দেশের তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতি এবং কর ব্যবস্থা লক্ষ্য করে বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলো নতুনভাবে ‘প্রোপাগান্ডা’ ছড়াচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, কোম্পানিগুলো সরকারের রাজস্ব ও জনস্বাস্থ্যের ওপর বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে চোরাচালান ও অবৈধ বাণিজ্যের তত্ত্ব তুলে ধরছে। অথচ সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী দেশের তামাকজাত দ্রব্যের অবৈধ বাণিজ্য মূলত অভ্যন্তরীণ এবং সীমত। এই মিথ্যাচারের আড়ালে সরকারের নীতি সংশোধন ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট কর আরোপ ছাড়া বিকল্প নেই।
বিজ্ঞাপন
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) ‘তামাকজাত দ্রব্যের ওপর সুনির্দিষ্ট করারোপ: জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধির কার্যকর উপায়’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে এসব কথা বলেন জনস্বাস্থ্য ও তামাক নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর ট্যোবাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি) অনলাইনে এই ওয়েবিনারের আয়োজন করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও বিএনটিটিপির টেকনিক্যাল কমিটির আহ্বায়ক ড. রুমানা হকের সভাপতিত্বে ওয়েবিনারে বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের সাবেক মহাপরিচালক মো. শাহাদৎ হোসেন মাহমুদ, তামাকমুক্ত রেলওয়ে প্রকল্পের কন্সালটেন্ট ও জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের (এনটিসিসি) সাবেক সমন্বয়কারী হোসেন আলী খোন্দকার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল্লাহ। বিএনটিটিপি’র সিনিয়র প্রজেক্ট অ্যান্ড কমিউনিকেশন অফিসার ইব্রাহীম খলিলের সঞ্চালনায় ওয়েবিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএনটিটিপি’র প্রজেক্ট ম্যানেজার হামিদুল ইসলাম হিল্লোল।
ওয়েবিনারে বিশেষজ্ঞরা বলেন, বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলো ব্যবসা বৃদ্ধি ও সরকারের নীতিতে হস্তক্ষেপের জন্য নানা ধরনের তত্ত্ব নিয়ে হাজির হয়। সরকারের শক্তিশালী তামাক কর নীতি না থাকার সুযোগ নিয়ে কৌশলে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে তামাক কোম্পানি। ফলে তামাকজনিত রোগে মৃত্যু ও চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি হলেও সেই তুলনায় রাজস্ব বৃদ্ধি হয়নি। এতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ও কর বৃদ্ধিতে সুনির্দিষ্ট করারোপ জরুরি। কারণ তামাকজাত দ্রব্যের ওপর সুনির্দিষ্ট কর আরোপ তামাকজাত দ্রব্যের চোরাচালান ও কর ফাঁকি রোধে গুরুত্বপূর্ণ।
বক্তারা বলেন, সরকারেকে বিভ্রান্ত করতে বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলো অতীতের মতো নানা প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে ও মিথ্যাচার করছে। তারা চোরাচালানের তত্ত্ব প্রচার করছে। অথচ গত ২১ বছরে তামাক থেকে সরকারের রাজস্ব আয় বেড়েছে প্রায় ১৬ গুন এবং প্রতি বছরের রাজস্ব আয় কম হলেও পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে বেশি ছিলো। অন্যদিকে এনবিআরের আটককৃত শীর্ষ ১০ পণ্যের তালিকায় সিগারেট নেই। আর্ক ফাউন্ডেশনের এক গবেষণাতে দেখা গেছে, দেশে অবৈধ সিগারেটের বাজার মাত্র ৫.৪ শতাংশ।
বক্তারা বলেন, সরকার ২০০৩ সালে এফসিটিসিতে স্বাক্ষর করলেও ইলিসিট ট্রেড প্রোটোকলে স্বাক্ষর করেনি, যার কারণ তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ ও প্রচারণা। এই প্রোটোকলে স্বাক্ষর করলে যতোটুকু অবৈধ বাণিজ্য হয় সেটাও কমে যেতো। দেশে একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে তামাকজাত দ্রব্যের কোনো আন্তঃদেশীয় অবৈধ বাণিজ্য হয় না। যতটুকু হয় সেটা অভ্যন্তরীণ অবৈধ বাণিজ্য। অবৈধ বাণিজ্য বন্ধে ডিজিটাল মনিটরিং ও ট্রাকিং জরুরি। তাহলে ধোঁয়াহীন ও ধোঁয়াযুক্ত তামাকজাত দ্রব্যের অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে আসবে।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, তামাক কোম্পানি একেক সময় একেক মিথ্যাচার ও মিথকে টার্গেট করে। সম্প্রতি দেখেছি তারা অবৈধ ব্যবসা নিয়েও খুব প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। তারা এনবিআরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকেও এ বিষয়ে বিশ্বাস করিয়ে ফেলেছে। কিন্তু এ বিষয়ে যতোগুলো গবেষণা দেশে হয়েছে কোনটাতেই এর সত্যতা পাওয়া যায়নি। তারপরও ব্যবসা বৃদ্ধি ও নীতিতে হস্তক্ষেপের জন্য চেরাচালান তত্ত্ব নিয়ে হাজির হচ্ছে। ফলে সরকারের উচিত জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাক কোম্পানির মিথ্যাচারে কর্ণপাত না করে সুনির্দিষ্ট করারোপ জরুরি।
ওয়েবিনারে বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণে কর্মরত বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
এএইচ/এএম

