শীতের ভোরে ঢাকা শহর যেন নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে। রাতের গভীর অন্ধকার আর দিনের তীব্র কোলাহলের মাঝখানে এই ভোর এক অদ্ভুত নীরব সময়, যেখানে শহর কথা বলে ধীরে, শ্বাস নেয় ভারীভাবে।
কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি, বাতাসে ঠান্ডার সঙ্গে মিশে থাকে আগুনে ফুটতে থাকা চায়ের গন্ধ, ভেজা মাটির সোঁদা ভাব আর দূর থেকে ভেসে আসা আজানের ধ্বনি। এই ভোরে ঢাকা কোনো ম্যাপের শহর নয়, এটি মানুষের অভ্যাস, সংগ্রাম আর স্বপ্নের সমষ্টি।
বিজ্ঞাপন
কুয়াশার ভেতর দিয়ে আজানের ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে অলিগলিতে, যেন পুরো শহরকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান। ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই পুরান ঢাকার ছাদ আর মিনারগুলো ধূসর আকাশের নিচে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়। নামাজ শেষে অনেকেই মসজিদের সিঁড়িতে বসে থাকেন কিছুক্ষণ। ঠান্ডায় হাত কাঁপে, শ্বাস থেকে বের হওয়া ধোঁয়া চোখে পড়ে। এই মানুষগুলো জানেন, দিন শুরু হয়ে গেছে চাই আর না চাই, শহরের সঙ্গে তাল মিলিয়েই চলতে হবে।

এই একই ভোরে সদরঘাটে নদী জেগে ওঠে আরেক রকম শব্দে। লঞ্চের ইঞ্জিন, দড়ির টান, মালামাল নামানোর হাকডাক সব মিলিয়ে বুড়িগঙ্গার ঘাটে শুরু হয় দিনের কাজ। শীতের ভোরে নদীর বাতাস আরও ঠান্ডা, আরও ধারালো। মাঝিরা গামছা শক্ত করে জড়িয়ে রাখেন, কেউ কেউ চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকেন। তাদের চোখে ক্লান্তি আছে, তবু কাজ থেমে নেই। এই ভোর তাদের কাছে রোমান্টিক নয়, বরং জীবিকার নিয়মিত অধ্যায়।
কারওয়ান বাজার, শ্যামবাজার, কাপ্তান বাজার- ঢাকার এই বাজারগুলো ভোরেই সবচেয়ে জীবন্ত। ট্রাক থেকে নামানো হয় শাকসবজি, মাছ, ফল। কুয়াশার ভেজা আলোয় পাল্লা ওঠানামা করে, দরদাম চলে দ্রুত। শীতের ভোরে কাঁচা সবজির রঙ আরও উজ্জ্বল মনে হয়, মাছের শরীর থেকে ওঠা ঠান্ডা বাষ্প বাতাসে মিশে যায়। শ্রমিকদের কণ্ঠে থাকে তাড়াহুড়ার ভাষা, কিন্তু চোখে জমে থাকে ঘুম। এই ভোরে তারা জানেন, দিনের আয় নির্ভর করছে এই কয়েক ঘণ্টার উপর।
বিজ্ঞাপন

ঢাকার রাস্তাগুলো ভোরে আলাদা চেহারা নেয়। যানজট নেই, হর্নের শব্দ কম। কিছু বাস, কিছু ট্রাক আর ছায়ার মতো চলা রিকশা- এ নিয়েই শহর চলে। শীতের ভোরে রিকশাচালকদের গল্প সবচেয়ে কঠিন। অনেকেই রাত কাটান রিকশার সিটে বসেই। গায়ে কম্বল, পলিথিন, পুরনো কাঁথা- যা পাওয়া যায় তাই দিয়ে ঠান্ডা ঠেকানোর চেষ্টা। ভোরে উঠে প্রথম কাজ হয় গা-ঝাড়া দেওয়া, তারপর চায়ের দোকানে ভিড়। চায়ের কাপে গরম খোঁজেন তারা, সঙ্গে একটু দিনটা শুরু করার সাহস।
ফুটপাথের মানুষদের কাছে ভোর মানে নতুন করে বেঁচে থাকার চেষ্টা। শীতকালে ঢাকা শহরের ফুটপাথগুলো হয়ে ওঠে অস্থায়ী ঘর। ভোরে তারা জেগে ওঠেন অন্যদের আগেই। পলিথিন গুটিয়ে নেওয়া, কাপড় ঝাড়া দেওয়া, কোথাও আগুন জ্বালানো সবই ভোরের কাজ। ঠান্ডায় শিশুরা কাঁপে, বড়রা মুখ শক্ত করে রাখেন। এই ভোরে শহরের সবচেয়ে নিরব আর সবচেয়ে কঠিন গল্পগুলো লেখা হয়, যা দিনের আলোয় প্রায় অদৃশ্য থাকে।

রমনা পার্ক, ধানমন্ডি লেক, হাতিরঝিল- এই জায়গাগুলোতে শীতের ভোরে এক অন্য ঢাকা দেখা যায়। হাঁটতে বের হওয়া মানুষ, দৌড়ানো তরুণ, ধীরে হাঁটা বয়স্করা সবাই কুয়াশার ভেতর দিয়ে চলেন। গাছের পাতায় জমে থাকা শিশির পায়ে পড়ে শব্দ করে। পাখিরা ডাকে, কাকেরা উড়ে বেড়ায়। এই ভোরে শহর কিছুক্ষণের জন্য শান্ত হয়, যেন নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলছে।
হাসপাতাল এলাকার ভোর আরও ভারী। মেডিকেল কলেজ, মিটফোর্ড, বড় হাসপাতালগুলোর সামনে ভোর কখনো আসে না রাত আর ভোর এখানে মিশে থাকে। ঠান্ডা বেঞ্চে বসে থাকা স্বজনরা শাল জড়িয়ে অপেক্ষা করেন। কেউ রাতভর জেগে, কেউ নতুন করে এসে দায়িত্ব নিচ্ছেন। শীতের ভোরে হাসপাতালের করিডোরে হাঁটার শব্দ আরও স্পষ্ট শোনা যায়। এখানে ভোর মানে সূর্যোদয় নয়, বরং অনিশ্চয়তার আরেক অধ্যায়।
শীতের ভোরে ঢাকার স্কুলপাড়ায় শুরু হয় ছোট ছোট যুদ্ধ। শিশুদের ঘুম ভাঙানো, উলের পোশাক পরানো, গরম পানির ঝামেলা- সব মিলিয়ে সকালটা ব্যস্ত। কুয়াশার মধ্যে দিয়ে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে স্কুলে যাওয়া শিশুদের চোখে ঘুম, মুখে বিরক্তি। তবু এই ভোরই তাদের শৃঙ্খলা শেখায়, সময়ের মূল্য বোঝায়।

অফিসপাড়া ভোরে ধীরে ধীরে প্রস্তুত হয়। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ঝাড়ু দেন, রাস্তার ধুলো কুয়াশার সঙ্গে উড়ে যায়। চায়ের দোকান খুলে যায়, প্রথম সিগারেট জ্বলে ওঠে। শীতের ভোরে এই দোকানগুলোই হয়ে ওঠে শহরের অস্থায়ী সংসদ, এখানেই আলোচনা হয় রাজনীতি, বাজারদর, ক্রিকেট, জীবনের হিসাব।
সূর্য যখন ধীরে ধীরে কুয়াশা ভেদ করে উঠে আসে, ঢাকা তখন পুরোপুরি জেগে ওঠে। ভোরের নীরবতা ভেঙে যায়, শুরু হয় চেনা কোলাহল। কিন্তু শীতের এই ভোরে যা ঘটে, তা দিনের বাকি সময় আর ফিরে আসে না। এই ভোরে ঢাকা সবচেয়ে মানবিক, সবচেয়ে সত্য।
ঢাকার ভোর তাই কেবল দিনের শুরু নয়; এটি শহরের আত্মার প্রকাশ। শীতের কুয়াশায় মোড়া এই ভোরে ধনী-গরিব, শ্রমিক-ছাত্র, আশাবাদী-হতাশ সবাই একই শহরের অংশ। রাতের ক্লান্তি পেরিয়ে, দিনের সংগ্রামের আগে এই ভোরই ঢাকাকে কিছুক্ষণের জন্য থামতে শেখায়। তারপর আবার শহর ছুটতে শুরু করে নিজের মতো করে।
এম/এএইচ

