে জুলাই অভ্যুত্থানে যাদের পতন হয়েছে তারাও অন্তর্ঘাতের চেষ্টা করতে পারে। গুজব ছড়াতে পারে। আবার নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কাও আছে কারণ প্রশাসন ও পুলিশকে এখনো ততটা সক্রিয় মনে হচ্ছে না। সব মিলিয়েই অনেক মানুষের মধ্যে সংশয়টি দেখা যাচ্ছে’। 

 

যদিও প্রধান উপদেষ্টার দফতর জানিয়েছে, আজ বুধবারের বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা নিজেই '১২  ফেব্রুয়ারি কোথাও যেন কোনো গলদ না থাকে' সেই নির্দেশনা দিয়েছেন।

তবে রাজনৈতিক দলগুলোর তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন নিয়ে কোনো সংশয়ের কথা বলা হয়নি। বিশেষ করে মনোনয়নপত্র দাখিল-প্রত্যাহার পর্ব শেষে প্রতীক বরাদ্দের পর প্রচার শুরুর চূড়ান্ত ধাপে অংশগ্রহণকারী দলগুলো তাদের করণীয় নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইতোমধ্যেই বলেছেন, তার দল বিশ্বাস করে নির্বাচন কমিশন যোগ্যতার সঙ্গেই আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবে।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমানের ঢাকার বাইরের সভা সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে নিজ নিজ দল থেকে। ঘোষণা অনুযায়ী, তারেক রহমান সিলেট থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করতে যাচ্ছেন, আর শফিকুর রহমান শুরু করছেন উত্তরবঙ্গ সফর দিয়ে। 

image
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনকে ঘিরে ভুয়া খবর ও পরিকল্পিত বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা চলছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কূটনীতিকদের কাছে উল্লেখ করেছিলেন (ফাইল ছবি) 

নির্বাচন নিয়ে এসব অগ্রগতি সত্ত্বেও 'নির্বাচনটি আসলে হবে কি-না' এই প্রশ্ন কমছে না। এর আগে মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছিলেন, ‘যারা নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন, তাদের অনেকের পেছনের ইতিহাস আমরা জানি। তারা গত সাড়ে ১৫ বছরে কী পরিমাণ দালালি করেছেন, সেটা আমাদের অজানা নয়’।

শফিকুল আলম বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে সরকারের অবস্থান একেবারে পরিষ্কার। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের ১২ তারিখেই নির্বাচন হবে। নির্বাচনের একদিন আগেও হবে না, একদিন পরেও হবে না। নির্ধারিত দিনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং তা খুব সুন্দরভাবে সম্পন্ন হবে বলে সরকার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে’। 

এর আগে গত ১৪ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের দুই সাবেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক অ্যালবার্ট গম্বিস ও মর্স ট্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে নিজেও বলেছেন, ‘কে কী বলল, তা বিবেচ্য নয়। ১২ই ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন হবে, এর এক দিন আগে বা পরে নয়’।

সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসের খবর অনুযায়ী, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনকে ঘিরে ভুয়া খবর ও পরিকল্পিত বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা চলছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কূটনীতিকদের কাছে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি তাদের বলেছিলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার নির্ধারিত সময়েই নির্বাচন আয়োজন ও ফল ঘোষণার পর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ’।

কিন্তু সরকারের তরফ থেকে বারবার আশ্বস্ত করার পরেও নির্বাচন নিয়ে অনেকের মধ্যে সংশয়ের মূল কারণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিই বলে মনে করেন হাসনাত কাইয়ুম। তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে এমনিতে নির্বাচন প্রতিষ্ঠান হিসেবে নাই হয়ে গেছে, আবার অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকলে বিভিন্ন জায়গা থেকে এমন নানা ধরনের প্রোপাগান্ডাও দেখা যায় ।

‘তবে সরকারের আচরণের মধ্যে সমস্যা আছে। বিশেষ করে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকারের যে ধরনের উদ্যোগ থাকার কথা সেখানে শৈথিল্য আছে। আইনশৃঙ্খলার ঘাটতির পাশাপাশি মবের সিদ্ধান্ত যেভাবে সিদ্ধান্ত আকারে নেওয়া হয়, তাতে করে সন্দেহটাই জোরদার হয়। সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তির বিভিন্ন ধরনের অবস্থানের কারণে এসব সংশয় বাড়ে।’ বলছিলেন হাসনাত।

অন্যদিকে মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন যে, নিরাপদ পরিস্থিতি তৈরি না হলে অনেক ভোটারই কেন্দ্রে যাবেন না এবং সে কারণেই সংশয় প্রকাশ করছেন কেউ কেউ। 

মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘নির্বাচনে গুণ্ডামি মাস্তানির আশঙ্কা থাকলে মানুষ যাবে কেন। আর নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা তো আছে এখনো। কারণ পুলিশ ও প্রশাসন এখনো যথাযথ সক্রিয় নয় বলেই লোকজন মনে করছে। তবে নির্বাচনী প্রচার শুরু হলে নির্বাচন সহায়ক পরিবেশ তৈরি হবে বলে আশা করি’। 

তবে আজ বুধবার (২১ জানুয়ারি) আইনশৃঙ্খলা বিষয়ের বৈঠকে জানানো হয়েছে, সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় আইন শৃঙ্খলা কমিটি করা হয়েছে। নির্বাচনের দিন প্রতি কেন্দ্রে কমপক্ষে ১৫ জন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য থাকবেন।

সব মিলিয়ে ‘এবারের নির্বাচন ভবিষ্যতের জন্য আদর্শ তৈরি করবে’ বলে বুধবারের বৈঠকে উল্লেখ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। - বিবিসি বাংলা 

ক.ম/

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর