সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

ভোটের এক মাস আগে গণভোটের ব্যালট গেল মাঠে

মো. মেহেদী হাসান হাসিব
প্রকাশিত: ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:৪৫ পিএম

শেয়ার করুন:

ভোটের এক মাস আগে গণভোটের ব্যালট গেল মাঠে
ভোটের এক মাস আগে গণভোটের ব্যালট গেল মাঠে। প্রতীকী ছবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের বাকি আছে আর এক মাস। এরই মধ্যে গণভোটের ব্যালট মাঠে পাঠানোর কাজ শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ব্যালটের সংখ্যা বেশি হলেও সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ব্যালট এক দিন আগে–পরে পাঠানো যেত। কিন্তু এত দিন আগে পাঠানোর ফলে জনমনে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি হতে পারে।

সোমবার (১২ জানুয়ারি) ইসি সূত্র ঢাকা মেইলকে এ তথ্য নিশ্চিত করে।


বিজ্ঞাপন


ইসি সূত্র জানায়, যেহেতু সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে, তাই দুই ধরনের ব্যালটের সংখ্যা হবে প্রায় ২৬ কোটি। এত বিপুলসংখ্যক ব্যালট পেপার কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা কঠিন। সে কারণে গণভোটের ব্যালট আগে ছাপিয়ে সব রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠানোর কাজ শেষ করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে এসব ব্যালট জেলা প্রশাসক (ডিসি) কার্যালয়ের ট্রেজারিতে সংরক্ষণ করা হবে। গত ৬ জানুয়ারি থেকে সোমবার (১২ জানুয়ারি) পর্যন্ত ব্যালট পেপার পাঠানোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া ভোটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সামগ্রীও পাঠানো হচ্ছে। তবে এক মাস আগে মাঠে ব্যালট গেলেও ভোটকেন্দ্রে এসব ব্যালট নির্বাচনের আগের রাতে পৌঁছানো হবে।

তিনি আরও বলেন, আগামী ২১ জানুয়ারি প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার পর ২৩ জানুয়ারি থেকে সংসদ নির্বাচনের ব্যালট পেপার ছাপানোর কাজ শুরু হবে।

নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, গণভোটের ব্যালট মাঠে পাঠানোর কাজ শুরু হয়েছে—এটা তিনি জানেন, তবে কাজ শেষ হয়েছে কি না, তা তাঁর জানা নেই।


বিজ্ঞাপন


এত আগে পাঠানোর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের কাজ এগিয়ে রাখতে হচ্ছে। আগে না পাঠালে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না।

এর আগে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, আগের মতো নির্বাচনের আগের রাতেই সব কেন্দ্রে ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনী সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হবে।

এক মাস আগে গণভোটের ব্যালট মাঠপর্যায়ে পাঠানো নিয়ে মত জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার ঢাকা মেইলকে বলেন, একসঙ্গে পাঠানো যেত বলে তিনি মনে করেন। এক মাস আগে পাঠানোর কোনো যৌক্তিকতা তিনি দেখেন না। ব্যালট বেশি হওয়ার কারণে এক দিন আগে–পরে পাঠানো যেতে পারে, তবে এত আগে নয়।

এত আগে ব্যালট পাঠানোয় কোনো শঙ্কা তৈরি হতে পারে কি না—এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের দেশে তো এমনিতেই শঙ্কা আছে, কারণ কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। এ ক্ষেত্রে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি হতে পারে।

জানা গেছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে। এ উপলক্ষে সরকার, রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে গণভোটের প্রচারণায় নেমেছে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে এ গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে দল সরকার গঠন করবে, তারা জুলাই জাতীয় সনদের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করবে কি না, তা নির্ধারণ হবে গণভোটের চারটি প্রশ্নে জনগণের ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের মাধ্যমে। ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সরকার জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন করবে, আর ‘না’ জয়ী হলে তা বাস্তবায়ন করা হবে না।

গণভোটের প্রশ্ন

আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার–সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন? (হ্যাঁ বা না)

১. নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।

২. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধনের জন্য উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

৩. সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও কয়েকটি সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত ৩০টি প্রস্তাব বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।

৪. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হবে।

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন যেভাবে

  • সনদ বাস্তবায়নে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করা হবে।
  • আদেশে গণভোট, গণভোটের প্রশ্ন এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন–সংক্রান্ত বিধান থাকবে।
  • গণভোট অনুষ্ঠানের জন্য আইন বা অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হবে।
  • জাতীয় নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
  • গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে আগামী সংসদ নিয়মিত কাজের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে।
  • পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করবে।
  • সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে পিআর পদ্ধতিতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে।
  • নিম্নকক্ষের নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন করা হবে।
  • উচ্চকক্ষের মেয়াদ নিম্নকক্ষের মেয়াদের সঙ্গে শেষ হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেছেন, ফেব্রুয়ারিতে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তা না হলে জাতি এক মহাবিপদের মুখোমুখি হবে।

এদিকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে সরকারের অবস্থান থাকায় সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে সরকারকে। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, এ নিয়ে কেউ কেউ দ্বিমত করতে পারেন। সরকার স্পষ্টভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনগণকে আহ্বান জানাবে।

গণভোট নিয়ে ইসির আয়োজন

গণভোট ও সংসদ নির্বাচন একই দিনে অনুষ্ঠিত হওয়ায় নির্বাচন কমিশনকে বাড়তি কোনো কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়নি। গণভোটের জন্য শুধু গোলাপি রঙের আলাদা ব্যালট ছাপাতে হয়েছে। একই সঙ্গে দুই ভোট হওয়ায় ভোটগ্রহণের সময় এক ঘণ্টা বৃদ্ধি করা হয়েছে। গোপন বুথের সংখ্যাও বাড়ানো হবে। এ ছাড়া গণভোটের প্রচারণার জন্য আলাদা ব্যানার ভোটকেন্দ্র, রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়সহ মাঠপর্যায়ের দপ্তরগুলোতে দৃশ্যমান করতে নির্দেশ দিয়েছে ইসি।

তফসিল অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন ১০ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত আপিল শুনানি করে নিষ্পত্তি করবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। সেদিনই চূড়ান্ত হবে ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা। ২১ জানুয়ারি চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হবে ২২ জানুয়ারি এবং চলবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত। সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ১২ ফেব্রুয়ারি।

এমএইচএইচ/এআর

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর