নগরীর রাত যখন গভীর হয়, কুয়াশা নেমে আসে ধীরে ধীরে, তখন ঢাকার কিছু মানুষের দিন শুরু হয় অন্যভাবে। এই শহরে এমন হাজারো মানুষ আছে, যাদের ঠিকানা কোনো বাসা নয়, ঘর নয়- তাদের ঠিকানা রিকশার সিট, প্যাডেল আর হ্যান্ডেল।
দিনের আলোয় এসব মানুষ রিকশায় যাত্রী টানেন। রাত নামলে সেই রিকশাই হয়ে ওঠে তাদের বিছানা। কুয়াশায় মোড়ানো ঢাকার রাস্তায় কম্বল বা কাঁথা মুড়ি দিয়ে রিকশার ওপর ঘুমিয়ে তাদের রাত কাটে নীরব, অব্যক্ত, প্রায় অদৃশ্য এক জীবনের গল্প নিয়ে।
বিজ্ঞাপন
শীত এলেই ঢাকার চেহারা বদলে যায়। ভোর থেকে কুয়াশার পর্দা ঝুলে থাকে শহরের ওপর। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা আরও ঘন হয়। ফুটপাত, ফ্লাইওভার, বাসস্ট্যান্ড আর মোড়গুলোতে তখন আলো-ছায়ার ভেতর দেখা যায় দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি রিকশা।
এর মধ্যে অনেক রিকশা ফাঁকা। আবার অনেক রিকশাতেই দেখা যায় মানুষ কেউ আধশোয়া, কেউ গুটিশুটি মেরে বসে, কেউ বা সিটের ওপর শুয়ে পড়েছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন রিকশাগুলোই তাদের ঘর, আর শহরের খোলা আকাশই ছাদ।
দিনভর রিকশা টানা মানুষগুলো সাধারণত রাতেও কাজে বের হয়। তবে শীতের রাতে যাত্রী কমে গেলে বা শরীর আর সায় না দিলে তারা কাজ থামিয়ে রিকশার ওপরই বিশ্রাম নেয়। অনেকের কাছে এই বিশ্রামই একমাত্র ঘুম। ঘুম বলতে পুরোপুরি বিশ্রাম নয়, বারবার জেগে ওঠা, ঠান্ডায় কাঁপা, আশপাশের শব্দে সতর্ক থাকা। তবু এই আধঘুমই তাদের শক্তি জোগায় পরদিন আবার প্যাডেলে পা রাখার।
রিকশাচালকদের বেশিরভাগই শহরের স্থায়ী বাসিন্দা নন। গ্রামের অভাব, নদীভাঙন, কাজের সংকট তাদের ঢাকায় টেনে এনেছে। কেউ এসেছে একা, কেউ এসেছে বন্ধু বা আত্মীয়ের হাত ধরে। শুরুতে হয়তো কোনো মেসে উঠেছিল, কোনো ঘরে জায়গা পেয়েছিল। কিন্তু নিয়মিত ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় সেই ঠিকানাও হারিয়ে গেছে অনেকের। তখন রিকশাই হয়ে উঠেছে ভরসা। যেটা ছাড়া তারা চলতে পারে না, সেটাই তাদের আশ্রয়।
বিজ্ঞাপন
রিকশাচালক আব্দুল কাদির বলেন, দিনভর রিকশা টানি, রাতে শরীর আর সয় না। শীতের সময় যাত্রী কম থাকলে রিকশার ওপরই শুয়ে পড়ি। এইটাই এখন আমার ঘর। ভাড়া দেওয়ার মতো টাকা নাই। রিকশাটা চোখের সামনে রাখলে অন্তত চুরি হওয়ার ভয় কম থাকে।’
শীতের রাতে রিকশায় ঘুমানোর দৃশ্যটা কাছ থেকে দেখলে কষ্ট আরও স্পষ্ট হয়। কেউ পুরনো, ছেঁড়া কম্বল গায়ে জড়িয়ে আছে, কেউ কাঁথা দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছে। অনেক সময় কম্বলও থাকে না শুধু গামছা বা পাতলা চাদর। ঠান্ডা বাতাসে শরীর জমে আসে, হাত-পা শক্ত হয়ে যায়। তবু তারা চুপচাপ শুয়ে থাকে, কারণ বিকল্প নেই। ফুটপাতে ঘুমানোর চেয়ে রিকশায় ঘুমানো কিছুটা নিরাপদ মনে হয় তাদের কাছে। নিজের রিকশাটা চোখের সামনে থাকে, চুরি হওয়ার ভয় কম।
রাত বাড়লে শহরের শব্দও বদলে যায়। দিনের কোলাহল থেমে গিয়ে শোনা যায় দূরের গাড়ির হর্ন, কোথাও ট্রেনের বাঁশি, কোথাও কুকুরের ডাক। সেই শব্দের ফাঁকে ফাঁকে রিকশার ওপর শুয়ে থাকা মানুষগুলো কখনো পাশ ফিরিয়ে নেয়, কখনো কম্বল টেনে ধরে। কুয়াশার ভেতর তাদের নিঃশ্বাসের ধোঁয়া মিশে যায় শহরের বাতাসে। এই দৃশ্যগুলো শহরের ব্যস্ত দিনের আলোয় কেউ দেখে না, বা দেখলেও খেয়াল করে না।
রিকশায় ঘুমানো মানে শুধু ঠান্ডার সঙ্গে লড়াই নয়, নিরাপত্তার ঝুঁকিও আছে। গভীর রাতে মাতাল লোকজন, ছিনতাইকারী বা অসাধু মানুষ এসে বিরক্ত করতে পারে। কখনো কখনো পুলিশ তাড়িয়ে দেয়, বলে এখানে থাকা যাবে না। তখন আধঘুমে থাকা মানুষগুলোকে উঠে বসতে হয়, রিকশা ঠেলে অন্য জায়গায় যেতে হয়। ঘুম ভাঙে, শরীর আরও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তবু তারা প্রতিবাদ করতে পারে না। কারণ এই শহরে তাদের অবস্থান অনেক দুর্বল।
রিকশাচালক ছালাম মিয়া বলেন, শীতকাল তাদের জন্য সবচেয়ে কঠিন সময়। গ্রীষ্মে শরীর ঘামে, বর্ষায় ভিজে যায়, কিন্তু শীতে ঠান্ডা সোজা হাড়ে গিয়ে লাগে। রাতে ঘুম না হলে পরদিন রিকশা টানতে কষ্ট হয়। বুক ধরা, জ্বর, সর্দি-কাশি লেগেই থাকে। অসুস্থ হলেও কাজ বন্ধ রাখা যায় না একদিন কাজ না করলে সেই দিনের খাবার জোটে না। তাই অসুখ নিয়েই প্যাডেল ঘোরাতে হয়, আর রাতে আবার রিকশায় শুয়ে পড়তে হয়।
রিকশায় ঘুমানো এই মানুষগুলোর জীবনযাপন খুব সীমিত। তাদের কাছে স্বপ্ন বলতে বড় কিছু নেই। বেশিরভাগই চায় নিয়মিত কাজ, একটু ভালো আয়, যেন একটা ছোট ঘর ভাড়া নিতে পারে। কেউ কেউ গ্রামের বাড়িতে পরিবার রেখে এসেছে। মাস শেষে কিছু টাকা পাঠাতে পারলেই তারা খুশি হয়। ফোনের পর্দায় সন্তানদের ছবি দেখে, বা স্ত্রীর কণ্ঠ শুনে তারা শক্তি খুঁজে পায়। কিন্তু রাতের বেলা রিকশার সিটে শুয়ে থাকলে সেই দূরত্ব আরও বেশি অনুভূত হয়।
শহরের অনেক মোড়ে শীতকালে কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কম্বল বিতরণ করে। সেই সময় রিকশাচালকদের চোখে এক ধরনের স্বস্তি দেখা যায়। একটা নতুন কম্বল মানে শুধু গরম নয়, একটু যতœ পাওয়ার অনুভূতিও। কেউ কেউ সেই কম্বল যতœ করে রিকশার পেছনে বেঁধে রাখে, যেন ভিজে না যায়, হারিয়ে না যায়। তবে এসব সহায়তা সাময়িক। শীত পেরোলে আবার তারা নিজেদের মতো করেই লড়াই চালিয়ে যায়।
রিকশায় ঘুমানো মানুষদের অনেকেই বলে, শহরটা তাদের কাছে কখনো কখনো নিষ্ঠুর মনে হয়। এত আলো, এত বিল্ডিং, এত মানুষের ভিড়, তার মাঝেও তারা একা। রাতের বেলা যখন কুয়াশায় ঢাকা রাস্তায় শুয়ে থাকে, তখন মনে হয়- এই শহর তাদের কথা শোনে না। তবু তারা শহর ছেড়ে যেতে পারে না। কারণ এখানেই তাদের রুটি-রুজি, এখানেই প্রতিদিনের লড়াই।
রিকশাচালক ছবুর মিয়া বলেন, শীতে সবচেয়ে কষ্ট হয়। কম্বল না থাকলে রাতে ঘুমই আসে না, তবু সকালে আবার রাস্তায় নামতে হয়। একদিন কাজ না করলে সেই দিনের খাবার জোটে না। অসুস্থ হলেও রিকশা চালানো ছাড়া উপায় নাই। গ্রামে পরিবার আছে। মাস শেষে কিছু টাকা পাঠাতে পারলেই মনে হয় কষ্টটা সার্থক।
এই গল্প শুধু কয়েকজন রিকশাচালকের নয়, এটা ঢাকার এক বড় বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। যে শহর দিনে ছুটে চলে, রাতে আলো ঝলমল করে, সেই শহরের নিচে লুকিয়ে আছে এমন অসংখ্য জীবন, যাদের রাত কাটে রিকশায়, কুয়াশার মধ্যে, অনিশ্চয়তার সঙ্গে। তারা শহরের চাকা ঘোরায়, কিন্তু নিজের জীবনের চাকা ঘোরানো তাদের কাছে সবচেয়ে কঠিন।
ভোর হলে কুয়াশা ধীরে ধীরে কাটে। আজানের শব্দ ভেসে আসে, রাস্তায় গাড়ির চলাচল বাড়ে। রিকশার ওপর শুয়ে থাকা মানুষগুলো একে একে উঠে বসে। কেউ চোখ কচলায়, কেউ গায়ে চাদর গুছিয়ে নেয়। আবার শুরু হয় তাদের দিন প্যাডেলে পা, হাতে হ্যান্ডেল, সামনে অনন্ত রাস্তা। রাতের কষ্ট পেছনে ফেলে তারা আবার শহরের সেবায় নেমে পড়ে। কারণ এই শহর যেমন তাদের কঠিন বাস্তবতা, তেমনি এটাই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা।
কুয়াশায় মোড়ানো ঢাকার সেই রাতগুলো তাই শুধু ঠান্ডার গল্প নয়, তা সংগ্রামের গল্প, টিকে থাকার গল্প। রিকশার ওপর ঘুমিয়ে কাটানো প্রতিটি রাত একেকটি নীরব সাক্ষ্য। এই শহরের ভেতরে আরেকটি শহর আছে, যেখানে মানুষ বেঁচে থাকে খুব অল্পে, খুব কষ্টে, তবু হাল ছাড়ে না।
এম/এএইচ

