সোমবার, ৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

বিনত বিবির মসজিদ: ইতিহাস, স্থাপত্য ও কিংবদন্তির ছায়া

মাহফুজুর রহমান
প্রকাশিত: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৫৫ পিএম

শেয়ার করুন:

M
বিনত বিবির মসজিদ।

ঢাকার পুরনো মহল্লাগুলোতে হাঁটতে হাঁটতে এমন কিছু স্থাপনা চোখে পড়ে, যা শুধু ইট-সিমেন্টের গঠন নয়, বরং ইতিহাসের পাতার মতো আমাদের সামনে কথা বলে। এমনই এক স্থাপনা হলো ‘বিনত বিবির মসজিদ।’ 

এই মসজিদটির নাম শুনলেই যেন সেদিনের এক রহস্যময় সময়, রাজকীয় দান এবং সাধারণ মানুষের ভক্তি-ভরা গল্প মনে পড়ে। মসজিদটি শুধু ধর্মীয় উপাসনার স্থান নয়; এটি আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের এক অমোচনীয় অংশ, যেখানে আর্কিটেকচারাল সৌন্দর্য আর লোককথার মেলবন্ধন স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। 


বিজ্ঞাপন


ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট 

বিনত বিবি ছিলেন ঢাকার এক সমৃদ্ধ পরিবারের কন্যা। শোনা যায়, তিনি ছিলেন দয়ালু এবং ধর্মপ্রাণ, যার নাম আজও স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ঘুরে। তার নামে নির্মিত মসজিদটি মূলত ১৮০০ শতকের শেষ দিকে বা ১৯০০ শতকের শুরুতে তৈরি হয়। ঢাকার পুরনো শহরের সংকীর্ণ গলিপথ, কাঁচা-মাটির বাড়ি এবং নদীর তীরে বসতি এই পরিবেশের মধ্যেই বিনত বিবি তার দান ও ভক্তি দিয়ে মসজিদটি নির্মাণ করান।

ঐতিহাসিক দলিল থেকে জানা যায়, বিনত বিবির মসজিদটি মূলত একটি ছোট মসজিদ হিসেবে শুরু হলেও পরবর্তীতে স্থানীয় জনগণের চাহিদা ও জমিদারদের সমর্থনে এটি সম্প্রসারিত হয়। ঢাকার বিভিন্ন প্রাচীন ম্যাপ এবং সমসাময়িক লোককথা অনুযায়ী, মসজিদটি ছিল মূলত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের জন্য দোয়া ও নামাজের স্থান।

মসজিদ নির্মাণের সময় বিনত বিবি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছিলেন স্থানীয় কারিগরদের দক্ষতা এবং স্থাপত্যের নকশায়। কারিগররা ব্যবহার করেছিলেন স্থানীয় ইট, কংক্রিটের মিশ্রণ এবং বাঁশ কাঠামো। এটি ছিল সেই যুগের স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন, যেখানে ধর্ম, সামাজিক সংহতি এবং শিল্পকলার সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়।


বিজ্ঞাপন


200

আর্কিটেকচারাল বৈশিষ্ট্য 

বিনত বিবির মসজিদ আর্কিটেকচারাল দিক থেকে বাংলা মসজিদের ঐতিহ্য বহন করে। এর গঠন মূলত স্থানীয় ইট ও কংক্রিটের মিশ্রণে তৈরি, যার বহির্ভাগে খোদাই করা মুদ্রা-পত্রিকাজাত নিদর্শন এবং ফুলের অলঙ্করণ লক্ষণীয়। মসজিদের গম্বুজটি অল্প উঁচু, কিন্তু তার গঠন ও শোভা দেখতে ভীষণ সূক্ষ্ম।

মসজিদের দেয়ালে ছোট ছোট মিনার এবং কর্ণার টাওয়ারের ব্যবহার করা হয়েছে, যা প্রায় প্রতিটি বাংলার প্রাচীন মসজিদেরই পরিচয়। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মসজিদের তুলনায় এটি একটু ছোট, কিন্তু ভেতরের ছাদের খচিত কাঠামো এবং প্রাচীন কলাকৌশল বিশেষভাবে চোখে পড়ে।

মসজিদের মূল দরজা এবং জানালা সমূহে নানা ধরণের অলঙ্করণ দেখা যায়। প্রাচীন সূত্র অনুযায়ী, বিনত বিবি নিজে এই অলঙ্করণগুলোর নকশা অনুমোদন করতেন। এতে ধ্বনির বৈশিষ্ট্য এবং আলো ছড়ানোর কৌশল বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ভেতরের দেয়ালে ইসলামিক শ্লোকের খোদাই এবং ফুলের নকশা মিলিয়ে দেয়, যা ১৮শ শতকের বাংলা স্থাপত্যের এক চমৎকার উদাহরণ।

মসজিদে প্রবেশ করলে প্রথমেই চোখে পড়ে উজ্জ্বল রঙের প্রাচীন করুশিল্প। দেওয়ালের অলঙ্করণ, মসজিদের গম্বুজের ভিতরের নকশা, এবং মোমবাতি-প্রদীপের আলো মিলে এক রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টি করে। স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন, এই নকশাগুলি শুধুমাত্র চোখের জন্য নয়, বরং মানুষের মনকে ধ্যানমগ্ন এবং শান্ত করার জন্যও ডিজাইন করা হয়েছিল। 

লোককথা ও কিংবদন্তি 

বিনত বিবির মসজিদের সঙ্গে নানা লোককথা জড়িয়ে আছে। শোনা যায়, বিনত বিবি ছিলেন এতোটাই দয়ালু যে, এলাকার গরিব মানুষদের জন্য তিনি নিত্যদিনই অন্ন ও উপহার পৌঁছে দিতেন। একবার বলা হয়, মসজিদের পাশে ছোট একটি পুকুর ছিল, যেখানে বিনত বিবি গরিবদের জন্য পানি সরবরাহ করতেন।

আরেকটি কিংবদন্তি হলো- মসজিদের নির্মাণকালে কিছু রহস্যময় ঘটনা। বলা হয়, মসজিদ নির্মাণের সময় রাতের বেলায় প্রায়ই অজানা আলোর চকমকি দেখা যেত। স্থানীয়রা মনে করতেন, এটি বিনত বিবির আশীর্বাদ, কারণ তিনি প্রতি রাতে মসজিদে নামাজ ও দোয়ার আয়োজন করতেন। শিশুদের সঙ্গে বড়দের গল্পে, কেউ কেউ বলেন, রাতে মসজিদে গেলে বিনত বিবির ছায়া দেখা যেতে পারে, কিন্তু সেই ছায়া কখনো ভয় দেখায় না, বরং আশীর্বাদ জ্ঞাপন করে।

300

একটি আরও চমকপ্রদ কিংবদন্তি হলো, মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করার সময় স্থানীয়রা এক অদ্ভুত কঙ্কাল আবিষ্কার করেছিলেন। কারও মতে, এটি পূর্বের কোনো সন্ন্যাসীর অবশিষ্টাংশ, আর কেউ বলেন, এটি ছিল এক প্রাচীন রাজ পরিবারের গোপন ধন বা গুপ্তস্মারক। বিনত বিবি সেই কঙ্কালকে সম্মান সহকারে মসজিদের পাশে একটি ছোট স্থান বানিয়ে রাখতেন, যাতে এলাকার মানুষদের জন্য এটি শিক্ষা ও ধার্মিক প্রতীক হয়ে থাকে। 

সামাজিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব 

মসজিদটি শুধু আর্কিটেকচারাল সৌন্দর্য নয়, সামাজিক ও ধর্মীয় দিক থেকেও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ১৮০০ থেকে ১৯০০ শতকের ঢাকা শহরের সাধারণ মানুষের জন্য এটি ছিল নামাজ, দোয়া, ঈদ জামাত এবং সামাজিক মিলনস্থল। স্থানীয় বয়স্করা বলেন, মসজিদের পাশে বসে মানুষ একে অপরের সঙ্গে খবর শেয়ার করতেন, পরামর্শ নিতেন, এমনকি শিশুদের শিক্ষাও দেওয়া হতো মসজিদের আঙ্গিনায়।

বিনত বিবির দান ও উদ্যোগে মসজিদটি এমন এক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, যা শুধু ধর্মীয় নয়, বরং সমাজিক সংহতির প্রতীক হিসেবেও পরিচিত। বিশেষ করে ঈদের সময় এবং রমজান মাসে মসজিদটি যেন পুরনো ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হতো।

মসজিদটি বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো। জন্মদিন, বিবাহ বা অন্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানে স্থানীয় মানুষদের মেলামেশার কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই মসজিদ। এভাবে এটি শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, বরং সামাজিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করতো। 

মসজিদে শিক্ষা ও পাঠশালা

বিনত বিবি শুধু মসজিদ নির্মাণ করাই নয়, শিক্ষার গুরুত্বেও গুরুত্ব দিতেন। মসজিদের আঙ্গিনায় ছোট একটি কক্ষ তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে স্থানীয় শিশুদের ইসলামিক শিক্ষা, কোরআনের তিলাওয়াত এবং মৌলিক গণিত শিক্ষা দেওয়া হতো। স্থানীয় লোকেরা বলেন, বিনত বিবি চাইতেন যে, মসজিদ শুধু নামাজের জন্য নয়, বরং একটি শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে মানুষের মনন বিকাশে সাহায্য করুক।

সময় গড়িয়ে আসার সাথে সাথে মসজিদটি আরও প্রসারিত হয়। শিক্ষার জন্য আলাদা কক্ষ, গ্রন্থাগার এবং পুস্তক সংগ্রহ করা হয়। এটি স্থানীয়দের জন্য আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষার সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করত। 

সমসাময়িক অবস্থা 

আজকের দিনে মসজিদটি মূলত প্রাচীন ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষিত। তবে, ঢাকার দ্রুতগতিতে নগরায়ণ এবং আধুনিক স্থাপত্যের ছোঁয়ায় কিছু ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয় আর্কিটেক্ট এবং ইতিহাসবিদরা মসজিদটির মূল কাঠামো সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছেন।

তবে স্থানীয় জনগণ এখনো নিয়মিত এখানে নামাজ পড়েন। শিশুদের শিক্ষার জন্য এটি একটি ছোট পাঠশালার কাজও করে। বিনত বিবির স্মৃতিচারণ এবং দানের প্রেরণা আজও এখানকার মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে। 

পর্যটন ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব 

বিনত বিবির মসজিদ শুধুমাত্র ধর্মীয় বা স্থানীয় মানুষের জন্য নয়, পর্যটকদের জন্যও একটি আকর্ষণীয় স্থান। ঢাকার পুরনো নগরীর ভেতরে এটি একটি শান্তিপূর্ণ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। দেশের ইতিহাস ও স্থাপত্য প্রেমীরা এখানে এসে মসজিদের নকশা, গম্বুজের অলঙ্করণ এবং প্রাচীন খোদাই দেখা যায়।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ইতিহাসচর্চা এবং স্থানীয় গাইডিং টুর এই মসজিদকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। স্থানীয় কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিত হয়ে এটি ঢাকার অতীতের স্মৃতিচারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। 

400

স্মৃতিচারণ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা 

বিনত বিবির মসজিদ শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং আর্কিটেকচারাল বৈচিত্র্যের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, এই ধরনের প্রাচীন মসজিদ সংরক্ষণ ও পর্যটন ব্যবস্থার মাধ্যমে ঢাকার ঐতিহ্য আরও সমৃদ্ধ করা সম্ভব।

শহরের ভেতরে এমন একটি মসজিদ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যে অতীতের মানুষদের বিশ্বাস, দান এবং স্থাপত্যের প্রতি ভালোবাসা কেবল ইতিহাস নয়, এটি আমাদের বর্তমান জীবনের অংশও। বিনত বিবি যেমন গরিব ও দরিদ্রদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তেমনি তার মসজিদ আজও মানুষের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক দিককে সমৃদ্ধ করছে।

লোকমুখে বলা হয়, যে কেউ বিনত বিবির মসজিদে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়েন, তার মন শান্তি পায়। ঢাকার ভিড়ের মধ্যেও মসজিদটি যেন একান্তিক শান্তির নীড়। শিশু থেকে বৃদ্ধ—প্রতি মানুষ এখানে আসে নিজের আত্মাকে শান্ত করতে। আর এই শান্তি, ইতিহাস এবং কিংবদন্তির মিশ্রণই মসজিদটিকে অনন্য করে তোলে।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা রহমত আলী বলেন, আমি ছোটবেলা থেকেই বিনত বিবির মসজিদ দেখে আসছি। তখন চারপাশ এত ঘিঞ্জি ছিল না। ফজরের আজান শুনলেই মনে হতো, এই মসজিদ আমাদের ডাকছে। শুনেছি, বিনত বিবি খুব দয়ালু ছিলেন, গরিবদের পাশে দাঁড়াতেন। এই মসজিদ শুধু নামাজের জায়গা না, আমাদের স্মৃতির জায়গা। এখানে ঈদের নামাজ, দোয়া মাহফিল, এমনকি মানুষের দুঃখ-কষ্ট ভাগাভাগিও হতো। সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে, কিন্তু মসজিদটা এখনও আমাদের অতীতকে আঁকড়ে ধরে আছে। 

স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী আজিজুর রহমান বলেন, বিনত বিবির মসজিদ স্থাপত্যগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি বাংলার প্রাচীন মসজিদ স্থাপত্যের একটি নিখুঁত উদাহরণ। ছোট গম্বুজ, ইটের গাঁথুনি, দেয়ালের অলঙ্করণ সবকিছুতেই স্থানীয় নির্মাণশৈলীর ছাপ স্পষ্ট। বড় রাজকীয় মসজিদ না হয়েও এটি ইতিহাস বহন করছে নীরবে। 

তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখানে আড়ম্বর নেই, আছে সরলতা। এই সরলতাই বাংলার স্থাপত্যের আত্মা। সংরক্ষণের অভাবে যদি এটি হারিয়ে যায়, তবে আমরা ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায় হারাবো।

এম/এএইচ

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর