গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে যারা জীবিত ফিরে এসেছেন, তাঁদের ৭৫ শতাংশই জামায়াত–শিবিরের নেতাকর্মী। এ ছাড়া ২২ শতাংশ বিএনপি ও তাদের অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। গুম–সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
রোববার (৪ জানুয়ারি) গুম তদন্ত কমিশন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রতিবেদন হস্তান্তর করা হয়।
বিজ্ঞাপন
এ সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন। উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজউদ্দিন মিয়া।
কমিশনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, মোট ১ হাজার ৯১৩টি গুমের অভিযোগ জমা পড়ে। যাচাই–বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ সংজ্ঞা অনুযায়ী গুম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগকে মিসিং অ্যান্ড ডেড শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস জানান, গুমের প্রকৃত সংখ্যা চার থেকে ছয় হাজার পর্যন্ত হতে পারে। অনেক ভুক্তভোগী বা তাঁদের পরিবার এখনো কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। কেউ কমিশনের বিষয়ে জানেন না, কেউ দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। আবার অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাঁরা অনরেকর্ড বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
কমিশনের সদস্যরা জানান, বলপূর্বক গুমের পেছনে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করেছে। সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণে এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
প্রতিবেদনে বলা হয়, যাঁরা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী এবং ২২ শতাংশ জামায়াত–শিবিরের সঙ্গে যুক্ত।
হাই প্রোফাইল গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এসব ঘটনায় উল্লেখযোগ্য ভুক্তভোগীদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, চৌধুরী আলম, জামায়াত নেতা সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী, ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান।
কমিশনের সদস্যরা জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিজেই একাধিক গুমের ঘটনায় সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তিদের ভারতে রেন্ডিশনের তথ্যও পাওয়া গেছে, যা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশ ছাড়া সম্ভব নয়।
প্রতিবেদন গ্রহণকালে গুম তদন্ত কমিশনের সদস্যদের ধন্যবাদ জানান প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, এটি একটি ঐতিহাসিক কাজ। বাংলায় পৈশাচিক শব্দটি দিয়ে এক কথায় এসব ঘটনার বর্ণনা করা যায়। ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে কমিশন সদস্যরাও সেই নৃশংসতার সাক্ষী হয়েছেন। দৃঢ় মনোবল ছাড়া এ কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হতো না।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, গণতন্ত্রের লেবাস পরে কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে মানুষের ওপর নৃশংসতা চালানো হয়েছে, এই প্রতিবেদন তার দলিল। যারা এসব ঘটিয়েছে, তারা সমাজে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে—এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর বাস্তবতা। জাতি হিসেবে এই ধরনের নৃশংসতা থেকে চিরতরে বেরিয়ে আসতে হবে এবং যেন আর কখনো এমন ঘটনা না ঘটে, সে জন্য কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি প্রতিবেদনগুলো সহজ ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা ও ভবিষ্যৎ করণীয় উপস্থাপনের নির্দেশ দেন।
প্রধান উপদেষ্টা আরও নির্দেশনা দেন, আয়নাঘরের পাশাপাশি যেখানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে, সেসব স্থান ম্যাপিং করতে হবে।
কমিশনের তথ্যমতে, বরিশালের বলেশ্বর নদীতে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে। শত শত গুমের শিকার ব্যক্তিকে হত্যা করে ওই নদীতে ফেলে দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বুড়িগঙ্গা নদী ও মুন্সিগঞ্জেও লাশ গুমের তথ্য উঠে এসেছে।
কমিশনের সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টার প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানান। তাঁরা বলেন, প্রধান উপদেষ্টার দৃঢ় অবস্থান ও সহযোগিতা না থাকলে এই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হতো না।
তাঁরা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন করে এসব অনুসন্ধানমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেন।
এআর

