রোববার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

আজিমপুর কবরস্থান: ঢাকার হৃদয়ে নীরব এক শহর

মাহফুজুর রহমান
প্রকাশিত: ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:১৫ পিএম

শেয়ার করুন:

grave
আজিমপুর কবরস্থানে প্রয়াত স্বজনের জন্য দোয়া করছেন এক বয়োবৃদ্ধ। ছবি- ঢাকা মেইল

আজিমপুর কবরস্থান ঢাকার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এক বিশাল নীরব জগৎ। চারপাশে নগরজীবনের চরম কোলাহল, যানজট, মানুষের ব্যস্ততা আর জীবনের ছুটে চলা সময়ের মাঝখানে এই কবরস্থান যেন এক ভিন্ন পৃথিবী। এখানে ঢুকলেই শব্দ ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে। মনে হয় শহরের সব তাড়াহুড়া বাইরে ফেলে রেখে কেউ এক গভীর নীরবতার ভেতরে পা রেখেছে। এই নীরবতা শুধু শূন্যতা নয়, বরং হাজারো জীবনের শেষ অধ্যায়ের ভার বহন করে। প্রতিদিন নতুন নতুন পরিবার এখানে আসে, চোখে জল, মনে শোক আর হাতে শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি।

আজিমপুর কবরস্থান শুধু একটি সমাধিক্ষেত্র নয়, এটি ঢাকার ইতিহাসের এক নীরব দলিল। মুঘল আমলের সুবাদার আজিমুশানের নাম থেকে আজিমপুর এলাকার নামকরণ। সেই সময় থেকেই এই এলাকা ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বসতি হিসেবে পরিচিত। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এখানে আনুষ্ঠানিকভাবে কবরস্থান গড়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার বিস্তার যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে এই কবরস্থানের গুরুত্ব। বর্তমানে প্রায় ৩২ একর জমি জুড়ে বিস্তৃত আজিমপুর কবরস্থান দেশের অন্যতম বৃহৎ কবরস্থান হিসেবে পরিচিত। কয়েক প্রজন্মের মানুষ এখানে শায়িত, যাদের জীবনের গল্প মিলেমিশে তৈরি করেছে এক দীর্ঘ ইতিহাস।


বিজ্ঞাপন


প্রতিদিন ভোর থেকেই কবরস্থানে মানুষের আনাগোনা শুরু হয়। কেউ আসে কবর জিয়ারতে, কেউ আসে নতুন করে কবর খুঁড়তে, আবার কেউ আসে জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তটি পার করতে। অ্যাম্বুলেন্স বা গাড়ি থেকে নামানো হয় কফিন, মাটির ওপর চাদর পাতা হয়, এরপর ধীরে ধীরে মাটির নিচে নামিয়ে দেওয়া হয় আরেকটি জীবন। এই দৃশ্য প্রতিদিনই ঘটে, তবুও প্রতিটি দাফনের মুহূর্ত আলাদা, প্রতিটি পরিবারের শোক আলাদা, প্রতিটি বিদায় আলাদা রকমের বেদনা বহন করে।

আজিমপুর কবরস্থানের ভেতরে হাঁটলে বোঝা যায়, এখানে ধনী-গরিবের সব পার্থক্য মুছে গেছে। জীবদ্দশায় কেউ ছিলেন বড় কর্মকর্তা, কেউ ছিলেন শিল্পী বা লেখক, কেউ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, আবার কেউ ছিলেন দিনমজুর কিংবা রিকশাচালক। মৃত্যুর পর সবাই একই মাটির নিচে, একই নিয়মে, একই নীরবতায় শুয়ে আছেন। কিছু কবর বড় ও পাকা, কিছু কবর সাধারণ মাটির ঢিবি। কোথাও মার্বেলের ফলক, কোথাও নাম-তারিখ ছাড়া নিঃশব্দ সমাধি। তবুও প্রতিটি কবরই সমান গুরুত্ব বহন করে। কারণ প্রতিটির নিচেই একটি সম্পূর্ণ জীবন শায়িত।

এই কবরস্থানে দেশের বহু পরিচিত মানুষের শেষ ঠিকানা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় জীবন উৎসর্গ করা যোদ্ধা, স্বাধীনতার পর রাজনীতি, সাহিত্য, সাংবাদিকতা কিংবা সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত মানুষদের কবর এখানে ছড়িয়ে আছে। অনেক মানুষ নিয়মিত এসে এসব কবরের পাশে দাঁড়ায়, দোয়া করে, স্মৃতি রোমন্থন করে। আজিমপুর কবরস্থান তাই কেবল সাধারণ মানুষের কবরস্থান নয়, এটি জাতির ইতিহাসের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

একই সঙ্গে এখানে রয়েছে অগণিত সাধারণ মানুষের কবর, যাদের নাম কেউ জানে না, যাদের গল্প কেউ লেখেনি। কেউ হয়তো কোনো দিনমজুর, কেউ গৃহিণী, কেউ আবার অজ্ঞাতপরিচয় মানুষ, যাদের মৃত্যুর পর কেউ দাবি করতে আসেনি। তবুও এই কবরস্থান তাদেরও জায়গা দিয়েছে। নিয়ম মেনে, ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী, তাদেরও মাটির নিচে শায়িত করা হয়েছে। এই জায়গাটি তাই মানবিকতার এক নীরব প্রতিচ্ছবি।


বিজ্ঞাপন


আজিমপুর কবরস্থানের একটি অংশ শিশুদের কবর দিয়ে ভরা। ছোট ছোট কবর, অনেকগুলোর ওপর খেলনা, ফুল কিংবা রঙিন কাপড় রাখা থাকে। এসব কবরের সামনে দাঁড়ালে বুক ভার হয়ে আসে। শিশুদের জীবন যেন শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেছে। তাদের স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ, সম্ভাবনা সবকিছু মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। এসব কবর কেবল শিশুদের মৃত্যুর গল্প নয়, বরং বাবা-মায়ের ভাঙা হৃদয়ের নীরব আর্তনাদ।

বিশেষ দিনগুলোতে কবরস্থানের পরিবেশ বদলে যায়। ঈদের দিনগুলোতে হাজার হাজার মানুষ এখানে আসে। ঈদের নামাজ শেষে মানুষ সরাসরি কবরস্থানে ঢুকে পড়ে। কেউ বাবা-মায়ের কবরের পাশে দাঁড়ায়, কেউ স্বামী বা স্ত্রীর কবরের পাশে বসে থাকে, কেউ সন্তানের কবরের ওপর হাত বুলিয়ে দেয়। পুরো কবরস্থান তখন কান্না, প্রার্থনা আর স্মৃতির ভারে ভরে ওঠে। জীবিত আর মৃতদের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য সম্পর্ক তখন আরও গভীরভাবে অনুভূত হয়।

এই কবরস্থানের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে কবর খননকারীদের জীবন। বছরের পর বছর তারা এখানে কাজ করছেন। তাদের কাজ প্রতিদিন নতুন কবর খোঁড়া, দাফনের সময় সহযোগিতা করা, পুরনো কবর সংস্কার করা। দিনের পর দিন মৃত্যুর মুখোমুখি থাকতে থাকতে তাদের কাছে মৃত্যু এক স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। তবুও প্রতিটি দাফনের সময় পরিবারের কান্না তাদের মনকেও স্পর্শ করে। তাদের জীবনও সহজ নয়। সীমিত আয়, কঠোর পরিশ্রম আর সমাজের অবহেলা নিয়েই তাদের দিন কাটে। তবুও তারা এই কাজ করে যান, কারণ এটি শুধু পেশা নয়, বরং একটি সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবেও তারা দেখেন।

ঢাকার জনসংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে আজিমপুর কবরস্থানের ওপর চাপও বাড়ছে। জায়গার সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই পুরনো কবর উঠিয়ে নতুন দাফন করতে হয়। এতে পরিবারগুলোর মধ্যে মানসিক কষ্ট তৈরি হয়। অনেকেই চান প্রিয়জনের কবর যেন অক্ষত থাকে, কিন্তু নগর বাস্তবতায় তা সব সময় সম্ভব হয় না। এই সংকট ভবিষ্যতে আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রক্ষণাবেক্ষণের দিক থেকেও কবরস্থানটি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। এত বড় এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখা সহজ নয়। কোথাও আগাছা, কোথাও ভাঙা কবর, কোথাও নিরাপত্তার অভাব দেখা যায়। তবুও এটি নগরবাসীর কাছে এক অপরিহার্য স্থান। কারণ এখানে শুধু মৃতদের নয়, জীবিতদের আবেগ, স্মৃতি আর সম্পর্কও সংরক্ষিত থাকে।

আজিমপুর কবরস্থান সময়ের এক নীরব সাক্ষী। ঢাকার ইতিহাসে যত বড় ঘটনা ঘটেছে মহামারী, দুর্যোগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা সবকিছুর প্রভাব এই কবরস্থানে এসে জমা হয়েছে। প্রতিটি সময় তার নিজস্ব চিহ্ন রেখে গেছে এই মাটিতে।

2

এই কবরস্থানে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, এখানে প্রতিটি কবর আসলে একটি সম্পূর্ণ জীবনের সারসংক্ষেপ। কারও জীবন ছিল সংগ্রামের, কারও ছিল সুখের, কারও ছিল বিস্মৃতির। সব মিলিয়ে আজিমপুর কবরস্থান এক বিশাল মানবিক দলিল, যেখানে মৃত্যু নয়, বরং জীবনেরই গল্প লেখা আছে।

ইতিহাস ও উৎপত্তি

আজিমপুর কবরস্থান বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার সবচেয়ে বয়স্ক ও বৃহৎ কবরস্থানগুলোর একটি। ধারণা করা হয়, এটি সপ্তদশ শতাব্দীর আশেপাশে তৈরি হয়েছিল, যখন ঢাকা শহর গড়ে উঠছিল। এই প্রাচীন ইতিহাসের সূত্রগুলো আজ অনেক গবেষণা ও তথ্যভাণ্ডারে পাওয়া যায়, যেখানে বলা হয়েছে আজিমপুর কবরস্থান ঢাকা শহরের স্থানীয় জীবনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

কবরস্থানটি মূলত একটি মুসলিম সমাধিস্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি ঢাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। বায়ান্নর ভাষা শহীদসহ বহু কৃতী সন্তানের নাম এখানে মাটির নিচে শায়িত থাকায় এটি শুধু একটি স্থল নয়, বরং একটি জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবেও বিবেচিত হয়। 

আধুনিক সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী, এটি প্রায় ৩২ একর বা ৭৪ দশমিক ৪২ বিঘা এলাকাজুড়ে বিস্তৃত একটি কবরস্থান। এই বিশাল স্থানটি ঢাকার অভ্যস্ত রাস্তা ও নগর জীবনের মাঝেই নীরবে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রতিদিনই নতুন নতুন মরদেহ সমাহিত করা হয়।

নির্মাণ ও আধুনিকায়ন

আজিমপুর কবরস্থানের অবস্থান, পারিপার্শ্বিকতা ও পরিকল্পনা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এই জায়গাটির আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে। আধুনিক সাজসজ্জার ফলে এখানে আগের মতো বিক্ষিপ্ত ও অগোছালো দৃশ্য আর দেখা যায় না; বরং এটি এখন একটি সুঠাম ও পরিকল্পিত স্থানে পরিণত হয়েছে। 

বর্তমানে এই কবরস্থানের চারপাশে প্রায় ১,৬০০ মিটার দীর্ঘ দৃশ্যমান সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে, যা এলাকা নিয়ন্ত্রণ ও পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণ পাশে প্রায় ৩২০ মিটার কাচের সীমানা থাকায় বাইরের দৃষ্টি থেকে কবরগুলো সহজেই বোঝা যায়। 

এটি শুধু পুরনো বা ঐতিহ্যবাহী জায়গা হিসেবে রয়ে গেছে, বরং আধুনিক নির্মাণ শৈলী ও পরিকল্পিত কাঠামোর মাধ্যমে সাজানো হয়েছে, যাতে এখানে ভ্রমণ, স্মরণ ও প্রার্থনার জন্য মানুষ আরও আকৃষ্ট হয়। পুরনো দিনের মনোজগৎ থেকে বেরিয়ে এটি এখন কেবল কবর নয়—একটি শান্ত উদ্যোগ, যেখানে জীবিতরা এসে তাদের মৃত প্রিয়জনদের স্মরণ করতে পারে। 

মাঠ, পাথ ও সেচনার ব্যবস্থা

আজিমপুর কবরস্থানের ভেতরবর্তী পথগুলোও বিশেষভাবে পরিকল্পিত। এখানে প্রতি দুই সারি কবরের পরপর একটি করে চার ফুট চওড়া পাকা হাঁটাপথ ঠিক করা হয়েছে, যার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ভ্রমণ সম্ভব হচ্ছে। এই পথগুলো বিশেষভাবে ঢালাই করা হয়েছে এবং এর নিচ দিয়ে পানি নিষ্কাশনের ড্রেন রাখা হয়েছে, যাতে বৃষ্টির পানি জমে না থাকে।

এ ধরনের পরিকল্পনা কবরস্থানের ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতা বাড়িয়ে দিয়েছে। শুধু কবর নয়, এখানে হাঁটা, স্মরণ করা ও দীর্ঘ সময় নীরবে থাকতে কোনো অস্বস্তি অনুভূত হয় না। জায়গাটি এই দিক দিয়ে আধুনিক ও মানব-বন্ধুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো হিসেবে বিবেচিত। 

কবর সংখ্যার পরিমাণ ও সংরক্ষণ

আজিমপুর কবরস্থানে বর্তমানে প্রায় ২৬, হাজারেরও বেশি কবর রয়েছে। প্রতি বছর এখানে নতুন করে অসংখ্য দাফন হয়। অতীতে কবর সংরক্ষণ ছিল দীর্ঘমেয়াদী—প্রায় ৯৯ বছর। বর্তমান ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ ২৫ বছর পর্যন্ত নির্দিষ্ট নিয়মে কবর সংরক্ষণ করা হয়। পুনঃদাফন বা একই কবর ব্যবহারের জন্য স্বাক্ষরিলিপি ও আবেদন প্রয়োজন।

ফি তালিকা

রেজিস্ট্রেশন ফি: ১,০০০ টাকা, সংরক্ষণ ফি: ১০ বছরের জন্য: ৫,০০,০০০ টাকা, ১৫ বছরের জন্য: ১০,০০,০০০ টাকা, ২০ বছরের জন্য: ১৫,০০,০০০ টাকা, ২৫ বছরের জন্য: ২০,০০,০০০ টাকা, পুনঃদাফনের ফি: ৫০,০০০ টাকা, সাধারণ দাফনের আনুষঙ্গিক খরচ (বাঁশ ও চাটাই): ১,১০০ টাকা।

সামাজিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব

আজিমপুর কবরস্থান শুধু মরদেহ সমাহিত করার জায়গা নয়; এটি ঢাকার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিভাণ্ডার হিসেবেও বিবেচিত। এখানে বায়ান্নর ভাষা শহীদসহ বহু কৃতী সন্তানের কবর রয়েছে, যারা দেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা রাখে। 

ঢাকার মানুষ ঈদ, শবে বরাত, শুক্রবারের মতো বিশেষ দিনে এখানে এসে প্রিয়জনদের কবর জিয়ারত করেন। পুরনো দিনের স্মৃতি, জীবনচক্র ও সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক এখানে প্রতিফলিত হয়। এটা শুধু মৃতদের নয়, জীবিতদের জন্যও এক নীরব স্মরণস্থান। 

গ্রিন স্পেস ও পরিকল্পিত পথের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নগর জীবনের চাপ থেকেও এটি কিছুটা দূরে সরে দাঁড়িয়েছে একটি মননশীল ও শান্ত পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে, যেখানে আসা-যাওয়া করে মানুষ জীবনের ক্ষণস্থায়ীতা উপলব্ধি করতে পারে।

grave2

গ্লোবাল ও ডিজিটাল উদ্যোগ

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আজিমপুর কবরস্থানকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও তুলে ধরেছে। ২০২৫ সালের মধ্যে একটি আধুনিক গ্রেভইয়ার্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করা হয়েছে, যেখানে অনলাইনে কবরের অবস্থান, নাম, তথ্য সার্চ করা যায় এবং প্রমাণপত্র সংগ্রহ করা সম্ভব। 

এই উদ্যোগটি শুধু প্রশাসনিক কাজকে সহজ করে দেয়নি, বরং বিশ্বব্যাপী প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যও তাদের প্রিয়জনের কবর খুঁজে পেতে সহায়তা করেছে। এটি আজিমপুর কবরস্থানের একটি নতুন দিক উন্মোচন করেছে, যেখানে ইতিহাস আর প্রযুক্তি মিলিত হয়েছে। 

কবরের রক্ষণাবেক্ষণ ও দাফন কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মী জানান, আজিমপুর কবরস্থানের প্রতিদিনের বাস্তব চিত্র। প্রতিদিন এখানে গড়ে ১৫ থেকে ৩৫টি মরদেহ দাফন করা হয়। কোনো কোনো দিন এই সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে শীতকাল বা মহামারির সময়গুলোতে চাপ অনেক বেশি থাকে। এই চাপ সামাল দিতে কবরস্থানের ভেতরে আগে থেকেই প্রায় ১৫টির মতো কবর অগ্রিম খুঁড়ে রাখা হয়, যাতে মরদেহ এলে দাফনে কোনো বিলম্ব না হয় এবং শোকাহত পরিবারকে অপেক্ষায় থাকতে না হয়।

দাফনের খরচ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে একটি মরদেহ দাফন করতে মোট ২ হাজার ১০০ টাকা ব্যয় হয়। এর মধ্যে ১ হাজার টাকা সরকারি ফি হিসেবে নেওয়া হয় এবং বাকি ১ হাজার ১০০ টাকা লাগে বাঁশ ও চাটাইয়ের জন্য, যা কবর প্রস্তুত ও দাফনের আনুষঙ্গিক কাজে ব্যবহৃত হয়। তবে এই ব্যবস্থাটি সব সময় এমন ছিল না। 

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, সাবেক মেয়র আনিসুল হকের সময় এই কবরস্থানে দাফন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হতো। তখন ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই বিনা খরচে তাদের স্বজনকে দাফনের সুযোগ পেত। পরবর্তীতে মেয়র তাপস দায়িত্ব নেওয়ার পর আবারও নির্ধারিত ফি চালু করা হয়। এতে কিছুটা অসন্তোষ থাকলেও নিয়মের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে জানান তিনি।

কবরস্থানের সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার কথাও অকপটে তুলে ধরেন ওই কর্মী। তার ভাষ্যে, সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক ভালো হলেও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে কিছু ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে। বিশেষ করে কবর খোঁড়ার সময় যখন আগের কোনো কবরের হাড়গোড় বা মাথার খুলি বেরিয়ে আসে, অনেক সময় তা যথাযথভাবে ঢেকে দেওয়া হয় না। এতে দৃষ্টিকটু পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং মানসিকভাবে দর্শনার্থী ও স্বজনদের কষ্ট হয়। তিনি মনে করেন, এই জায়গাটিতে আরও সংবেদনশীলতা ও নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন।

তবে এসব সীমাবদ্ধতার মাঝেও তিনি বলেন, মোটের ওপর আজিমপুর কবরস্থানের ব্যবস্থাপনা আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে। হাঁটাপথ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও সীমানা দেয়ালের কারণে এখন দাফন কার্যক্রম ও কবর জিয়ারত তুলনামূলক সহজ হয়েছে। তবুও একটি জায়গা হিসেবে কবরস্থান যেহেতু মানুষের শেষ আশ্রয়, সেখানে আরও যতœ, শৃঙ্খলা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা জরুরি বলেই মনে করেন তিনি।

আজিমপুর কবরস্থান ঢাকার হৃদয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক ঐতিহ্যবাহী স্থান, যেখানে প্রতিটি কবর একটি জীবনের গল্প বহন করে। এটি শুধু মৃতদের সমাহিত করার জায়গা নয়, বরং ঢাকার ইতিহাস, সমাজচিন্তা, আধুনিকায়ন ও স্মরণশক্তির এক অনন্য কেন্দ্র। ইতিহাস, নির্মাণ, আধুনিক ব্যবস্থা, সামাজিক গুরুত্ব ও ডিজিটাল উদ্যোগ মিলিয়ে এটি একটি জীবন্ত জায়গা যেখানে মৃত্যু নয়, বরং জীবনের অর্থ উপলব্ধি করা হয়।

জীবনে যত ভেদাভেদ থাকুক, শেষ ঠিকানা সবার জন্য একই। এই কবরস্থান তাই শুধু ঢাকার একটি কবরস্থান নয়, এটি মানুষের জীবনের অনিত্যতার এক স্থায়ী স্মারক।

এম/এএইচ

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর