রোববার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে পুরোনো ব্যর্থ চর্চা বন্ধের আহ্বান নাগরিক সমাজে

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪১ এএম

শেয়ার করুন:

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে পুরোনো ব্যর্থ চর্চা বন্ধের আহ্বান নাগরিক সমাজে

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে পূর্ববর্তী সরকারের ব্যর্থ, অস্বচ্ছ ও জনবিচ্ছিন্ন চর্চা অনুসরণ বন্ধ করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে নাগরিক সমাজ। ২৫ বছর মেয়াদি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা ২০২৫ (ইপিএসএমপি ২০২৫) অবিলম্বে স্থগিত ও বাতিলের দাবিতে শনিবার (১৭ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে এক প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন তারা।

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রণীত খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (২০২৬–২০৫০) গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, স্বচ্ছতা ও জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত না করেই তৈরি করা হয়েছে। পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাব যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি এবং সাধারণ জনগণ ও বিশেষজ্ঞদের মতামত উপেক্ষিত হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি)-এর উদ্যোগে এবং উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন), আমরাই আগামী, ইথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ (ইটিআই বাংলাদেশ), রি-গ্লোবাল, সৌহার্দ্য ইয়ুথ ফাউন্ডেশন, সেইফটি অ্যান্ড রাইটস (এসআরএস), ওয়াটারকিপার্স এবং শ্রমিক-নেতৃত্বাধীন ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (ওয়ার্কার ক্যান) এর সহ-আয়োজনে এই প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

প্রতিবাদ সমাবেশে বিডব্লিউজিইডি’র সদস্য সচিব হাসান মেহেদী বলেন, খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজ, সাধারণ মানুষ ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। কোনো ধরনের জনশুনানি বা উন্মুক্ত পরামর্শ ছাড়াই একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার চেষ্টা হচ্ছে, যা পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী সরকারের অস্বচ্ছ নীতি প্রণয়নেরই পুনরাবৃত্তি।

তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছিল কেবল নিয়মিত রাষ্ট্র পরিচালনা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই সীমা অতিক্রম করে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও বহুমাত্রিক প্রভাবসম্পন্ন একটি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এমনকি উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কোনো অর্থবহ অংশগ্রহণমূলক পরামর্শ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।

নাগরিক সমাজের মতে, ইপিএসএমপি ২০২৫ ভবিষ্যতেও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর প্রকল্পকে বৈধতা দেওয়ার কাঠামো তৈরি করছে। পরিকল্পনায় ‘এনার্জি ট্রানজিশন’ এর কথা বলা হলেও প্রকৃত নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ১৭ শতাংশ, যেখানে কাগজে দেখানো হয়েছে ৪৪ শতাংশ। একই সঙ্গে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১৫.৮ গিগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ২৫.২ গিগাওয়াট করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


প্রতিবাদকারীরা জানান, ২৫ বছর পরও এলএনজি, কয়লা ও তেলের ওপর দেশের নির্ভরতা ৫০ শতাংশে থাকবে, যা জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে। হাইড্রোজেন, অ্যামোনিয়া কো-ফায়ারিং ও কার্বন ক্যাপচার (সিসিএস) এর মতো ব্যয়বহুল ও পরীক্ষামূলক প্রযুক্তিকে সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করাকে তারা অবাস্তব ও বিপজ্জনক বলে উল্লেখ করেন।

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা আরও বলেন, এই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৫০ সালে বাংলাদেশের কার্বন নিঃসরণ দাঁড়াবে ১৮৬.৩ MtCO₂e, যা দেশের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) এবং অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষিত ‘শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য কার্বন’ দর্শনের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। পাশাপাশি শ্রমিক পুনর্বাসন, নারী ও লিঙ্গভিত্তিক ন্যায্যতা, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং পোশাক খাতের সবুজায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও পরিকল্পনায় প্রায় উপেক্ষিত রয়েছে।

প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে চার দফা জোরালো দাবি জানানো হয়—

১. অবিলম্বে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা ২০২৫ (ইপিএসএমপি ২০২৫) স্থগিত ও সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে।

২. নাগরিক সমাজ, বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণে স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরামর্শ প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।

৩. জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাস্তবসম্মত ১০০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে।

৪. ন্যায্য, সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি রূপান্তরের ভিত্তিতে নতুন মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

নাগরিক সমাজের নেতারা সতর্ক করে বলেন, এসব দাবি উপেক্ষা করা হলে ইপিএসএমপি ২০২৫ বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি জনবিরোধী, অস্বচ্ছ ও দায়মুক্তিমূলক নথি হিসেবে চিহ্নিত হবে, যা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।


এমআর/এফএ

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর