মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে ‘নগর সরকার’ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:২৭ পিএম

শেয়ার করুন:

dhaka
‘ঢাকা বাঁচানোর ইশতেহার’ শীর্ষক নগর সংলাপ

ঢাকাসহ দেশের নগরগুলোর দুরবস্থার জন্য অন্যতম কারণ সমন্বয়হীনতা ও সিটি মেয়রদের পর্যাপ্ত ক্ষমতা না থাকা। তাই ‘নগর সরকার’ গঠন করে তা শক্তিশালী করার মাধ্যমে নগরের সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন নগর বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিবিদরা। তারা আসন্ন এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে ‘নগর সরকার’ গঠন ও নগরের সমস্যাগুলো সমাধানে স্পষ্ট রূপরেখা দেওয়ার সুপারিশও করেছেন।

সোমবার (১৯ জানুয়ারি) রাজধানীর হোটেল লেকশোরে নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরাম বাংলাদেশ ও গুলশান সোসাইটি আয়োজন করে ‘ঢাকা বাঁচানোর ইশতেহার’ শীর্ষক এক ব্যতিক্রমী নগর সংলাপ। এতে অংশ নেন নগর বিশেষজ্ঞ, পরিকল্পনাবিদ, রাজনীতিবিদ, সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী, নগর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। তাদের বক্তব্যে উঠে আসে, নগরের সমস্যাগুলো সমাধানের প্রধান পথ ‘নগর সরকার’ গঠন করা।


বিজ্ঞাপন


নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মতিন আব্দুল্লাহর সভাপতিত্বে এই সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গুলশান সোসাইটির সভাপতি ব্যারিস্টার সাদাত ওমর। প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ।

প্রশাসক এজাজের মতে, সিটি করপোরেশনের বর্তমান ক্ষমতা মূলত ময়লা পরিষ্কার এবং বাতি লাগানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাই একটি ‘সিটি গভর্নমেন্ট’ বা ‘নগর সরকার’ প্রতিষ্ঠা না করা গেলে নগরের পরিবর্তন আনা কঠিন।

‘নিজস্ব পুলিশ বাহিনী না থাকায় উচ্ছেদ অভিযানগুলো টেকসই করা সম্ভব হচ্ছে না। আর ঢাকা উত্তর সিটি এলাকায় ট্রাফিক আইন ভঙ্গের জরিমানা বাবদ মাসে প্রায় ১৯ থেকে ২২ কোটি টাকা আদায় হয়। কিন্তু এই জরিমানার এক টাকাও সিটি কর্পোরেশন পায় না। এই বিশাল অংকের অর্থ সরাসরি কেন্দ্রীয় ট্রেজারিতে চলে যায়। অথচ ট্রাফিক সিগন্যাল ও অবকাঠামো উন্নয়নে সিটি করপোরেশনের শত শত কোটি টাকা খরচ করতে হয়’, বলেন তিনি।

প্রশাসক এজাজ বলেন, ‘ওয়াসা, রাজউক এবং পুলিশকে সিটি করপোরেশনের অধীনে এনে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘সিটি গভর্নমেন্ট’ প্রতিষ্ঠা করা দরকার। তা না হলে শহরের আমূল পরিবর্তন সম্ভব নয়।’


বিজ্ঞাপন


তিনি আরও বলেন, ‘এখানে জলবায়ু উদ্বাস্তু ও অভিবাসীদের জন্য ‘আরবান সেফটি’ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই হবে ভবিষ্যতের প্রধান চ্যালেঞ্জ।’

সংলাপে অংশ নেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম। তার বক্তব্যে উঠে আসে ‘নগর সরকার’ গঠনের গুরুত্ব।

আব্দুস সালাম বলেন, ‘বর্তমানে রাজউক, সিটি কর্পোরেশন এবং অন্যান্য সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে কোনো কার্যকর সমন্বয় নেই।

‘রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য গত সরকার ঢাকা সিটিকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছিল। বিগত ১৭ বছরে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে এবং এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য একটি শক্তিশালী ও নির্বাচিত সরকার প্রয়োজন। জনগণের প্রতি আহবান জানাই তারা যেন একটি নির্বাচিত সরকারকে অন্তত পর্যাপ্ত সময় দেয় এবং দ্রুত কোনো আন্দোলনে না গিয়ে ধৈর্য ধরে।’

‘নগর সরকার’ গঠনের অপরিহার্য উল্লেখ করে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘সিটি গভর্নমেন্ট ছাড়া মেয়রের পক্ষে অনেক কাজই করা সম্ভব নয়, কারণ বর্তমানে মেয়রের হাতে এমনকি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পুলিশি ক্ষমতাও নেই। ঢাকার মেয়রকে স্থানীয় সরকারের না রেখে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণাধীন শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে আসা উচিত, যাতে তিনি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।’

তিনি বলেন, ‘জাতীয় সমস্যা ও পরিবেশ রক্ষা ঢাকার ওপর জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপকে কেবল স্থানীয় সমস্যা নয়, বরং একটি জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঢাকাকে রক্ষা করতে হলে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ এবং বালু নদীকে বাঁচাতে হবে এবং এর জন্য সরকারের একটি দীর্ঘমেয়াদী মাস্টার প্ল্যান প্রয়োজন।’

তিনি জানান, ঢাকার উন্নয়নে ১০টি মূল লক্ষ্য রয়েছে বিএনপির উল্লেখ করেন তিনি যা ভবিষ্যতে তাদের রাজনৈতিক ইশতেহারেও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। 

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী (ঢাকা-১৭) ডা. এস. এম. খালেদুজ্জামান বলেন, ‘রাজনীতিবিদরা ঢাকার শহর গড়ে দেবে এটা ভুলে যান। আমাদের শহর আমরা সবাই মিলে গড়ব। এমন প্রতিনিধি নির্বাচিত করবেন না, যে কথা রাখে না।’

তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন শহর নদীর পাড় ঘেঁষে গড়ে উঠে, তেমনি আমাদের ঢাকা শহরটা কিন্তু বুড়িগঙ্গা নদীকে নিয়ে আমাদের বাপ-দাদারা স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু সেটিকে নানা অব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্তের কারনে বসবাসের অযোগ্য শহরে পৌঁছে গিয়েছি। আমরা ঢাকার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিবো। নগরবাসীকে আমাদের পাশে চাই।’

জাতীয় নাগরিক পার্টির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব বলেন, ‘আমাদের ইশতেহারে ঢাকা বাঁচাতে ১০টি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করার জন্য ঠিক করেছি। এরমধ্যে অন্যতম হলো সমন্বিত সরকার ব্যবস্থা। সিটি করপোরেশন, রাজউক, ওয়াসা, ডেসাসহ অনেকগুলো সংস্থা রয়েছে। কিন্তু তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এরজন্য সমন্বিত সরকার ব্যবস্থা দরকার।

‘এছাড়া টেকসই অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা, যত্রতত্র শিল্প কারখানা রোধ, নারীর নিরাপত্তা, সড়ক নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করার অগ্রাধিকার থাকবে ইশতেহারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমদের ঢাকার পরিধি নির্দিষ্ট করতে হবে এবং ঢাকার প্রতিটি এলাকায় সকল সুযোগসুবিধা নিশ্চিত করতে কাজ করতে হবে সরকারকে। আমরা যদি নির্বাচিত হই তাহলে এই বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করবো।’

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. মুসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, ‘বর্তমানে শহরগুলোকে নাগরিকদের পরিবর্তে ‘সিটিস ফর কনক্রিট এন্ড কার (কংক্রিট এবং গাড়ির শহর)’ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা যেখানে শিশুরা দিনের বেলায় পড়ার টেবিলে প্রাকৃতিক আলোতে পড়াশোনা করতে পারবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকায় বর্তমানে গণপরিসরের সংকট দেখা দিচ্ছে; এমনকি তেঁতুলতলার মাঠ, পাগল মাঠ এবং বনানী লেকের মতো জায়গাগুলোও হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে কমিউনিটি এঙ্গেজমেন্ট এবং পাবলিক পার্টিসিপেশন (জনগণের অংশগ্রহণ) অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।’

মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আব্দুর রব বলেন, ‘দেশে দূষিত এলাকায় বসবাস করে ৪ কোটি মানুষ। এই দূষণরোধে এলাকাভিত্তিক উন্নয়নে জোড় দিতে হবে। সবুজায়ন বাড়াতে হবে। এছাড়া একটি শহরে জলাভূমি থাকা দরকার ২৫-৩০ ভাগ। সেখানে আছে খুবই সামন্য। নদী, খাল, জলাশয় ক্রমান্বয়ে দখলের কবজায় চলে গেছে। এগুলো উদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে।’

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনে ওমর সাদাত বলেন, বায়ু দূষনে ঢাকার ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসা। শিকাগো ইউনিভার্সিটির এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট প্রকাশিত সর্বশেষ এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স অনুযায়ী বায়ু দূষণের কারণে ঢাকার গড় আয়ু কমছে সাত বছর সাত মাস। আর সারাদেশের গড় আয়ু কমছে প্রায় পাঁচ বছর চার মাস। তাহলে গড় আয়ু ৭২ বছর হলে ঢাকায় থাকলে আমরা বাঁচি মাত্র ৬৫ বছর বায়ু দূষণের কারনে। এছাড়া ৪৫ শতাংশ পানির নমুনায় ব্যাকটরিয়া,  আয়রন ও অ্যামোনিয়া পাওয়া গেছে। এছাড়া আবাসন, ফুটপাত, গণপরিবহন, যানজট, পাবলিট টয়লেট, নারীর নিরাপত্তা,  স্বাস্থ্যসেবার নানাদিক তুলে ধরেন।

সংলাপে অংশ নিয়ে বক্তব্য রাখেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, স্থপতি রফিক আজম, পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী মো. নুরুল্লাহ, গুলশান সোসাইটির সহ-সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবির, নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক হাসান ইমন প্রমুখ।

বিইউ/এএম

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর