রাজধানীতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি) পৃথক দুটি সফল অভিযানে ভেজাল মদ উৎপাদনকারী চক্র এবং নতুন প্রজন্মের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মাদক ‘কুশ’-এর একটি আধুনিক ল্যাবরেটরির সন্ধান পেয়েছে। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ও ওয়ারীতে পরিচালিত এই অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ মাদক, উৎপাদন উপকরণ উদ্ধার এবং পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বুধবার (৭ জানুয়ারি) রাতভর রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ও ওয়ারী এলাকায় অভিযান চালিয়ে এসব জব্দ করা হয়।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে সংস্থাটির পরিচালক (অপারেশন) বশির আহমেদ এক সংবাদ সম্মেলনে এমন তথ্য জানায়।
গ্রেফতাররা হলেন- রিপন হিউবার্ট গমেজ, আব্দুর রাজ্জাক, ডেনিস ডমিনিক পিরিছ, রাজু শেখ ও সুমেহরা তাসনিয়া ওরফে তাসিনা হাসান।
ডিএনসি সূত্র জানায়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভেজাল মদ উৎপাদন ও অবৈধ সরবরাহ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ডিএনসির মহাপরিচালকের নির্দেশনায় গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের নেতৃত্বে এসব অভিযান পরিচালিত হয়। ভেজাল মদের গোপন কারখানায় গত ৭ জানুয়ারি ভাটারা থানাধীন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি ভাড়াকৃত অ্যাপার্টমেন্টে অভিযান চালিয়ে ডিএনসি একটি পূর্ণাঙ্গ ভেজাল মদের কারখানার সন্ধান পায়। আবাসিক ভবনের ভেতরেই একাধিক কক্ষ ব্যবহার করে ভেজাল মদ তৈরি, বোতলজাত ও সংরক্ষণ করা হচ্ছিল। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বোতলে ভেজাল মদ ভরে বাজারজাতের প্রস্তুতি চলছিল।
অভিযানে ৭৯ বোতল বিদেশি মদ, ১৬৬ ক্যান বিয়ার, ১৩২ লিটার ভেজাল মদের কেমিক্যালসহ বিপুল পরিমাণ আলামত উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই দিনে পার্শ্ববর্তী জোয়ার সাহারা এলাকায় আরেকটি অভিযানে চক্রটির মজুদ ও সরবরাহসংক্রান্ত আলামত উদ্ধারসহ আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনজনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী পৃথক দুটি মামলা করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বশির আহমেদ বলেন, চক্রটি অবৈধ পথে আনা বিদেশি মদের ওপর রাসায়নিক “টিউনিং” করে রং, গন্ধ ও মাত্রা পরিবর্তন করত। কোনো মাননিয়ন্ত্রণ বা স্বাস্থ্যবিধি ছাড়াই তৈরি এসব ভেজাল মদ জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ—তাৎক্ষণিক বিষক্রিয়া থেকে শুরু করে লিভার-কিডনি ক্ষতি এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
এছাড়াও ডিএনসি ঢাকার ওয়ারী এলাকায় একটি আবাসিক ভবনে আধুনিক ‘কুশ’ (উন্নত জাতের মারিজুয়ানা) উৎপাদন ল্যাবের সন্ধান পায়। এর আগে গাজীপুরের টঙ্গীতে একটি কুরিয়ার সার্ভিস থেকে বিদেশগামী পার্সেলে লুকানো ইয়াবা উদ্ধার হয়। তদন্তে ভুয়া পরিচয় ব্যবহারকারী এক নারীকে গ্রেফতার করা হলে তার জিজ্ঞাসাবাদে ওয়ারীর ল্যাবের তথ্য উঠে আসে।
পরবর্তী অভিযানে ওয়ারীর ওই বাসা থেকে কুশ গাছ, বীজ, সদ্য সংগ্রহ করা কুশ (২০ গ্রাম), ক্যানাবিনয়েড রেজিন, চাষের আধুনিক সরঞ্জাম, ইয়াবা ও বিভিন্ন বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় বাসার তত্ত্বাবধায়কসহ মোট তিনজনকে আসামি করা হয়েছে। মূল পরিকল্পনাকারী মোঃ তৌসিফ হাসান (২২) বিদেশে অবস্থান করায় পলাতক রয়েছেন।
বশির আহমেদ জানান, পলাতক আসামি বিদেশে বসেই ইন্টারনেট নির্ভর প্রযুক্তির মাধ্যমে ল্যাবের আলো, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং দেশে থাকা সহযোগীদের নির্দেশনা দিতেন। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ও চক্রটির বিস্তার শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
ডিএনসির এই দুই অভিযান রাজধানীতে মাদকচক্রের সংগঠিত ও প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। জনস্বাস্থ্য ও সমাজ সুরক্ষায় এমন অভিযান আরও জোরদার করার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
একেএস/ক.ম

