আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে বিচার, সংস্কার ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহারে ১৫ দফা মৌলিক সংস্কার প্রস্তাব ও সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা, সংস্কার ও নির্বাচনি ইশতেহার’ শীর্ষক বিভাগীয় সংলাপে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো তুলে ধরেন সুজনের কেন্দ্রীয় সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার। সংলাপে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার নাগরিক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অংশ নেন।
বিজ্ঞাপন
সংলাপে উত্থাপিত ১৫টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে প্রথমেই গুরুত্ব দেওয়া হয় জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং সংবিধানে তা তফসিল হিসেবে বা উপযুক্তভাবে সংযুক্ত করার প্রতিশ্রুতিকে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে সনদের বৈধতা নিয়ে কোনো আইনি প্রশ্ন না তোলা এবং এর বাস্তবায়নে সাংবিধানিক ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
সুজন জানায়, এসব সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ প্রণীত হয়েছে। সংগঠনটির মতে, এই সনদ জনগণের দীর্ঘদিনের আন্দোলন, আত্মত্যাগ ও বঞ্চনার বিপরীতে গড়ে ওঠা একটি সামাজিক চুক্তি। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে জুলাই জাতীয় সনদ এবং সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে স্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন ও সময়সীমাবদ্ধ অঙ্গীকার থাকতে হবে।
সুজন আরও জানায়, গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। বিচার বিভাগের চলমান সংস্কারকে সংহত করা, নির্বাচন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যকারিতা বাড়ানোর অঙ্গীকার ইশতেহারে থাকতে হবে।
ক্ষমতার ভারসাম্য প্রসঙ্গে সংলাপে বলা হয়, নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগের মধ্যে কার্যকর চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছাড়া গণতান্ত্রিক উত্তরণ সম্ভব নয়। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমারেখা স্পষ্ট করা, সংসদের কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা এবং সংবিধানের সমান প্রয়োগের অঙ্গীকারও ইশতেহারে থাকতে হবে।
বিজ্ঞাপন
নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রশ্নে সুজন জানায়, সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বাড়িয়ে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে তা পূরণের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। একই সঙ্গে নারী নির্যাতন রোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও পাবলিক পরিসরে কার্যকর ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক দলে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর কৌশল ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়েও জোর দেওয়া হয়। ক্ষমতা ও আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করা, নিয়মিত নির্বাচন নিশ্চিত করা এবং আনোয়ার হোসেন বনাম বাংলাদেশ মামলার রায় অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার অঙ্গীকারও ১৫ দফার অন্তর্ভুক্ত।
এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে মানসম্মত ও সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার রূপরেখা, পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সুস্পষ্ট পরিকল্পনা এবং বিশুদ্ধ বায়ু ও নিরাপদ পানীয় জলের সংকট সমাধানে রাজনৈতিক অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাস্তবতা ভারসাম্যপূর্ণ, আত্মমর্যাদাশীল ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্র নীতির কথাও তুলে ধরা হয়।
ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘বহু প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জিত হলেও গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বরং নির্বাচনি ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার সুযোগে গত ১৫ বছরে দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ছিল সেই ধারার বিরুদ্ধে জনগণের ঐতিহাসিক প্রতিরোধ এবং রাষ্ট্র মেরামতের একটি নতুন সূচনার প্রতীক।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অর্ন্তবর্তী সরকারের সামনে তিনটি অগ্রাধিকার স্পষ্ট হয়ে ওঠে— বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্যে ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়।
রাষ্ট্রযন্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়টিকেও গুরুত্বপূর্ণ দাবি হিসেবে তুলে ধরা হয়। ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘অতীতে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও রাজনৈতিক দমন–পীড়নের যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রাতিষ্ঠানিক ও টেকসই ব্যবস্থা নিতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে মানবাধিকার সম্মত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক করতে ইশতেহারে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা জরুরি।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত পাঁচ দশকে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যে অবক্ষয় ঘটেছে, তা পরিবর্তন না হলে গণতন্ত্র টেকসই হবে না। রাজনীতিকে লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করার প্রবণতা বন্ধ না হলে নির্বাচনি সহিংসতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব হবে না।’
ড. বদিউল আলম বলেন, ‘দেশের মানুষ এখন আর কেবল আশ্বাসে বিশ্বাস করে না। তারা জানতে চায়— কে কী সংস্কার করবে, কীভাবে করবে এবং কত সময়ের মধ্যে করবে। রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহারই নির্ধারণ করবে, কারা গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে সত্যিকার অর্থে সম্মান জানাতে প্রস্তুত।’
এএইচ/এফএ

