২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট পর্যন্ত গুম হওয়া ব্যক্তিদের ১৫৬৯টি অভিযোগ কমিশনের সক্রিয় বিবেচনায় ছিল। যার মধ্যে ২৫১ জন ব্যাক্তি এখনো নিখোঁজ রয়েছে। এ ছাড়া গুম হওয়া ৩৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
যারা নিখোঁজ রয়েছে তাদের অবস্থান নির্ধারণে কমিশন সংশ্লিষ্ট বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা, সন্দেহভাজন ব্যক্তি, শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য ও বেসামরিক সাক্ষীসহ মোট ২২২ জনকে গুমের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পাশাপাশি ৭৬৫ জন গুমের শিকার ও তাদের পরিবারের সদস্যদের একাধিকবার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
সোমবার (৫ জানুয়ারি) বিকেল সাড়ে ৩টায় গুলশানে অবস্থিত গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির সদস্যরা এক সংবাদ সম্মেলনে এমন তথ্য জানায়।
তদন্ত কমিশন জানায়, ৬ জানুয়ারি ২০০৯ থেকে ৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত সময়ে বলপূর্বক গুমের ঘটনাসমূহ অনুসন্ধান করা, গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধান ও শনাক্ত করা এবং কোন পরিস্থিতিতে এসব ঘটনা সংঘটিত হয়েছে তা নির্ধারণ করাসহ কমিশন তার তদন্ত অনুযায়ী বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নথি ও তথ্য পর্যালোচনা, পরিদর্শন ও যাচাইবাছাই করাসহ স্বীকৃত ও গোপন উভয় ধরনের বন্দিশালা পরিদর্শন করে। যার মধ্যে ছিল ডিজিএফআই ও র্যাব পরিচালিত জেআইসি ও টিএফআইসি, র্যাব সদর দফতর ও ব্যাটালিয়ন, এনএসআই, ডিবি, সিটিটিসি, পুলিশ লাইন্সসহ ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনাগুলো।
এ ছাড়াও তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধান কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন জেলায় গোপন বন্দিশালার সন্ধান পাওয়া মাত্রই কমিশন তা পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো অপরিবর্তিত অবস্থায় রাখার নির্দেশনা দেয়। কমিশন গঠনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ডিজিএফআইয়ের জেআইসি (আয়নাঘর) এবং র্যাব সদর দফতরের টিএফআইসি পরিদর্শন করে আলামত ধ্বংসের প্রক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীদের উপস্থিতিতে প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন সদস্য এই দুটি সহ মোট তিনটি গোপন বন্দিশালা পরিদর্শন করেন।
কমিশন আরও জানায়, দাখিল করা ১৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে একাধিকবার দায়ের করা ২৩১টি অভিযোগ যাচাইবাছাই শেষে প্রাথমিকভাবে তদন্তের পর গুমের সংজ্ঞার বহির্ভূত বিবেচনায় ১১৩টি অভিযোগ বাতিল করা হয়। ফলে মোট ১৫৬৯টি অভিযোগ কমিশনের সক্রিয় বিবেচনায় ছিল যার মধ্যে ২৫১ জন নিখোঁজ (যাদের সন্ধান এখন পাওয়া যায় নি) এবং ৩৬ জনের গুম পরবর্তী লাশ উদ্ধার করা হয়। নিখোঁজদের অবস্থান নির্ধারণে কমিশন সংশ্লিষ্ট বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা, সন্দেহভাজন ব্যক্তি, আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য ও বেসামরিক সাক্ষীসহ মোট ২২২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পাশাপাশি ৭৬৫ জন গুমের শিকার ও তাদের পরিবারের সদস্যদের একাধিকবার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন

তদন্ত কমিশন, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলার পুলিশ সুপার ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সেক্টর কমান্ডারদের নিকট থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশইন করা ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করলেও তাতে গুমের শিকার কোনো ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়নি। তবে ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর ঢাকার ধামরাইয়ের বাসিন্দা গুমের শিকার মোহাম্মদ রহমত উল্লাহকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর সীমান্ত দিয়ে পুশইন করার একটি নির্দিষ্ট ঘটনা কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
এ ছাড়াও, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন কারাগারে আটক হওয়া ১ম দফায় ১০৫২ জন ও ২য় দফায় ৩২৮৫ জন বাংলাদেশি নাগরিকদের তালিকা কমিশন যাচাই করে গুমের শিকার কোনো ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়নি। ওই তালিকার কিছু তথ্য অসম্পূর্ণ ও অস্পষ্ট হওয়ায় বিষয়গুলোর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চেয়ে ও হালনাগাদ তথ্য চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং অগ্রগতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে অবহিত করতে বলা হয়েছে।
কমিশন আরও জানায়, বলপূর্বক গুম সংক্রান্ত অভিযোগে গণশুনানি আয়োজনের বিষয়ে সুধীজনের পরামর্শ পাওয়া গেলেও, ভিকটিম ও তাদের পরিবারের জীবন, নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা এবং অনুসন্ধানের স্বার্থে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড বিবেচনায় কমিশন গোপনীয়ভাবে জবানবন্দি গ্রহণকেই ন্যায়বিচারের জন্য অধিকতর সমীচীন বলে মনে করে।
একেএস/এফএ

