সোমবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

ব্যাটারি রিকশা নিয়ন্ত্রণ ছাড়া চললে সংকট বাড়বে

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:০২ এএম

শেয়ার করুন:

ব্যাটারি রিকশা নিয়ন্ত্রণ ছাড়া চললে সংকট বাড়বে

ঢাকার রিকশা খাতে প্যাডেল চালিত রিকশা থেকে ব্যাটারি চালিত রিকশায় দ্রুত রূপান্তর ঘটে চললেও এই পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ ও নিবন্ধনবিহীন থাকায় নগর পরিবহন সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ব্যাটারি রিকশা চালকরা বেশি ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নামছে এবং অধিকাংশ রিকশাই নিবন্ধনবিহীনভাবে চলায় দুর্ঘটনা ও যানজটের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন।

রোববার (১৮ জানুয়ারি) রাজধানীর কারওয়ানবাজারে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসির ভবনে আয়োজিত ‘শহরে প্যাডেল রিকশা থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশার পরিবর্তন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনের উপস্থাপনকালে এসব তথ্য জানানো হয়। ইনোভেশন কনসালটিং আয়োজিত এই আলোচনা সভায় গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রুবাইয়াত সারওয়ার।


বিজ্ঞাপন


গবেষণায় উঠে এসেছে যে ঢাকার রিকশা খাতে নিবন্ধনবিহীনতার হার অত্যন্ত বেশি। ব্যাটারি রিকশার ৯৭ দশমিক ৪ শতাংশ এবং প্যাডেল রিকশার ৮৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ নিবন্ধনের বাইরে চলাচল করছে। এ অবস্থায় রাস্তায় নিয়ন্ত্রণের অভাব ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, ব্যাটারি রিকশা তুলনামূলকভাবে তরুণ চালকদের আকৃষ্ট করছে। ব্যাটারি রিকশা চালকদের গড় বয়স ৩৮ বছর, যেখানে প্যাডেল রিকশা চালকদের গড় বয়স ৪২ বছর। উল্লেখযোগ্যভাবে, ৭৫ শতাংশ ব্যাটারি রিকশা চালক আগে কখনো প্যাডেল রিকশা চালাননি, অর্থাৎ এই খাতে নতুনদের প্রবেশ দ্রুত বাড়ছে।

আর্থিক দিক থেকে ব্যাটারি রিকশা চালকদের মোট দৈনিক আয় প্যাডেল রিকশাচালকদের তুলনায় বেশি। গবেষণায় দেখা যায়, ব্যাটারি রিকশাচালকদের মোট দৈনিক আয় ৮৮০ টাকা, যেখানে প্যাডেল রিকশাচালকদের আয় ৫৯৪ টাকা। তবে ভাড়া চালিত ব্যাটারি রিকশার নিট আয় কম হওয়ায় চালকরা নিজস্ব মালিকানাধীন ব্যাটারি রিকশার দিকে ঝুঁকছেন। একই সঙ্গে ব্যাটারি রিকশার উচ্চ মূল্যের কারণে চালকদের ঋণের চাপ বেড়েছে। ব্যাটারি রিকশা চালকদের গড় ঋণের পরিমাণ ৭৯,৯২৭ টাকা, যা প্যাডেল রিকশাচালকদের তুলনায় অনেক বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাটারি রিকশাচালকরা মূলত ভাড়া ও মাইক্রোফাইন্যান্স ঋণের ওপর নির্ভরশীল।

যাত্রীদের দৃষ্টিকোণ থেকেও ব্যাটারি রিকশার জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। যাত্রীরা মূলত স্বল্প দূরত্বে, এক থেকে তিন কিলোমিটার চলাচলের জন্য রিকশা ব্যবহার করেন। ৮২ শতাংশ যাত্রী দ্রুত যাতায়াতের কারণে ব্যাটারি রিকশা বেছে নেন। তবে একই সঙ্গে তারা দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাটারি রিকশায় দুর্ঘটনার হার তুলনামূলকভাবে বেশি এবং আঘাত গুরুতর। এতে যাত্রীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।


বিজ্ঞাপন


ঢাকার যানজট নিয়েও ব্যাটারি রিকশার প্রভাব নিয়ে সতর্কতা দেখা গেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৬২ শতাংশ যাত্রী মনে করেন, ঢাকার যানজট বৃদ্ধির প্রধান কারণ অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারি রিকশা। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পক্ষে জনসমর্থন জোরালো; ৫৬.৬ শতাংশ মানুষ কঠোর নিয়ন্ত্রণের পক্ষে এবং ২১.৯ শতাংশ সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার পক্ষে। এ পরিস্থিতিতে রাস্তায় নিয়ন্ত্রণ ও নীতিমালা না থাকলে নগর পরিবহন সংকট আরও গভীর হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

গ্যারেজ মালিকদের অভিজ্ঞতাও এই পরিবর্তনের প্রভাবকে তুলে ধরছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৮৬ শতাংশ গ্যারেজ মালিকের প্রধান জীবিকা রিকশা ভাড়া। অধিকাংশ মালিক ব্যাটারি রিকশাকে বেশি লাভজনক মনে করলেও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ও মেরামতের সমস্যা তাদের বড় উদ্বেগের কারণ। গ্যারেজ মালিকদের মতে, ব্যাটারি রিকশার রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বেশি হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে এটি ব্যবসায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

গবেষণাটি ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগৃহীত ৩৮৪ জন রিকশা চালক, ৩৯২ জন যাত্রী এবং ৬৩ জন গ্যারেজ মালিকের তথ্যের উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছে।

ইনোভেশন কনসালটিং এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রুবাইয়াত সারওয়ার বলেন, ব্যাটারি রিকশার ডিজাইন মানসম্মত করা, প্যাডেল থেকে ব্যাটারিতে রূপান্তরে সহায়ক নীতিমালা গ্রহণ করা, স্বল্পসুদে ঋণের মাধ্যমে নিবন্ধন ও আনুষ্ঠানিকতা উৎসাহিত করা, চালকদের ট্রাফিক প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং স্বল্প দূরত্ব পরিবহন ও হাঁটাচলার অবকাঠামো উন্নয়ন করা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, ইনোভেশন কনসাল্টিং মনে করে অন্তর্ভুক্তিমূলক নিয়ন্ত্রণ ও পরিকল্পিত রূপান্তরের মাধ্যমে রিকশাকে ঢাকার একটি নিরাপদ ও টেকসই নগর পরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

আলোচনা সভায় ইনোভিশন কনসালটিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রুবাইয়াত সারওয়ারের সঞ্চালনায় উপস্থিত ছিলেন ট্রাফিক আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা মো. সেলিম খান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন হাসান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রোগ্রাম ম্যানেজার তাইফ হোসেন, ভয়েস ফর রিফর্মের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর, সদস্য হাসিবুদ্দিন হোসেন এবং আকিজ মোটরসের সাধারণ ব্যবস্থাপক ইফতেখার হোসেন।

এএইচ/এএস

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর